Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধর্মের ফাঁদে পা দিলেই বিপদ

ছাব্বিশের ভোট যত এগিয়ে আসছে, হিন্দুত্বের লাইনকে ততই আঁকড়ে ধরছে বিজেপি। তারজন্য বঙ্গ বিজেপির নেতারা একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করে চলেছেন।

ধর্মের ফাঁদে পা দিলেই বিপদ
  • ২২ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ছাব্বিশের ভোট যত এগিয়ে আসছে, হিন্দুত্বের লাইনকে ততই আঁকড়ে ধরছে বিজেপি। তারজন্য বঙ্গ বিজেপির নেতারা একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করে চলেছেন। উস্কানিতেই স্পষ্ট, ছাব্বিশের ভোটে সুস্পষ্ট মেরুকরণ ঘটানোই গেরুয়া শিবিরের লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যেই ফাঁদ পেতেছে বিজেপি। রাজ্যের শাসক দলের কেউ কেউ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু কিছু নেতা ‘হিরো’ সাজতে গিয়ে পাল্টা সুর চড়াচ্ছেন। তাতে প্রশস্ত হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতির পথ। এসব করে রাজনীতির কারবারিরা হয়তো সাময়িক লাভবান হবেন, কিন্তু রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলা তাঁদের কখনওই ক্ষমা করবে না।

Advertisement

বঙ্গ বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ৭৭ থেকে কমতে কমতে এখন ৬৫। নির্বাচন পর্যন্ত সংখ্যাটা কোথায় নামবে, তা নিয়ে চলছে জোর চর্চা। রাজ্যের শাসক দল বলছে, হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডলের পর লাইনে আছেন আরও অনেকে। ঘাসফুল শিবিরের এই দাবি জোর গলায় উড়িয়ে দিতে পারছে না বিজেপিও। কারণ নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, নৌকা ফুটো হয়ে গিয়েছে। জল ঢুকছে হু-হু করে। ডুবে যাওয়া আশঙ্কায় লাফ মারার জন্য তলে তলে ‘কাছা’ বাঁধছেন অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে অন্যের ঘর ভাঙা নয়, নিজের ঘর সামলানোই বঙ্গ বিজেপির চ্যালেঞ্জ। অনেকেই বলছেন, বঙ্গে ছাব্বিশে হতে পারে একুশের উলটপুরাণ। 
রাজনীতিতে দলবদল নতুন কিছু নয়। তবে নির্বাচন এলে দল বদলের হিড়িক পড়ে যায়। একুশের নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভয় দেখিয়ে ও ‘গাজর’ ঝুলিয়ে একের পর এক তৃণমূল নেতাকে বিজেপিতে যোগদান করিয়েছিল। ছাব্বিশের ভোটের আগে সেই দৃশ্য আর দেখতে পাওয়া যাবে না। বরং ঘটতে পারে উল্টোটা। কারণ মণ্ডল ও জেলা সভাপতি নির্বাচন ঘিরে বিজেপিতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেড়েই চলেছে। তার উপর টিকিট এবং পদ না পাওয়া নেতারা তাপসী মণ্ডলের রাস্তায় হাঁটলে তো কথাই নেই।
এছাড়াও গোদের উপর বিষ ফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বঙ্গ বিজেপির সভাপতি নির্বাচন। হঠাৎ করেই কোণঠাসা দিলীপ ঘোষকে ‘জামাই আদর’ করা শুরু হয়েছে। তাতে দিলীপবাবুর অনুগামীরা অক্সিজেন পেতে শুরু করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতির জন্য যদি সুকান্ত মজুমদারকে সরতেই হয়, তাহলে দিলীপবাবুর শিবিরের উপরেই ভরসা রাখবে দল। দিলীপবাবুকে সভাপতি না করলেও তাঁরই ঘনিষ্ঠ কাউকে বেছে নেবে। সেটা হলে লোকসভা নির্বাচনে দিলীপবাবুকে হারানোর ‘মধুর প্রতিশোধ’ ছাব্বিশের ভোটেই তুলে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলবে। আর তার প্রক্রিয়া শুরু হবে প্রার্থী তালিকা তৈরি থেকেই।
সাংগঠনিক শক্তির উপর দাঁড়িয়ে বিজেপি জিততে পারে, বাংলায় এমন আসনের সংখ্যা একেবারেই আঙুলের গাঁট গোনা। দিল্লির নেতারাও সেটা জানেন। এই শক্তি নিয়ে ছাব্বিশের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই লড়াইয়ের রসদ হিসেবে হিন্দুত্বকেই বেছে নিয়েছে বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের ১০দিন বাংলায় কাটিয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। যদিও সঙ্ঘের কর্তাদের দাবি, এই সফরসূচি অনেক আগেই ঠিক করা ছিল। এর সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক নেই।
একথা ঠিক, আরএসএস সাধারণত বিজেপির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বা সরকারের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু বিজেপির ‘পিচ’ তৈরির দায়িত্বটা তাদের উপরেই থাকে। আরএসএস চায়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত করার অনুকূলে সরকার সিদ্ধান্ত নিক। বিভিন্ন সময় আরএসএস এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে। ক্ষমতার দম্ভে নরেন্দ্র মোদি যখন নিজেকে ঈশ্বরের দূত বলে ঘোষণা করেছিলেন, তখন প্রথম প্রতিবাদটা এসেছিল সঙ্ঘ থেকেই। বিজেপি ‘সাবালক’ হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝেছে, ফল ভালো হবে না। তাই বাড়ছে সঙ্ঘের উপর নির্ভরতা।
দিল্লি বিজেপি মনে করেছিল, আর পাঁচটা দলের মতোই কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ঘায়েল করা যাবে। তাই সিবিআই, ইডির মতো তাবড় তাবড় কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে মাঠে নামিয়েছিল। কিন্তু ফায়দা তুলতে পারেনি। বাংলায় একের পর এক নির্বাচনে বিজেপি গোহারা হেরেছে। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘হাওয়া’য় নয়, কুর্সিতে বসেছেন লড়াই ও সংগ্রামের পথ বেয়ে। আর ক্ষমতায় বসে ধাপ্পা দেননি। তিনি গিমিকের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন বলেই প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তাই নির্বাচনী কৌশল ঠিক করার জন্য তাঁকে গবেষণা করতে হয় না। কিন্তু বিজেপিকে নির্বাচন ভিত্তিক ইস্যু তৈরি করতে হয়।
ছাব্বিশের নির্বাচনে স্ট্র্যাটেজি বদলেছে বিজেপি। এখন আর কয়লা, বালি, গোরু পাচার, নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে বিজেপি নেতারা গলা ফাটান না। কারণ অনুব্রত মণ্ডল, মানিক ভট্টাচার্য, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকদের গ্রেপ্তার করলেও কেন্দ্রীয় এজেন্সি তাঁদের জেলে আটকে রাখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি। তাঁরা জেল থেকে বেরিয়ে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফলে আঙুল উঠছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ও বিজেপি সরকারের দিকেই।
তবে, এরপরেও নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ফের সক্রিয় হবে। কিন্তু তাতে যে লাভ হবে না, সেটা বিজেপি নেতারাও জানেন। তাই বাংলাতেও হিন্দুত্বকেই আঁকড়ে ধরছে। তারজন্য কখনও রামমন্দির, কখনও কুম্ভমেলা, কখনও রামনবমীকে হাতিয়ার করছে। অসম্পূর্ণ রামমন্দিরের উদ্বোধন করা হয়েছিল। ভেবেছিল, রামমন্দির ইস্যু চব্বিশের ভোটে বিজেপিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেবে। কিন্তু রামমন্দির বিজেপিকে ‘ডিভিডেন্ট’ দেয়নি। খোদ অযোধ্যাতেও হেরেছে বিজেপি। কুম্ভমেলায় প্রচুর মানুষ স্নান করলেন। তা নিয়ে এমন প্রচার চলল, যত মানুষ প্রয়াগরাজে গিয়ে স্নান করেছে সকলেই বিজেপি ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু সত্যিই কি তাই? মানুষ উৎসবে শামিল হয় মনের টানে। তারসঙ্গে রাজনীতিকে মিলিয়ে ফেলাটা মস্ত বড় ভুল। এই যেমন ধরুন, দুর্গাপুজো কার্নিভাল শুরু করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কার্নিভালে প্রচুর মানুষ ভিড় করে। তাদের সবাই কি তৃণমূল সমর্থক? নাকি পুজোর অনুদান পাওয়া সব ক্লাবের সদস্য তৃণমূলকে ভোট দেন? নিশ্চয়ই দেন না। 
তারপরেও বিজেপি ধর্মকেই ছাব্বিশের ভোটে হাতিয়ার করতে চাইছে। বিভাজন রেখা স্পষ্ট করার লক্ষ্যে এমন সব কথা বলছে যাতে মানুষ নিজেকে ‘মানুষ’ না ভেবে একটি ধর্মের সমর্থক বলে ভাবতে শেখে। আর সেই উদ্দেশ্য তখনই সফল হয় যখন উল্টোদিক থেকে তার জবাব আসে। অস্বীকার করার উপায় নেই, বিজেপির ফাঁদে পা দিয়েছে তৃণমূলের একাংশ। ‘চ্যাংদোলা’র পাল্টা ‘ঠুকে দেব’। এসব চলতে থাকলে ভোটে বিজেপির লাভ না ক্ষতি, সেটা সময় বলবে। কিন্তু মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল হবে। এরপর বিজেপি এমন সব কথা বলবে, এমন ঘটনা ঘটাবে যাতে মানুষের মধ্যে সুপ্ত ধর্মীয় সত্তা উগ্ররূপ ধারণ করে। বিপদটা সেখানেই। তাতে সামাজিক স্থিতি বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
সামনেই রয়েছে রামনবমী, ঈদ, হনুমান জয়ন্তীর মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান। মানুষ উৎসবে মাতে মনের আনন্দে। কিন্তু এখন উৎসব, অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে চলছে বাজার গরম করার চেষ্টা। তাতে উৎসব ঘিরে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে স্লোগান উঠত, ‘হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই।’ এটাই প্রকৃত ভারতবর্ষ। আর এখন? পোস্টার পড়েছে, ‘হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই/ রামনবমীতে এক থাকা চাই।’ এতেই উঠেছে প্রশ্ন, রামনবমীতে এক থাকার বার্তা কেন? তাহলে কি কোনও গণ্ডগোলের ছক কষা হচ্ছে, নাকি কেবলই ছন্দ মেলানোর তাগিদ?
একুশের ভোটে বিজেপির হাতিয়ার ছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি। ইস্যু ছিল দুর্নীতি। কিন্তু লাভ হয়নি। গেরুয়া শিবির বুঝেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ে কালি ছিটিয়ে ফায়দা লোটা অসম্ভব। তাই হিন্দুত্বের লাইনকে মজবুত করতে চাইছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, গোটা দেশে। কিন্তু অন্য রাজ্যের সঙ্গে বাংলার তফাত ছিল, আছে, থাকবেও। বাংলার মানুষ বিবেকানন্দের ভ্রাতৃত্ববোধের ভাবনায় অনুপ্রাণিত। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ‘যত মত তত পথ’ আদর্শে বিশ্বাসী। ফলে ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে অনায়াসেই। বঙ্গজয়ের অভিপ্রায়ে হিন্দুত্ব নিয়ে মাতামাতি করার অধিকার গেরুয়া শিবিরের অবশ্যই আছে। তাতে রবীন্দ্র-নজরুলের মাটিতে তাদের পোঁতা বিভেদের বীজ বড়জোর অঙ্কুরিত হতে পারে, কিন্তু কখনওই মহীরুহ হবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ