প্রীতম দাশগুপ্ত: নাম-গোত্র বদলালেই আইন বদল। এখন দেশে এমনই বিধি চালু করছে বিজেপি। দিন কয়েক আগেই একটা খবর প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। কী সেই খবর? দাদরি মামলায় অভিযুক্তদের ছেড়ে দিচ্ছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। যদিও যোগী সরকারের ওই পরিকল্পনায় বাদ সেজেছে আদালতই। মনে আছে দাদরির ঘটনা?
মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পরেই উত্তরপ্রদেশে ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এক গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হন মহম্মদ আখলাক। সন্দেহ করা হয়েছিল, তাদের বাড়ির ফ্রিজে গোরুর মাংস রাখা হয়েছে। এবং ওই মাংস খাওয়াও হচ্ছে। ঘটনার পর ১৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। দাদরির বিসাহরা গ্রামের ওই ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। রাত সাড়ে ১০টার দিকে একদল লোক লাঠি, লোহার রড, তরোয়াল ও পিস্তল নিয়ে আখলাকের বাড়িতে চড়াও হয়। বেধড়ক মারধর করা হয় আখলাককে। এতে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ছেলে দানিশ গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন শুরু হয়েছিল। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও গণপিটুনির এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।
ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে পুলিশ চার্জশিট জমা দেয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (খুন), ৩০৭ (খুনের চেষ্টা), ৩২৩ (স্বেচ্ছায় আঘাত), ৫০৪ (ইচ্ছাকৃত অপমান), এবং ৫০৬ (হুমকি)–সহ একাধিক গুরুতর ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত হিসেবে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জয় রানার ছেলে বিশাল রানা। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯। ২০১৬ সালে জেলে থাকা অবস্থায় একজন অভিযুক্ত রবিন সিশোদিয়ার মৃত্যু হয়। ২০২১ সালে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া চলার মধ্যে সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ সরকার আদালতে একটি আবেদন দায়ের করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাক্ষীদের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে। আখলাকের স্ত্রী ইকরামন ১০ জনের নাম উল্লেখ করেছেন, মেয়ে সাইস্তা ১৬ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। আবার ছেলে দানিশ ১৯ জনকে অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সরকার জানিয়েছে, একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও বাদী ও অন্যান্য সাক্ষীরা অভিযুক্তদের সংখ্যা নিয়ে অসঙ্গতি প্রকাশ করেছেন।
আখলাকের পরিবারের আইনজীবী মহম্মদ ইউসুফ সাইফি বলেছেন, এমন হতেই পারে যে, ঘটনার সময় প্রত্যেক সাক্ষী সব অভিযুক্তকে দেখতে পাননি। তবে মূল বিষয় হল, যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে কি না। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের কাছ থেকে পাঁচটি লাঠি, লোহার রড এবং ইট উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু কোনও পিস্তল বা তরোয়ান পাওয়া যায়নি। যদিও অভিযোগে আখলাকের স্ত্রী ওই বস্তুগুলি ছিল বলে উল্লেখ করেছিলেন। রাজ্য সরকারের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া মাংস গোমাংস বলে ফরেনসিক রিপোর্টে বর্ণনা করা হয়েছে।
সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ সরকার এই ইস্যুতে মত বদল করেছে। আদালতে যোগী সরকারের তরফে একটি আবেদন জানানো হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২১ ধারায় মামলাটি প্রত্যাহার করতে চায় রাজ্য। যোগী সরকারের নির্দেশে গত ১৫ অক্টোবর গৌতম বুদ্ধ নগরের সহকারী জেলা সরকারি কৌঁসুলি ভাগ সিং একটি আবেদন করেন। ওই নির্দেশের একটি চিঠি ২৬ আগস্ট পাঠানো হয়। আবেদনে বলা হয়েছে যে, উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল অভিযোগ প্রত্যাহারের লিখিত অনুমোদন দিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারের দাবি, আখলাকের বাড়ি থেকে যে মাংস উদ্ধার হয়েছিল তা সরকারি পরীক্ষাগারে ‘গোরুর মাংস’ হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল—এই যুক্তিও আবেদনে তুলে ধরা হয়। যদিও আখলাকের পরিবার এই অভিযোগ প্রতিনিয়ত অস্বীকার করেছে। যদিও যোগী সরকারের আবেদন খারিজ করেছে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, সরকারের যুক্তির কোনও আইনি ভিত্তি নেই। আদালত এই আবেদনকে ‘অপ্রাসঙ্গিক ও ভিত্তিহীন’ বলে মন্তব্য করেছে। মামলার বিচার অবশ্য চলবে। আগামী ৬ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানি।
প্রশ্ন হল, বিজেপি কি সত্যিই চেয়েছিল আখলাকের হত্যাকারীরা সাজা পাক? প্রশ্নটা কেন উঠছে? কারণ প্রথম থেকেই অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে সংঘ পরিবার। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী মহেশ শর্মা যুক্তি দেন, ‘গোরুর মাংস দেখলে আমাদের আত্মা কেঁপে ওঠে।’ তিনি দোষ চাপাতে চাইলেন অদৃশ্য গোরু চোরাকারবারিদের উপর। এদের কাজকর্মই নাকি হিন্দুদের রাগিয়ে দিয়েছিল। ওই মন্ত্রী বারাণসীতে বলেছিলেন, ওই বাড়িতে ১৭ বছরের একটি মেয়েও ছিল। কিসি নে উসে উঙলি নেহি লাগাই। মানে আখলাককে পিটিয়ে মেরে তেমন কোনও দোষ করেনি অভিযুক্তরা। মহেশ শর্মাই আবার ছিলেন দাদরির সাংসদ।
হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরও মন্তব্য করেছিলেন, মুসলমানরা যদি গোরুর মাংস খেতে চান, তবে তাঁদের ভারত ছেড়ে যেতে হবে। আরএসএস-এর মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’ বেদ উদ্ধৃত করে একটি কভার স্টোরি প্রকাশ করে, যেখানে গোরু হত্যাকারীদের ‘পাপী’ বলে উল্লেখ করে তাদের বিনাশের আহ্বান জানানো হয়। লেখা হয়েছিল, বেদের আদেশ হল, গো হত্যাকারী পাপীর প্রাণ নিয়ে নাও। অর্থাৎ উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট, অভিযুক্তদের ধর্ম দেখে তাদের বাঁচানোর মরিয়া প্রয়াস করা। সেক্ষত্রে পুলিশি তদন্ত যে সঠিক পথে এগোবে না তা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার নেই। পুরো ভাবনাটাই করা হয়েছিল, আখলাকরা পাপ করেছেন। তাই তাঁদের যারা মেরেছে, তারা উচিত শিক্ষাই দিয়েছে। তদন্তকারীরা বহুদিন পরে জানিয়েছিলেন, ওই মাংস গোরুরই ছিল। কিন্তু সেটা যে গোরুর মাংসই ছিল, সেটা বহুদিন আগেই ঘোষণা করে দিয়েছিল পাঞ্চজন্য। নিউটনের তত্ত্ব বুঝিয়ে বলা হয়েছিল, যদি আপনি ৮০ শতাংশ সংখ্যাগুরুর অনুভূতির খেয়াল রাখতে না পারেন, তবে ওই ধরনের প্রতিক্রিয়া কীভাবে ঠেকানো যাবে।
শুধু আখলাকই নয়, এমন উদাহরণ বহু আছে। অস্ট্রেলিয়ান মিশনারি গ্রাহম স্টেইন ও সন্তানদের হত্যার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত মহেন্দ্র হেমব্রমকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে মূল অভিযুক্ত দারা সিং। গোধরা পরবর্তী হিংসায় বিলকিস বানোকে ধর্ষণ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত ১১ জনকে ছেড়ে দিয়েছিল গুজরাত সরকার। তারপর তাদের বীরের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সম্প্রতি আবার জামিন পেয়েছেন উন্নাও ধর্ষণ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার। দিল্লি হাইকোর্ট তাঁকে ১৫ লক্ষ টাকায় জামিন দিয়েছে। গোটা মামলায় সিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা হাইকোর্টের রায়ের পর ঠিক করেছে সর্বোচ্চ আদালতে যাবে। কিন্তু এতদিন তারা কী করছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই। বিশেষ করে যেখানে উন্নাওয়ের ঘটনায় নির্যাতিতাকে হারাতে হয়েছে বাবা ও পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু এই নামটাই যদি পালটে গিয়ে হয় উমর খালিদ কিংবা সিদ্দিক কাপ্পান। তাহলে নীতি পালটে যায়। তদন্ত অন্য খাতে বইতে থাকে। তখন বিজেপি বিরোধিতাকেই রাষ্ট্র বিরোধিতা বলে চিহ্নিত করা হয়। আরোপ করা হয় কঠোর ধারা। জেলেই পচতে থাকেন অভিযুক্তরা। জামিন পেতে কালঘাম ছুটে যায়। কোনও ভাগ্যবান অন্তত বছর দুই পরে হলেও জামিন পান, কারও কপালে সেটাও জোটে না। বিচারের বিলম্ব কষ্টকর। কিন্তু বিচারটাই লোপ করে দেওয়া ধ্বংসকর।
মার্কিন সংস্থা অনেক দিন ধরেই ভারতের এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করছে। তারা স্পষ্টই বলছে, মোদি জমানায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বৈষম্য হচ্ছে। আর এই ঘটনায় সরাসরি দেশের শাসক দল বিজেপি ও সংঘ পরিবারের দিকে আহুল তুলেছে মার্কিন সংস্থা ইউএসআইআরএফ। তাদের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, আরএসএস-এর প্রধান লক্ষ্য হলো একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠন। এবং ভারতকে হিন্দু জাতি হিসেবে প্রচার করা। যেখানে মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ, পারসি এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয় শ্রেণির হয়। বিজেপিও ২০১৪ সাল থেকে সংঘের সেই আদর্শ কার্যকর করতে সচেষ্ট। বলা হয়েছে, আরএসএস সরাসরি নির্বাচনে প্রার্থী দেয় না। তবে তারা বিজেপির জন্য স্বেচ্ছাসেবক সরবরাহ করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও একজন স্বেচ্ছাসেবক। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক পরিবেশ গড়ে তুলছে।
আখলাকের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল। পরিস্থিতি এমনই হয়েছিল, বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এই ইস্যুতেই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল বিজেপির। এবার দেখুন ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে অভিযুক্ত হত্যাকারীদের। কিন্তু আলোড়ন নেই। সেই বিহারে ড্যাং ড্যাং করে জিতেছে বিজেপি। যে হত্যাকাণ্ড গেরুয়া অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল, তা আজ বিহার জয়ের উল্লাসে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। এটাই চিন্তার।