Bartaman Logo
১৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বৈরাগ্য

ঈশ্বরের কৃপায় যখন তীব্র বৈরাগ্য হয় তখন কামিনী কাঞ্চনের আসক্তি থেকে নিস্তার হতে পারে। সাধন ভজন—হবে এখন, আজ না হয় কাল হবে—এ হল মন্দা বৈরাগ্য।

বৈরাগ্য
  • ২২ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঈশ্বরের কৃপায় যখন তীব্র বৈরাগ্য হয় তখন কামিনী কাঞ্চনের আসক্তি থেকে নিস্তার হতে পারে। সাধন ভজন—হবে এখন, আজ না হয় কাল হবে—এ হল মন্দা বৈরাগ্য। যার প্রাণ একেবারে ব্যাকুল হয়ে ভগবানের দিকে ছোটে, কোন বাধা মানে না, ভগবান ভিন্ন আর কিছু চায় না, মাগ ছেলেদের যেন কালসাপ দেখে, সংসার যেন পাতকুয়া মনে হয়, আর ভাবে যেন ডুবে গেলুম, তারই তীব্র বৈরাগ্য।

Advertisement

একজন সস্ত্রীক বিবাগী হয়ে নানা তীর্থ করে বেড়ায়। পথে যেতে স্বামী এক জায়গায় কয়েকটা হীরা পড়ে আছে, দ্যাখে। হীরা দেখে তার মনে হল, ‘এগুলিকে মাটী চাপা দিয়ে রাখি, কি জানি আমার স্ত্রী যদি দেখতে পায়, তবে লোভ জন্মাতে পারে। সে তাই মনে করে ঐগুলোর উপর মাটী চাপা দিচ্ছে, এমন সময় তার স্ত্রী তা দেখতে পেয়ে কাছে এসে বল্লে, “হ্যাঁগা তুমি কি কচ্ছিলে?” স্বামী থতমত খেয়ে গেল। স্ত্রী যাই পা দিয়ে ধূলো সরিয়েছে অমনি হীরাগুলো দেখলে পেলে ও বল্লে, “এখনও হীরা মাটী তফাৎ বোধ রয়েছে, তবে তুমি বনে এলে কেন?” মনে ত্যাগ হলেই হল, তাহলেও সন্ন্যাসী। কিন্তু বাসনায় আগুন দিতে হয়, তবে তো।
সন্ন্যাসী স্ত্রীলোকের চিত্রপট পর্য্যন্ত দেখবে না। সাধারণ লোকে তা পারে না। মেয়ে মানুষ ভক্ত হলেও তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটু কথা কবে, তাদের সঙ্গে বসে কথা কবে না। সাধুর মেয়ে মানুষ থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়। মেয়ে ভক্তেরা আলাদা থাকবে—পুরুষ ভক্তেরা আলাদা থাকবে। তবেই উভয়ের মঙ্গল। ওখানে সকলে ডুবে যায়।
সাধু সন্ন্যাসী নিজের মঙ্গলের জন্য কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করবে। হাজার ভক্ত হলেও মেয়েমানুষকে বেশীক্ষণ কাছে বসতে দিই না। একটু পরে বলি, তোমরা ঠাকুর দেখগে। তাতেও যদি না উঠে, নিজে তামাক খাবার নাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমার দেখে আবার সবাই শিখবে। সিদ্ধ হলেও সন্ন্যাসীর এ কঠিন নিয়ম কেন? তার নিজের মঙ্গলের জন্য, আর লোক শিক্ষার জন্য, এইরূপ করতে হয়। ন্যাসীসন্ন্যাসী—জগদ্‌গুরু!—তাকে দেখে তবে তো লোকের চৈতন্য হবে। সন্ন্যাসীর পক্ষে স্ত্রীলোক থুথু ফেলে থুথু খাওয়া। চৈতন্যদেব লোক শিক্ষার জন্য সংসার ত্যাগ করলেন। সন্ন্যাসী নির্লিপ্ত হলেও, জিতেন্দ্রিয় হলেও, লোক শিক্ষার জন্য কাছে কামিনী কাঞ্চন রাখবে না।
সন্ন্যাসীর পক্ষে বীর্য্যপাত বড়ই খারাপ। এমন কি স্বপ্নেও যদি কামিনী সহবাস হচ্ছে বলে মনে হয়, আর তার দ্বারা বীর্য্যপাত হয়, তাহলে এতদিনের সাধন ভজন সব নষ্ট হয়ে যায়। সন্ন্যাসী যেমন মেয়ের পট পর্য্যন্ত দেখবে না, তেমনি, কাঞ্চন—টাকা—স্পর্শ করবে না। টাকাও সন্ন্যাসীর পক্ষে বিষ। কাছে থাকলে হিসাব, দুশ্চিন্তা, টাকার অহঙ্কার, দেহের সুখের চেষ্টা, লোকের উপর ক্রোধ এই সব আসে।
সাধুরা সঞ্চয় করবে না। ঈশ্বরের উপর ষোল আনা নির্ভর করবে। সংসারী লোকের টাকার দরকার আছে, কেননা, মাগ ছেলে আছে। তাদের খাওয়াতে হবে। তাই সঞ্চয়ের দরকার। পন্‌ছী (পাখী) আউর দরবেশ (সাধু) সঞ্চয় করে না। কিন্তু পাখীর ছানা হলে ছানার জন্য মুখে করে খাবার আনে, তখন সঞ্চয় করে। মৌমাছি অনেকদিন ধরে অনেক কষ্টে মধু সঞ্চয় করে। কিন্তু নিজে সে মধু ভোগ করতে পায় না। আর একজন চাক ভেঙ্গে নিয়ে যায়। মৌমাছির কাছে অবধুত এই শিক্ষা করলেন যে সঞ্চয় করতে নাই। কুমারকৃষ্ণ নন্দী সংকলিত ‘শ্রীরামকৃষ্ণ বাণী ও শাস্ত্রপ্রমাণ’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ