জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমায় জিএসটি শূন্য। দাম কমছে বহু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরও। এমনই এক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বুধবার নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকে। সিদ্ধান্তটি একইসঙ্গে বহু আকাঙ্ক্ষিত, স্বস্তিদায়ক এবং বিস্ময়কর। কারণ জিএসটি সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সাধারণ মানুষের মাথা মুণ্ডন করেই রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির নেশায় মেতে থাকে মোদি সরকার। তাই জনগণের ন্যায্য দাবি কানে তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি কখনও। শুধু করের বোঝা কমানোর দাবি নস্যাৎই নয়, জনস্বার্থবাহী বহু প্রস্তাবও বারবার অগ্রাহ্য করা হয়েছে মোদি জমানায়। তাই দেশবাসীর বিস্ময়ের অন্ত নেই। অবশেষে স্বাস্থ্যবিমা এবং জীবনবিমার প্রিমিয়াম জিএসটি মুক্ত হল। কমে যাচ্ছে ৩৩টি জীবনদায়ী ওষুধের দাম। এই সূত্রে ক্যান্সার চিকিৎসার খরচ কমতে পারে। এসি, ফ্রিজ, মোবাইল, ল্যাপটপের দামও এবার এসে যাচ্ছে সাধারণের সাধ্যের ভিতরে। সরকারের ঘোষণার আড়ালে কোনও চাতুরি না-থাকলে কমতে পারে বহু নিত্যপণ্যের দামও। আটা থেকে পাউরুটি, পনির থেকে ছোলা—নিত্যব্যবহার্য বহু খাদ্যকে জিএসটি শূন্য করা হচ্ছে।
জিএসটি ব্যবস্থা এতদিন বেশ জটিল ছিল। এবার তা অনেকটাই সরল করা হল। নতুন স্ল্যাব তিনটি—৫, ১৮ ও ৪০ শতাংশ। এই হার কার্যকর হবে বাঙালির উৎসব দুর্গাপুজোর আগেই, চলতি মাসের ২২ তারিখ থেকে। অর্থাৎ, পুজোর মুখেই দাম কমতে পারে টেক্সটাইল এবং রেডিমেড গার্মেন্টস, জুতোসহ অর্থনীতির আটটি কোর সেক্টরে উৎপন্ন জিনিসপত্রের। বুধবার রাতে এভাবেই দ্বিতীয় জিএসটি যুগের সূচনা করলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। উঠে যাচ্ছে ১২ ও ২৮ শতাংশের জিএসটি স্তর। এই নয়া করকাঠামোর সুবাদে ৪৭,৭০০ কোটি টাকার জিএসটি আদায় কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছে সরকার। তবে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলির মত অন্য। বাংলাসহ ওই আট রাজ্যের দাবি, ক্ষতির সর্বমোট পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লক্ষ কোটি টাকায়! বাংলার অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানান, এই পদক্ষেপে একা পশ্চিমবঙ্গেরই ক্ষতির বহর দাঁড়াবে ১০ হাজার কোটি টাকার আশেপাশে। দু’দিনব্যাপী জিএসটি কাউন্সিল বৈঠকের প্রথম দিনের শেষেই এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। নির্মলা সীতারামন ঘোষণা করেন, ৫ ও ১৮ শতাংশের স্ল্যাব দুটি থাকলেও বিলাসদ্রব্য, তামাক, ৫০ লক্ষ টাকার বেশি দামের গাড়িসহ বেশকিছু পণ্যের উপর জারি থাকবে ৪০ শতাংশ কর, যাকে বলা হয় সিন ট্যাক্স। প্রায় ১৭৫টি পণ্যের দামে বড়সড় রেহাই মিলতে চলেছে। দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দামের জুতো ও রেডিমেড পোশাক একটু সস্তা হবে। কিন্তু তার বেশি দামের পণ্যের ঘাড়ে চাপবে বাড়তি জিএসটি। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও বড়সড় রেহাই দেওয়া হয়েছে। তবে সর্বাধিক আকাঙ্ক্ষার জায়গাটি ছিল স্বাস্থ্যবিমা ও জীবনবিমা। এই দুই ধরনের বিমার প্রিমিয়ামের ঘাড় থেকে জিএসটি পুরো নামিয়ে দেওয়া হল।
এই দাবি সর্বপ্রথম উত্থাপন করেন বাংলার জনগণের নয়নের মণি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জননেত্রীর দাবি অতঃপর প্রতিধ্বনিত হয়েছে সবগুলি বিরোধী রাজ্যে। সব মিলিয়ে সেটি একদিন সারা দেশের দাবি হয়ে ওঠে এবং অবশেষে তা মেনে নিতে বাধ্য হন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এবার স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় প্রদত্ত ভাষণে নরেন্দ্র মোদি ‘দীপাবলির উপহার’ প্রদানের কথা ঘোষণা করেন। সেটি যে জিএসটিতে বড়সড় রেহাই তাও তিনি পরিষ্কার করে দেন। কিন্তু দীপাবলির অনেক আগেই তাঁর অর্থমন্ত্রী সেটি জানিয়ে দিলেন বিশদে। এই সিদ্ধান্ত দেশবাসীর বহু আকাঙ্ক্ষার। সরকারের কাছে লাগাতার দাবিও পেশ করা হয়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতরাও সরকারকে নানা উপলক্ষ্যে পরামর্শও দিয়েছেন। কিন্তু আট বছরেও সরকার উচ্চবাচ্য করেনি। এই প্রস্তাব আগে মেনে নিলে গরিব মানুষ অনেক বেশি সুরাহা পেত। তাদের কষ্টের বারোমাস্যা একটু সহনীয় হতে পারত। বৃদ্ধি পেত জিডিপি, সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় এবং অবশ্যই কমত ব্যক্তিগত ঋণ। তবু অনেক দেরিতে হলেও বাংলার দাবি মেনেছে মোদি সরকার। একে মন্দের ভালো বলাই যায়। এজন্য তাদের ধন্যবাদ দেওয়াই সৌজন্য। আবার এখানেই মনে পড়ে, ঠেলায় না পড়লে তো বিড়াল গাছে ওঠে না! তা মোদি সরকার ঠিক কোন ঠেলায় পড়ল? বৃদ্ধির মন্থর হার, পারিবারিক ঋণের বৃদ্ধি, পারিবারিক সঞ্চয় হ্রাস প্রভৃতি কি সরকারকে সবক শেখাল? নাকি বিহার, এবং অতঃপর বাংলার নির্বাচন টনক নড়িয়ে দিল? ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধেও যে মোদির ভারত বেকায়দায় পড়েছে, তাও সবার জানা। এগুলির ঠিক কোনটিতে, নাকি সবগুলির মিলিত ফল মোদিজির এই বিলম্বিত বোধোদয়?