আমাদের দেশে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মান ভীষণই খারাপ। কল্যাণকামী রাষ্ট্র দাবি করা সত্ত্বেও, ভারত সরকার এই ব্যাপারে কোনও নজর দেয় না। পেনশন নামক সুরক্ষা বেশিরভাগ প্রবীণ নাগরিকের অধরা। কোটি কোটি নাগরিকের রুটিরুজি অসংগঠিত ক্ষেত্র নির্ভর। সেখানে পিএফ এবং পেনশনের সুবিধা মেলেন না। সরকার একাধিক বার ধুয়ো তুলেও এই বিষয়ে এখনও কোনও আশার আলো দেখাতে পারেনি। এনিয়ে এখনও পর্যন্ত যা চলছে তা কুনাট্য মাত্র। সংগঠিত ক্ষেত্রে ইপিএস-৯৫ নামক স্কিমের আওতায় পেনশনের নামে নির্মম এক প্রহসন চলছে বছরের পর বছর ধরে। লাগাতার অনশন করেও সংশ্লিষ্ট প্রবীণ শ্রমিক শ্রেণি কোনও সুরাহা পাননি। নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থসূত্রেই জীবনসায়াহ্নে ভদ্রস্থ পেনশন তাঁদের হকের পাওনা। কিন্তু মোদি সরকার তা গায়ের জোরে আটকে রেখেছে। অন্যদিকে, এমপিদের মাসিক ভাতা থেকে পেনশন সবই বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অথচ ওই অর্থ প্রাপ্তির পিছনে তাঁদের ব্যক্তিগত কন্ট্রিবিউশন শূন্য! এই অর্থ তাঁরা ‘আপনা হাত জগন্নাথ’ নিয়মেই বাড়িয়ে নিচ্ছেন। মানুষেরই ভোটে তাঁরা আইন প্রণয়নের অধিকারী। সেই ক্ষমতাবলেই নিজেদের পাওনাগণ্ডা বিপুল হারে বাড়িয়ে নিচ্ছেন এমপি-মন্ত্রীরা—আর জনগণের জন্য বঞ্চনার ট্রাডিশন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা সমানে!
সব মিলিয়ে যা অবস্থা, সাধারণ নাগরিককে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের উপর বিশেষ জোর দিতেই হয়। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সকলে পর্যাপ্ত সঞ্চয় করতে পারেন না। তার কারণও একাধিক। একদিকে ব্যাঙ্ক, ডাকঘর সবার নাগালে নেই এবং কিছু ক্ষেত্রে তা থাকলেও সুদের হার এত কম যে বহু মানুষ সঞ্চয় বা আমানতের বিকল্প পথই গ্রহণ করেন। আর সেটা করতে গিয়ে কিছু লোক চিটফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, শেয়ার প্রভৃতি ক্ষেত্রে টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। অন্যদিকে, মোদির ডিজিটাল ভারতে হাঁ করে আছে অনলাইন প্রতারক বা সাইবার ক্রিমিনালরা। অসতর্কভাবে অনলাইন লেনদেন করতে গিয়ে কিংবা সাইবার প্রতারকদের অন্যবিধ ফাঁদে পা দিয়ে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন বহু গ্রাহক। এসব ইদানীং নিত্যদিনের ঘটনা। গ্রাহকের এই সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং হয়রানি কমাতে নতুন পরিষেবা চালু করতে চলেছে ইন্ডিয়া পোস্ট পেমেন্টস ব্যাঙ্ক (আইপিপিবি)। তাদের গ্রাহকরা যদি এই ব্যাঙ্কে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হন, তাহলে তাঁরা সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। সেই সুবিধাই আনছে আইপিপিবি। এই বিষয়ে সাধারণ বিমা সংস্থা নির্বাচনে ইতিমধ্যেই টেন্ডারের প্রস্তুতি শুরু করেছে তারা। প্রস্তাবিত পরিষেবায় আপাতত ১১ কোটির মতো গ্রাহক সবিশেষ উপকৃত হবেন। কতটা বাড়ছে ব্যাঙ্ক প্রতারণা? রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দেশে ব্যাঙ্ক গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনার সংখ্যা ৩৬ হাজারের বেশি। তাতে প্রতারণার মোট অঙ্ক ছিল ১৩,১৭৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ছ’মাসে প্রতারণার অঙ্কটি ২১,৩৬৭ কোটি টাকা ছুঁয়েছে। এই দৃষ্টান্তগুলির প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতারণার আর্থিক অঙ্ক লক্ষাধিক টাকা। তুলনামূলক ছোট অঙ্কগুলি ধরলে প্রতারণার বহর আরও বড় এবং প্রবণতাটি ক্রমবর্ধমান। আইপিপিবি জানাচ্ছে, শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসে তাদের ব্যাঙ্ক মারফত ইউপিআই লেনদেনের সংখ্যা ১.৭৪ কোটির অধিক। সংখ্যাটি মোবাইল ব্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে ২১.৩৬ লক্ষের মতো। ভারতীয় ডাক বিভাগের অধীনে আইপিপিবি পরিষেবার সূচনা ২০১৮ সালে। দেশের প্রায় ১.৬০ লক্ষ ডাকঘরে এই পরিষেবা মেলে। ডাকঘরের কাউন্টারগুলির পাশাপাশি প্রায় দেড় লক্ষ মাইক্রো এটিএম’ও চালু রেখেছে এই পেমেন্টস ব্যাঙ্ক। তার মাধ্যমে বাড়ি বসেও অনলাইন পরিষেবা পান গ্রাহক।
যাবতীয় পেমেন্ট ডিজিটাল হওয়ায় প্রতারণার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। তাই বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে প্রতারণা সংক্রান্ত বিমার আওতায় আনা হচ্ছে। উপযুক্ত সংস্থা নির্বাচনের জন্য টেন্ডার ডাকার উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। সময়োচিত উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক এবং প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এই বিমার সুরক্ষা দেওয়ার জন্য গ্রাহকের উপর যেন বাড়তি আর্থিক দায় চাপানো না-হয়। কারণ সেটি বহু গ্রাহকের পক্ষে কষ্টদায়ক হবে এবং এই বিষয়ে আগ্রহও হারাতে পারেন তাঁরা। এই পরিষেবা যাতে অবিলম্বে চালু হয় এবং তা ভবিষ্যতেও বজায় থাকে, সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। কারণ আমাদের পোড়ার দেশে, অনেককিছু সুন্দরভাবে শুরুই হয় শুধু, সেসব দীর্ঘায়ু পায় না।