নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মোবাইল নেই, কলকাতার পথে-ঘাটে এমন ব্যক্তির খোঁজ কি আদৌ মেলে? ‘এক কথায় না বলে উত্তর দিলে কিন্তু ঠকতে হবে। এমন অনেকেই আছেন যাঁদের এখনও সত্যি সত্যিই মোবাইল নেই,’ বলছেন মহম্মদ নৌসাদ। তিনি সরকারের বড় কোনও কেউকেটা নন যে, বিস্তর তথ্য পরিসংখ্যান ঘেঁটে এমন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। নৌসাদ বলছেন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। ধর্মতলায় দোকান লাগিয়ে ঠান্ডা পানীয়, জল ইত্যাদি বিক্রি করেন তিনি। সেখানে তিনি খুলেছেন একটি ফোন বুথ। বহু মানুষ ফোন করতে আসেন। দৈনিক কত মানুষ যে ফোন করেন তার হিসেব রাখা সম্ভব হয় না। এক মিনিট কথা বললে নৌসাদকে গুনে গুনে দিতে হয় দু’টাকা।
শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার মোড়ে নৌসাদের দোকান। সেখানে রাখা এখটি কর্ডলেস ফোন। নামেই টেলিফোন বুথ। বিশ-পঁচিশ বছর আগের মতো কাচ দিয়ে ঘেরা কোনও ঘর নয়। জল, কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতলের পাশে রাখা একটি টেলিফোন। সেটি ওয়্যারলেস। মানুষ এসে রিসিভার তুলে নম্বর ডায়াল করে কথা বলেন। মিনিট অনুযায়ী টাকা দিয়ে চলে যান। নৌসাদ বলেন, ‘প্রতিদিন অনেক লোক আমার এখানে আসে। বেশিরভাগ কলকাতার বাইরে থেকে এখানে কাজ করতে আসেন। তাঁদের অনেকের মোবাইল থাকে না। বাসে ওঠার আগে আমার এখান থেকে ফোন করে যান।’ জলের বোতলের কার্টনের উপর রাখা রয়েছে ওয়্যারলেস ফোনটি। দুপুরে এক ভদ্রলোক এলেন। একটি মোবইল নম্বর ডায়াল করে কথা শুরু করলেন। ফোনালাপ শেষ হল। ছ’মিনিট কথা বলেছেন তিনি। ১২ টাকা দিলেন নৌশাদের হাতে। তিনি বর্ধমানে থাকেন। নাম কমল দাস। বললেন, ‘দু’দিনের জন্য কলকাতায় এসেছিলাম। বুথ থেকে বাড়ির সঙ্গে কথা বলে নিলাম। এর আগেও কলকাতায় এসে এখান থেকে কথা বলেছি।’ এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের দু’নম্বর গেটের কাছে নৌসাদের দোকান। তিনি জানালেন, ‘জেলার লোক যে শুধু কথা বলেন তা নয়। অনেকের তো রাস্তায় বেরিয়ে মোবাইলের চার্জ শেষ যায়। তাঁরাও অনেক সময় খোঁজ করতে করতে চলে আসেন দোকানে।’ লোকমুখে এই দোকানের নাম ছড়িয়েছে। ফলে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করেননি নৌসাদ।
এককালে পাড়ায় পাড়ায় টেলিফোন বুথ গজিয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময় মোবাইলের রিচার্জের দোকানও গজিয়ে ওঠে। এখনও হাসপাতালে সেরকম চার্জ দেওয়ার দোকানের খোঁজ মেলে। তবে এসটিডি লেখা বুথ কার্যত উধাও। কিছুদিন আগে গড়িয়াহাটে একটি বুথের খোঁজ মিলেছিল। সেটি বর্তমানে আছে কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে বুথের সে অতীতকাল ফিরিয়ে এনেছেন নৌসাদ। মানুষের ফেলে আসা অভ্যাস আবার সচল করে দিয়েছেন। বলেন, ‘অনেকে এসে বলতেন মোবাইলটা একটু দেবেন ভাই। একটা জরুরি ফোন করব। দিতাম আমি। একদিন ভাবতে ভাবতে খুলেই ফেললাম বুথ। সেখান থেকেই শুরু।’ এখনও কলকাতা শহরে খুঁজলে হারিয়ে যাওয়া টেলিফোন বুথের মালিক নৌসাদের মতো লোক পাওয়া যায়। অনেকে জানালেন, বড়বাজারেও এমন বুথ নাকি রয়েছে।