


প্রীতেশ বসু, কলকাতা; গলায় ঝুলছে দামি ক্যামেরা। কখনও সেই ক্যামেরায় লেন্সবন্দি হচ্ছে হাওড়া ব্রিজ, কখনও বিদ্যাসাগর সেতু বা হুগলি নদীর দু’পাড়। ‘ছবিশিকারী’ আর কেউ নন, বিজেপির ‘পোস্টার বয়’ নরেন্দ্র মোদি! ভোট প্রচারে এসে শুক্রবার সকালে গঙ্গাবক্ষে নৌকাবিহারে মেতে ওঠেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে সেসব ছবি ছড়িয়ে পড়ে সমাজ মাধ্যমে। তিনি নিজেও নৌকাবিহারের ছবি পোস্ট করে ‘গঙ্গার পবিত্রতা এবং ভারতের প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে এর নিবিড় যোগ’-এর কথা উল্লখে করেন। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি পরিচালিত উত্তরপ্রদেশ, বিহারের মতো ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যে গঙ্গা দূষণ রোধ প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে। সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরে ভোটের বাংলায় মোদির ‘ফটো সেশন’কে কটাক্ষ করছে রাজ্যের শাসক দল থেকে শুরু করে আম জনতা।
কী বলছে ‘ক্লিন গঙ্গা’ নিয়ে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি করা কেন্দ্রীয় রিপোর্ট? উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ—এই পাঁচ রাজ্যের ১১২টি জায়গায় গঙ্গার জলের গুণমান যাচাই করা হয় পর্ষদের তরফে। তাতে পাওয়া তথ্য এবং ২০১৮ সালে ওই সব জায়গার দূষণ মাত্রা তুলনা করে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে উন্নত হয়েছে। যা এখনও করে উঠতে পারেনি উত্তরপ্রদেশ এবং বিহার। উত্তরপ্রদেশে বিজনৌর থেকে তড়িঘাট, গঙ্গার এই এক হাজার কিলোমিটার অংশ দূষণে জর্জরিত। অপরিস্রুত তরল বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য দেদার মিশছে গঙ্গার জলে। বিহারের ভাগলপুর থেকে খালগাঁও পর্যন্ত অবস্থাও প্রায় এক। তাই এই অংশে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ করা উচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে কেন্দ্রের ওই রিপোর্টে। বাংলার ক্ষেত্রে বহরমপুর থেকে ডায়মন্ডহারবার পর্যন্ত গঙ্গার অংশকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও ধারাবাহিক পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি এখন উন্নত বা ‘ইমপ্রুভড’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে কেন্দ্রের তরফেই।
এদিন সকালে মোদিকে গঙ্গাবিহার করতে দেখে তাঁর ভক্তকূলকে পাড় থেকে ‘মোদি-মোদি’ স্লোগান দিতে দেখা গেল। কিন্তু মোদি এলাকা ছাড়তেই কানে এল সমালোচনার স্বর! এক আগন্তুক বলছিলেন, ‘২০১৪ সালে ভোটে জিততে গঙ্গা দূষণ সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। উত্তরপ্রদেশ-বিহারে তো কিছুই হয়নি বলে শুনেছি। এখানে সব তো দিদি সাজিয়েছে। সেটাই ছবি তুলে রাখলেন বোধ হয়।’ মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গঙ্গা ভাঙন ইস্যুতে মোদির মৌনতা নিয়ে কটাক্ষ করলেন কেউ কেউ।
গঙ্গা দূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, অত্যাধুনিক শ্মশানঘাট থেকে শুরু করে নানা পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ করে পুরদপ্তরের অধীন নির্দিষ্ট স্টেট প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ। এ বিষয়ে রাজ্যের পুরমন্ত্রী তথা কলকাতা বন্দর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘আমরা খুশি যে উনি এখানে এসে নৌকায় বসে দিদির মস্তিষ্কপ্রসূত সৌন্দর্যায়নে সেজে ওঠা পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ছবি তুললেন। এটাই দ্বিচারিতা। একদিকে তুমি সৌন্দর্যায়ন উপভোগ করে ছবি তুলছ, আবার মঞ্চে গিয়ে বাংলার নিন্দা করছ। মানুষ এই দ্বিচারিতার জবাব দিচ্ছে ভোটবাক্সে।’
সেচমন্ত্রী তথা সবংয়ের তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়া বলেন, ‘ভাঙন আটকাতে টাকা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওরা একটা টাকাও দেয়নি। মানুষের জমি- বাড়ি সব চলে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি, প্রতিনিধি দলের অনুরোধ, একাধিক বৈঠক সত্ত্বেও একটা টাকা দেয়নি মোদি সরকার। এখন ভোটের আগে বাংলাদরদি সাজার চেষ্টা করছেন তিনি!’