ধন্বন্তরি পুজোর দিন অনুষ্ঠিত হয় ধনতেরস। হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে এই তিথিতে ধন্বন্তরিদেব সমুদ্রমন্থনের সময় আবির্ভূত হন। তিনি এক হাতে অমৃত পাত্র, অন্য হাতে আয়ুর্বেদ। তিনি দেবগণের বৈদ্য।
এই উৎসবটি লক্ষ্মীপুজো হিসেবে পালিত হয়। এদিন মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। মহারাষ্ট্রে গুড়ের সঙ্গে শুকনো ধানের বীজের মিশ্রণ তৈরি করে উপচার হিসেবে দেওয়া হয়। চালের গুঁড়ো ও সিঁদুর দিয়ে ছোট ছোট লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ সারা বাড়িতে আঁকা হয় যাতে দেবী লক্ষ্মীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আগমন বোঝা যায়। ধনতেরসের রাতে লক্ষ্মী ও ধন্বন্তরির সামনে সারারাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়। হিন্দুরা এই দিনটিতে নতুন সোনা রুপোর গয়না কেনাকে অত্যন্ত শুভ মনে করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই শুভদিনে মূল্যবান ধাতুর তৈরি জিনিস যেমন— সোনা-রুপোর গহনা, দেবদেবীর মূর্তি ঘরে নিয়ে আসা সৌভাগ্যের লক্ষণ। এছাড়াও রান্নাঘরের ও ঠাকুরের জিনিস তথা বাসন, প্রদীপ, ঘণ্টা, গামলা, ঘটি, যন্ত্রপাতি, গাড়ি, ইলেক্ট্রনিক্স দ্রব্যাদি কেনা অত্যন্ত শুভ। ঘরের চৌকাঠে প্রদীপ প্রজ্বলিত করা হয়। এই প্রদীপ অকাল মৃত্যু এড়াতে দীপাবলির উৎসবের দিন যম দেবতার কাছে অর্ঘ্য হিসাবে প্রদান করা হয়।
এদিন চাষিরা গৃহের গবাদি পশুর বিশেষ যত্ন ও পুজো করে থাকেন। ত্রিদোষের প্রতিকার হেতু দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে নরক চতুর্দশীতে সূর্যোদয়ের পূর্বে বাড়ির মেয়ে জামাইকে মারাণ্ডু খাওয়ানোর রীতি আছে। গুজরাতিরা এই দিন নতুন বছরের শুভারম্ভ হিসাবে মালপোয়া তৈরি করেন। এদিন সমুদ্র মন্থনের সময় দেবী লক্ষ্মী স্বয়ং দুধসাগর থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই এই দিন দেবী লক্ষ্মীর পুজো করা হয়। যেহেতু লক্ষ্মী ধনের দেবী সেই জন্য এই ধন রক্ষা করার জন্য কুবেরেরও পুজো করা হয়ে থাকে। কিংবদন্তি অনুসারে, রাজা হিমের ১৬ বছর বয়সে পুত্রের বিবাহের চতুর্থ দিনে সাপের কামড়ে মৃত্যুর পূর্বাভাস ছিল। সেই দিন নববধূ তার সমস্ত অলংকার, মুদ্রা, সোনার গহনা গৃহের শয়নকক্ষে দরজার সামনে জড়ো করে রেখেছিলেন। যমরাজ সাপের ছদ্মবেশে রাজকুমারের দরজার সামনে এলে প্রদীপ ও গহনার উজ্জ্বল আলোকে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। যার ফলে যমরাজ কিছু দেখতে পান না ও নিঃশব্দে সেখান থেকে বিদায় নেয়। নববধূর বুদ্ধিতে যুবরাজ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান বলে সেই জন্য এই প্রদীপকে যমদীপ বলা হয়। উত্তর ভারতে এই দিনটি ছোট দেওয়ালি নামে খ্যাত।
জৈন মতে, ৫২৭ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহাবীর নির্বাণ লাভ করেছিলেন। তিনি এই দিন পার্থিব জগতের মায়া ত্যাগ করে মোক্ষের পথে ধ্যানমগ্ন হন। সেই জন্য এই দিনটিকে জৈনরা অত্যন্ত শুভ দিন বলে মনে করেন। হিন্দুদের দিনটি অন্ধকার নাশ করে জ্ঞানের উন্মেষ ঘটানোর দিন। উপনিষদ এই কথাই বলেছেন—
অসতো মা সত্গময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়।
মৃত্যোর্মা অমৃতংগময়
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ।।
অসৎ হতে সত্যে নিয়ে যাও, অন্ধকার হতে জ্যোতিতে নিয়ে যাও, মৃত্যু হতে অমরত্বে নিয়ে যাও। সর্বত্র যেন ছড়িয়ে পড়ে শান্তির বার্তা।
হিন্দুরা এদিন গৃহে সারি সারি প্রদীপ জ্বালান, দীপাবলির অর্থ প্রদীপের সমষ্টি, প্রদীপের আলোয় স্বর্গের দেবতাদের গৃহে বরণ করে নেওয়া হয়। নতুন পোশাক ও মিষ্টি পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে দানের প্রচলন আছে।
এদিন শ্রীরামচন্দ্র ১৪ বছর বনবাসের পর অযোধ্যায় ফিরে আসেন। অযোধ্যাবাসী তাঁদের প্রিয় রাজাকে ফিরে পেয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে বরণ করেছিলেন।
১৬১৯ খ্রিস্টাব্দের ষষ্ঠ শিখ গুরু হরগোবিন্দ মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদাসহ পালন করেন। আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর এই দিনে মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল, আর্য সমাজিরা এই দিন নব শস্যেষ্টি হিসেবে পালন করেন।
আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরসের মাধ্যমে দীপাবলির উৎসবের সূচনা আর কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব (দুর্গোৎসব) শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলির উৎসব শুরু হয়। দীপাবলির উৎসব ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অর্থবর্ষের সূচনা।
এবার ১৪৩২ সালের ৩১ আশ্বিন, ইংরেজি ১৮ অক্টোবর ২০২৫, শনিবার ধনতেরস পালিত হবে।
দীপদান মন্ত্র: মৃত্যুনা পাশদণ্ডাভ্যা কালঃ শ্যামলয়া সহ। ত্রয়োদশ্যা দীপদানাৎ সূর্য্যজঃ প্রীয়তামিতি।।
দ্বিতীয় দিন ১ কার্তিক ১৪৩২, ইংরেজি ১৯ অক্টোবর ২০২৫ রবিবার ভূত চতুর্দশী হিসেবে পালন করা হবে। বাঙালিরা বাড়িতে ১৪ প্রদীপ জ্বালান।
দীপ দান মন্ত্র:
নমঃ পিতৃভ্য প্রেতভ্য নমো ধর্মায় বিষ্ণবে।
নমো ধূম্রায় রুদ্রায় কান্তারপতয়ে নমঃ।।
এই মন্ত্র বলতে বলতে বাড়ি আলোকিত করেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে পিতৃপুরুষের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পাঠানো হয় যাতে তাঁরা এই শুভদিনে সবাইকে শুভাশিস দিয়ে কৃতার্থ করেন।
চতুর্দশ দীপদানের মন্ত্র
নমঃ পিতৃভ্য প্রেতেভ্যো নমো ধর্মায় বিষ্ণবে।
নমো ধুম্রায় রুদ্রায় কান্তারপাতয়ে নমঃ।
তৃতীয় দিন সোমবার ২ কার্তিক ১৪৩২ ইংরেজি ২০ অক্টোবর ২০২৫। কার্তিক আমাবস্যার দিন উত্তর ভারতে লক্ষ্মীর পুজো হয়। বাঙালিরা কালীপুজোর উৎসব পালন করেন। ঘটি অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গবাসীরা বাড়িতে অলকক্ষ্মীর বিদায় করে লক্ষ্মীপুজো করেন। দিবা ৩:৪৫ গতে অক্ষয় স্নান। রাতে করতোয়া স্নান (গঙ্গা স্নান) স্নান মন্ত্র— ‘করতোয়ে সদানীড়ে সরিচ্ছ্রেষ্ঠে সুবিশ্রুতে। পৌন্ড্রান্ প্লাবয়সে নিত্যং পাপং হর করদ্ভবে ।।/’
গোস্বামী মতে শ্রীশ্রীধর্মরাজ পুজো। চতুর্দ্দশ যমতর্পণ। ভূত-চতুর্দ্দশী কৃত্যম। আচারাৎ চতুর্দ্দশ শাক ভক্ষণ।
পণ্ডিত রঘুনন্দন মতে ১৪ শাক, যথা— ওল, কেউ, বেতো, কালকাসুন্দে, নিমপাতা, জয়ন্তী, সরিষা, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ঘেটু, শুষনি। কিন্তু এ বিষয়ে নামান্তর আছে।
কালীপুজো হবে নিশীথ কাল রাত্রি ঘ: ১০/৫৮ গতে রাত্রি ঘ: ১১/৪৬ মধ্যে। তারা দেব্যাবির্ভাব। কালরাত্রি নিমিত্তানুষ্ঠান। ভৈরবী চক্রানুষ্ঠান। অমাবস্যার নিশি পালন। এই সঙ্গে চলে হনুমান জন্মদিন (উত্তর ভারত), দীপাবলি (দক্ষিণ ভারত)। চতুর্থদিন ৩ কার্তিক ১৪৩২ ইংরেজি ২১ অক্টোবর ২০২৫ বুধ-মঙ্গলবার শুক্লা প্রতিপদ অমাবস্যার ব্রতোপবাস। দীপান্বিতা পার্বণশ্রাদ্ধ। দীপান্বিতা কৃত্যম। দীপাবলি (দেওয়ালি)।
৪ কার্তিক ১৪৩২, ২২ অক্টোবর, এইদিন গোবর্ধন পুজো ও পরিক্রমা, অন্নকূট মহোৎসব। প্রদোষে বলিদৈত্যরাজ পুজো হয়ে থাকে।
পঞ্চম দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ৫ কার্তিক ১৪৩২ ইংরেজি ২৩ অক্টোবর ২০২৫, ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা, উৎসবের শেষ দিন। পুরাণ অনুযায়ী এই দিন যমুনা তার ভাই যমকে ফোঁটা দিয়েছিলেন। অন্য মতে নরকাসুর নামে দৈত্যকে বধ করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে ফোঁটা নিয়েছিলেন।
৩১ আশ্বিন শনিবার ১৪৩২, ইংরেজি ১৮ অক্টোবর ২০২৫-এ ত্রয়োদশী তিথি ১৮ অক্টোবর দুপুর ১২:১৮ শুরু হবে এবং ১৯ অক্টোবর দুপুর ১:৫১ পর্যন্ত থাকবে। ধনতেরসের পুজোর শুভ মুহূর্ত সন্ধ্যা ৭:১৬ থেকে রাত ৮: ২০ পর্যন্ত। সময়কাল এক ঘণ্টা ৪ মিনিট। এইদিন দেবী লক্ষ্মী-কুবের ও বিষ্ণুপুজো করার শুভ সময়।
ধনতেরসে নতুন জিনিস কেনা সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দ্বার খুলতে সাহায্য করে। সোনা রুপোর গয়না, মুদ্রা এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETFs) বা ওই ধাতুগুলি বৈদ্যুতিন আকারে বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করতে পারেন। বিমাও করতে পারেন। এতে আপনার বিনিয়োগ ছাড়াও পরিবারের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বাড়ি কেনার জন্য ধনতেরস সবথেকে ভালো দিন। ব্যাঙ্ক পোস্ট অফিসে ফিক্সড ডিপোজিট বা রিয়েল এস্টেটের কথাও ভাবতে পারেন। শখের গাড়ির জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে। মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন।
এছাড়া ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যাদি অর্থাৎ টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ল্যাপটপ কিনতে পারেন, যা আপনার কর্মের প্রগতিতে সাহায্য করবে এবং আপনাকে অনেক ভালো জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে।
এই শুভদিনে আপনি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র, ছুরি, কাঁচি, প্লাস্টিক ও কাচের পাত্র কিনবেন না। এগুলিকে অশুভ মনে করা হয়।
উৎসবের দিনে তেল বা ঘি না কেনার চেষ্টা করুন।
তবে নুন, ঝাঁটা কিনতে পারেন। বাড়ির ঝাঁটায় পা দিয়ে মাড়াবেন না। নুন কিনে ঘরের কোণে লুকিয়ে রাখুন, ওই নুন দিয়ে পরের দিন ঘর মোছার কাজে ব্যবহার করুন। এছাড়া ধনে বীজ, কাঁচা হলুদ, রুদ্রাক্ষের মালা, স্ফটিকের মালা, পদ্মবীজের মালা, কড়ি, দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ কিনে ঘরে আনা অত্যন্ত শুভ।
বাড়ির দক্ষিণ দিক মুখ করে প্রদীপ জ্বালান। এটি পরিবারের অকাল মৃত্যু এড়াতে সাহায্য করে। প্রদীপের চারটে মুখ থাকবে। চারদিকে চারটে পলতে দিয়ে প্রদীপটাকে ধরাবেন, কিছুটা গম ছড়িয়ে তার ওপরে প্রদীপটা জ্বালাবেন।
এদিন লাল, হলুদ, কমলা রঙের পোশাক পরিধান করুন। কালো পোশাক এড়িয়ে চলুন। চুল কাটা যাবে না। মাদক সেবন এড়িয়ে চলুন, পেঁয়াজ-রসুন খাবেন না, নিরামিষ আহার খান। এবছর ত্রয়োদশী তিথি শুরু হবে ৩১ আশ্বিন, ১৪৩২ ইংরাজি ১৮ অক্টোবর ২০২৫ শনিবার দিবা ১টা ২১ গতে। শেষ হবে ১ কার্তিক ১৪৩২ ইংরেজি ১৯ অক্টোবর ২০২৫ রবিবার দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে।
যমদীপ দানের শুভ সময় রবি বার রাত ৫:০৬ থেকে রাত ৬টা ৪২ মধ্যে ও রাত ৭টা২৬ গতে ৯টা ১০ মধ্যে ও ১১টা ৪৭ গতে ১টা ৩১ মধ্যে ও ২:২৩ গতে ৫:৪০পর্যন্ত।
কেনাকাটার শুভ মুহূর্ত
১৯ অক্টোবর দিবা ৬টা ৩৬ গতে



