স্বাধীন সার্বভৌম সুপ্রাচীন দেশ আমাদের। সীমান্ত সুরক্ষা, অখণ্ডতার নিশ্চয়তা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের। ভারতের স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বিদেশ মন্ত্রক মিলিতভাবে এই গুরুদায়িত্ব পালন করে। এই প্রশ্নে রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয়ের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, বহু দলীয় গণতান্ত্রিক রীতিতে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রে সরকার গঠিত ও পরিচালিত হয়। স্বভাবতই বিবিধ বিষয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যই দস্তুর। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে ঐক্য এবং সংহতির কোনও খামতি এদেশ কখনও দেখেনি। কেন্দ্রে যে দল বা রঙেরই সরকার থাক না কেন, তাদের তরফে গৃহীত সিদ্ধান্তে রাজ্যগুলিও নিঃশর্তে সিলমোহর দিয়ে থাকে। যেমন পশ্চিমবঙ্গ হল দেশের পূর্ব সীমান্তের একটি বড় রাজ্য। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত দৈর্ঘ্য ২২১৭ কিমি, দেশের কোনও রাজ্যের এটাই হল দীর্ঘতম সীমান্ত। বঙ্গোপসাগরে এরাজ্যের জলসীমান্তের দৈর্ঘ্যও ফেলনা নয়—১৫৭.৫ কিমি। ফলে সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে বাংলার সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে নিরন্তর কাজ করে যাওয়াই কেন্দ্রের কাছে কাম্য। কিন্তু সীমান্ত টপকে বিদেশি নাগরিক এবং জঙ্গিদের এপার বাংলায় অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বারবার বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। উপর্যুপরি প্রশ্নের মুখে পড়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ভূমিকা। সাম্প্রতিক অতীতে মুর্শিদাবাদ ও মালদহে দাঙ্গার ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সরাসরি বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন।
বাংলায় ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের দামামা ইতিমধ্যেই বাজিয়ে দিয়ে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। দিনকয়েক বাদে বাংলায় এসে তাতেই সংগত করে গিয়েছেন দলে এবং সরকারে মোদিজিরই ডানহাত বলে পরিচিত শাহ। পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁদের একহাত নিয়েছেন। ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে যে, দিল্লির গেরুয়া কর্তাদের ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’র সঙ্গেই বাড়তে থাকবে সীমান্ত সুরক্ষা বিষয়ক তরজা। মোদি-শাহদের পহেলগাঁও ব্যর্থতার নিন্দা শুরু হতেই বাংলার সরকারকে কাঠগড়ায় তুলতে তৎপর হয়েছে বিজেপি। তাতে ধুয়ো দিচ্ছেন মোদি এবং শাহ উভয়েই! এই প্রেক্ষাপটে তাঁদের অভিযোগ, সীমান্ত সুরক্ষায় চাহিদামতো জমি দিতে পারছে না মমতার সরকার। ফলে ব্যাহত হচ্ছে সীমান্তের নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ঠেকানোর কর্মসূচি। কিন্তু বাস্তব কি অন্য কথা বলছে না? ভোটারদের বোকা বানাতে সবটাই কি পিঠ বাঁচাবার গেরুয়া কৌশল নয়? রাজনৈতিক কারণে মোদি সরকারের মিথ্যাচারের প্রমাণ মিলেছে প্রশাসনিক সূত্রেই। ২৯ মে লিখিত ইন্ডিয়ান কোস্টগার্ডের একটি চিঠি সামনে এনেছে রাজ্য ভূমিদপ্তর। তাতেই স্পষ্ট, ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীর চাহিদামতো জমি তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য রাজ্য মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছিল ২০২১-এর ৭ অক্টোবর। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় চারবছর। এখনও সেই জমি নেওয়ার প্রক্রিয়াই শুরু করেনি কেন্দ্র। উল্টে জমির দামের উপর যে ‘পেনাল ইন্টারেস্ট’ হয়, তা মকুব করে জমি নেওয়ার সময়সীমা আরও বৃদ্ধির জন্য তারা রাজ্যকে চিঠি দিয়েছে একাধিকবার।
সুন্দরবন এলাকায় অরক্ষিত জলসীমাকে সুরক্ষিত করার স্বার্থে ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী চিঠি দিয়ে রাজ্যের কাছে জমি চায়। কালবিলম্ব না করে নামখানা থানার ফ্রেজারগঞ্জে অমরাবতী মৌজায় ৯.২২ একর জমি পাকাপাকিভাবে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য মন্ত্রিসভা। সেখানে একটি ‘মেরিটাইম রেসকিউ সেন্টার’ (বিভিন্ন পরিকাঠামোসহ উপকূলরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটি) নির্মাণের কথা। বিষয়টিতে রাজ্য বিশেষ তৎপরতাই দেখিয়েছে। জমিটির জন্য কেন্দ্রের কাছে চাওয়া হয়েছে মাত্র ১৪.৯৩ কোটি টাকা। কিন্তু ওই টাকা না মিটিয়ে জমিটি ফেলে রাখা হয়েছে। নিয়মমাফিক পেনাল ইন্টারেস্টও তারা দেয়নি। উল্টে পেনাল ইন্টারেস্ট মকুব এবং জমি নেওয়ার সময়সীমা বৃদ্ধির আর্জি জানিয়েছে কেন্দ্র। রাজ্য ফের মঞ্জুর করেছে তা। এই দফায় ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়। সেই সময়সীমাও ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত। এই অবস্থায় ফের ২৯ মে রাজ্যকে চিঠি দিয়ে কেন্দ্র পূর্বের আর্জিরই পুনরাবৃত্তি করেছে। সময়সীমা আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়াবার আবদার তাদের। দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে রাজ্য ফের তা মঞ্জুর করবে হয়তো। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুতর বিষয়েও মোদি সরকারের ধারাবাহিক উদাসীনতা কিন্তু কোনোভাবেই চাপা পড়ছে না। এখানে রাজ্যের দোষটা কোথায়? দিল্লিওয়ালাদের এই একতরফা ব্যর্থতা রাজ্যের সঙ্গে লাগাতার বঞ্চনার মতোই নিন্দনীয়।