Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বেনিয়াদের সেবায় নিবেদিত

দেশের মূল সমস্যা বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি। কোটি কোটি নারী-পুরুষ বেকার। বেকারশূন্য পরিবার প্রায় নেই। তার উপর গত সাতবছরে পুরুষদের প্রকৃত মাসিক মজুরি কমে গিয়েছে।

বেনিয়াদের সেবায় নিবেদিত
  • ৪ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশের মূল সমস্যা বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি। কোটি কোটি নারী-পুরুষ বেকার। বেকারশূন্য পরিবার প্রায় নেই। তার উপর গত সাতবছরে পুরুষদের প্রকৃত মাসিক মজুরি কমে গিয়েছে। ১২,৬৬৫ টাকা থেকে হয়েছে ১১,৮৫৮ টাকা। হ্রাস পেয়েছে স্বনিযুক্ত ব্যক্তিদেরও প্রকৃত মজুরি বা আয়। রয়েছে বহু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য। জিডিপি মাঝারি গতিতে বৃদ্ধি পেলেও বেকারত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে যুব শ্রেণি ও স্নাতকদের ভিতরে চাকরি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারটা থমকে রয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ অতিকষ্টে কিছু টাকা উপায় করলেও সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা চলে গিয়েছে তলানিতে। বিপদ সেখানেই আটকে নেই। এর উপর রয়েছে ভেজাল কারবারিদের দৌরাত্ম্য। অগ্নিমূল্যেও খাঁটি জিনিস অমিল। জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাবে কিন্তু ব্যবহার্য নিরাপদ জিনিস হাতে পাওয়ার কোনও গ্যারান্টি নেই। দেশবাসীকে এমনই জাঁতাকলে আগেই ফেলেছিল মোদি সরকার। চাল, ডাল, তেল, ঘি, দুধ, মাছ, মাংস থেকে বহু জিনিসই ভেজালে ভরপুর। কবি আগেই বলেছেন, ‘ভেজাল ছাড়া কোনও জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়’। ভেজাল খাদ্যকে আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ করে নিয়ে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছি আমরা। তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ভয় নেই বলে দেশবাসী প্রতিবাদ করতে ভুলে গিয়েছে। 

Advertisement

কিন্তু ভেজাল কারবারিদের দুঃসাহস এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে তারা ওষুধ নকলেও সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণ জ্বর, পেট খারাপের ওষুধ থেকে শুরু করে একাধিক জীবনদায়ী ওষুধও তারা হুবহু নকল করে ফেলেছে। তার মধ্যে ব্লাড প্রেশার, কোলেস্টেরল, হার্ট, ভার্টিগো প্রভৃতি মারাত্মক অসুখের ওষুধ নিয়ে বিরাট জালিয়াতি কারবার ফেঁদে বসেছে দুর্বৃত্তরা। জাল হচ্ছে স্যালাইন, ইঞ্জেকশন প্রভৃতিও। ফলে ওষুধ কিনতে গিয়ে ক্রেতারা দ্বিধাগ্রস্ত, এমনকী শঙ্কিতও। তাঁদের মনে এই প্রশ্নই সবসময় ঘুরপাক খায়—পয়সা তো যাচ্ছে, কিন্তু ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আসল ওষুধ পাচ্ছি তো? সত্যিই তো, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই কোটি কোটি টাকার জাল ওষুধের কারবার ধরা পড়ে গিয়েছে। জালিয়াত চক্রের জাল বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশসহ নানা রাজ্যে বিস্তৃত বলেও প্রমাণ মিলেছে ড্রাগ কন্ট্রোলের একাধিক অভিযানে। বহু ওষুধ, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরও কিছু রোগ সারছেই না। ডাক্তারের পরামর্শে একই ওষুধ বারবার খেতে বাধ্য হচ্ছেন বহু রোগী। এরপর এই ওষুধ নিয়ে সংশয়/প্রশ্ন না-ওঠার কোনও কারণ নেই। অবস্থা যখন এতটাই ভয়াবহ, তখনই সামনে এসেছে ৭৪৮টি জরুরি ওষুধের দামবৃদ্ধির আঘাত। সবার প্রশ্ন, ৭৪৮টি শিডিউলড ওষুধ এবং ৮০টি নন-শিডিউলড ওষুধের দাম ১ এপ্রিল থেকে বাড়ানো হল কোন হিসেবে? আম জনতাকে এতটা সঙ্কটে অতীতের কোনও সরকার ফেলেনি। 
স্বস্তির ব্যাপার এই যে, এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে অন্তত বাংলার মানুষ ফের পাশে পেয়েছে ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েও একদা বিরোধী নেত্রীর মতোই প্রতিবাদী চরিত্র অটুট রেখে দিতে পেরেছেন। ওষুধের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি নিয়ে মোদি সরকারকে একহাত নিয়েছেন তিনি। বুধবার নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। হার্টের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩১.৮ শতাংশ। ১১৫.৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এক ধরনের কোলেস্টেরলের ওষুধের দাম। ডাক্তাররা যখন এসব ওষুধ প্রেসক্রাইব করবেন, তখন তো রোগীদের অস্বাভাবিক বেশি দামেই তা কিনতে হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আর কত টাকা পেলে এই জুমলাবাজি বন্ধ করবে মোদি সরকার? শুধু নির্বাচনের সময়ই তাদের বড় বড় কথা। এই দামবৃদ্ধি কাদের স্বার্থে? এক শ্রেণির কোটিপতির জন্য নয় কি?’ ওষুধের লাগামছাড়া দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস পথে নামছে। জানিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। আজ শুক্রবার এবং আগামী কাল শনিবার বিকেলে রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে এক ঘণ্টার জন্য মিছিল ও প্রতিবাদ সভা হবে। তারপরও কেন্দ্র দাবি না মানলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী যথার্থ প্রশ্নই তুলেছেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার আছে কী করতে! ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রক সংস্থা) কী করছে?’ আমরা জানি, ওষুধের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি এটাই প্রথম নয়। নিরীহ নাগরিকদের ঘাড়ে এই বিপদ বারংবারই নেমে আসে। প্রস্তুতকারকদের অন্যায্য দাবিই বরাবর গুরুত্ব পায়। তার বিপরীতে উপেক্ষিত হয়ে চলেছে মানুষের উদ্বেগ, যন্ত্রণার দিকগুলি। মোদি সরকার এইভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, মানুষের ভোটে জিতে এসে তারা কেবলই বেনিয়াদের সেবায় নিবেদিত প্রাণ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ