রাস্তাঘাটে অচেনা কারও সঙ্গে আলাপ হলে আমরা তাঁর নামধাম জিজ্ঞেস করি। কিন্তু কখনও প্রশ্ন করি কি যে, আপনি কোন জাতের? আমরা জানি, এই প্রশ্ন করা যায় না। উল্টোদিকের ব্যক্তিটি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবেন। পারলে দু’-এক ঘা কষিয়েও দিতে পারেন। অথচ যদি স্কুল-কলেজে ভর্তির কথা হয়, কিংবা সরকারি চাকরি? উনি নিজে থেকেই জাতের জানান দেবেন। কারণ, সেক্ষেত্রে সংরক্ষণ পাওয়া যায়। ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যালে ভর্তির কাট অফ মার্কস কমে আসে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কম্পিটিশনটাও অর্ধেক হয়ে যায়। এটাই ভারত। ঐতিহ্যের ভারত। রাজনীতির ভারত। আর এই ভারত সংরক্ষণেরও। স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে চলল... এখনও আমরা উদীয়মান সূর্যের দিকে পিছন ঘুরেই দাঁড়িয়ে আছি। তাই সংস্কার এবং আগামীর স্বপ্ন দেখানো নরেন্দ্র মোদি সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেন্সাসের সঙ্গে জাতি গণনাও হবে। অর্থাৎ, সরকারি আধিকারিক আপনার আমার বাড়িতে এসে নামধাম, বয়স, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, ধর্মের পাশাপাশি জানতে চাইবে জাতও। কেন? কী উপকার হবে তাতে?
সরকারি যুক্তি হল, বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা আরও নির্দিষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া যাবে পিছড়ে বর্গের মানুষের কাছে। চিহ্নিত করা যাবে অনগ্রসর শ্রেণির প্রত্যেক নাগরিককে। সরকারি সুবিধা থেকে কেউ বাদ যাবেন না।
আর বাস্তব? আরও একবার সমঝোতা হবে মেধার সঙ্গে। আরও একবার স্রেফ জাতিগত শংসাপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে যোগ্যতার মাপকাঠি। আরও কঠিন হয়ে যাবে জেনারেল ক্যাটিগরির বেঁচে থাকার লড়াই। ভারত আরও একবার পিছিয়ে যাবে... অনেকগুলো ধাপ।
রাজনীতি। এই একটি শব্দ এখন আমাদের আগাপাশতলা মুড়ে ফেলেছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা কিংবা চাকরি— সর্বত্র এই একটি শব্দের আধিপত্য। কামিয়ে নাও। যেখান থেকে পারো। যেভাবে পারো। কে বলতে পারে, ‘কাল হো না হো’! সংবিধান তাই এখন শো-কেসে সাজিয়ে রাখার একটি বই মাত্র। মাঝে মাঝে তা বেরিয়ে আসে। ঘোরাফেরা করে রাজনীতিকদেরই হাতে। তাঁরা দাবি করেন, আমরা বাঁচাব সংবিধানকে। কিন্তু একটা কথা ভুলে যান— সংবিধানকে বাঁচানোর ক্ষমতা কেউ আপনাকে দেয়নি। গণতন্ত্র যতদিন এ দেশে থাকবে, বেঁচে থাকবে সংবিধান। আপনারা শুধু তাকে রাজনীতির উপাদান হিসেবেই ব্যবহার করেন। কেন? তাঁরা বেমালুম উড়িয়ে দেন সংরক্ষণ নিয়ে আমাদের সংবিধানের বক্তব্য। সংবিধানে লেখা আছে, সমাজ ও শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য সংরক্ষণ। তা কি হয়েছে? নাকি হচ্ছে? বেড়াটা ভেঙে দিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করে। সেই ভাঙা অংশই এখন আরও চওড়া হচ্ছে। তখন তাও মাথা তুলে প্রতিবাদ করার মতো রাজনীতিক ছিলেন। এখন সেটাও নেই। সবাই ভোটের লক্ষ্যে ছুটে চলেছেন। শাসক তো বটেই। বিরোধীরাও। তাই হঠাৎ কাস্ট সেন্সাস মান্যতা পেয়ে যাওয়ায় তাঁরা হতচকিত। বেসামাল। ভেবে উঠতে পারেননি মোদি সরকার তাঁদের এই দাবিতে সায় দিয়ে দেবে। এখন খানিক সামলে নিয়ে তাঁরাই বলছেন, ‘এই জয় আমাদের। চাপের মুখে কেন্দ্র বাধ্য হল দেশজুড়ে জাতি গণনায় সিলমোহর দিতে।’ আসল অঙ্কটা কী?
স্রেফ রাজনীতি।
১৮৭১-৭২ সালে প্রথম জাতি গণনা করেছিল ব্রিটিশরা। এই দেশ এবং দেশের মানুষ সম্পর্কে না জেনে শাসন করা যে কতটা কঠিন, সেটা বুঝেই এমন একটা পদক্ষেপ নিয়েছিল তারা। জানতে চেয়েছিল ভারতকে। এখানকার সমাজকে। শেষবার তাদের কাস্ট সেন্সাসের পরিসংখ্যান প্রকাশ হয়েছিল ১৯৩১ সালে। তখন দেখা গিয়েছিল, ভারতে জাতি-উপজাতি মিলিয়ে সংখ্যাটা ৪ হাজার ১৪৭ (এখন প্রায় ৩ হাজার জাতি এবং ২৫ হাজার উপজাতি)। স্বাধীনতার পর জাতপাতের এই ব্যাগেজ আর টেনে নিয়ে যেতে চাননি জওহরলাল নেহরু। তাই ১৯৫১ সালে সেন্সাসের সময় জাতি গণনার কোনও উল্লেখ নেই। নেহরুর লক্ষ্য ছিল জাতপাতহীন সমাজ। তাই তিনি ভেবেছিলেন, নাগরিকের হিসেব হবে। জাতের নয়। ২০১১ সালে দ্বিতীয় ইউপিএ শাসনে এ ব্যাপারে খানিক নাড়াচাড়া পড়েছিল। আর্থ সামাজিক জাতি গণনা করতে চেয়েছিলেন মনমোহন সিং। দেখতে চেয়েছিলেন, শ্রেণিভিত্তিক সংরক্ষণ বছরের পর বছর চালানোর পর সমাজে তার প্রভাব কতটা পড়েছে। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষিতে কতটা এগিয়েছে অনগ্রসর শ্রেণি। তাই সেন্সাসের সময় একটি কলাম বরাদ্দ হয়েছিল এর জন্য। যদিও পুরোটাই ছিল ঐচ্ছিক। মানুষ চাইলে উত্তর দিতে পারে, নাও দিতে পারে। ফলে তথ্য যা হাতে এসেছিল, তা ফুল প্রুফ ছিল না। অন্যান্য গণ্ডগোলও হয়েছিল পরিসংখ্যান নিয়ে। তাই সেই রিপোর্ট আর প্রকাশ করা হয়নি। মজার ব্যাপার হল, নরেন্দ্র মোদি কিন্তু এই সবকিছুর উপরে ছিলেন। তিনি নিজেকে অনগ্রসর জাত বলে প্রচার করেছেন। দেশের ঐক্যের কথা বলেছেন। এক দেশ এক ভোটের জন্য আওয়াজ তুলেছেন। আবার বিহার সরকার নিজেদের রাজ্যে জাতি গণনা করায় তাকে ‘পাপকাজ’ বলে তোপও দেগেছেন (তখন নীতীশ কুমার বিজেপির সঙ্গে জোটে ছিল না)। বলেছেন, ওরা দেশে বিভাজন আনতে চাইছে। এখন হঠাৎ কী হল? কাস্ট সেন্সাস তাহলে আর বিভাজন আসবে না? নাকি বিহারে ভোট আসন্ন বলে এটা একটা চূড়ান্ত চাল। বিহার এবং উত্তরপ্রদেশ, এই দুই রাজ্যে আজও জাতপাতের ভিত্তিতেই ভোট হয়। গত লোকসভা নির্বাচনে বিহারের বেশ কিছু আসন বিজেপির কান ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছে। সেই সবে হারলে ফল অন্যরকম হতেও পারত। আর উত্তরপ্রদেশে তো ৮০টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতেই থমকে যেতে হয়েছে মোদিজিকে। অথচ যোগীরাজ্যে অর্ধেকের বেশি ভোটারও ওবিসি সম্প্রদায়ভুক্ত। ছাব্বিশে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের ভোটে জাতি গণনা খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ, এখানে মুখ দেখেই ভোট হয়। জাত দেখে নয়। মোদিজি জানেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা কোনও গ্রহণযোগ্য মুখ তিনি বাংলায় তৈরি করতে পারেননি। কাজেই শুধু জাতের নামে এখানে ভাগ্য খুলবে না। বাংলায় সমস্যাটা অন্য। ‘পদ্ধতি মেনে হয়নি’ এই অভিযোগে ২০১০ সালের পর থেকে ইস্যু করা সব ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিল করে দিয়েছে আদালত। হাইকোর্টে খারিজ হয়ে যাওয়া ওই শংসাপত্রের সংখ্যাটা ১২ লক্ষ। এর প্রভাব পড়েছে চাকরিতেও। ২০১০ সালের পর ইস্যু হওয়া ওবিসি সার্টিফিকেট নিয়ে যাঁরা চাকরি জয়েন করেছিলেন, তাঁরা আজ সঙ্কটে। এছাড়া রয়েছে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সমস্যাও। এসএসসির নিয়োগ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে চলতি মাসেই। অথচ ওবিসি মামলা বিচারাধীন। তাহলে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের কী হবে? ফলে উভয় সঙ্কটে রাজ্য। মাঝে মাঝে মনে হয় না কি যে, এই শ্রেণিবিভেদ না থাকলে এত ঝামেলাই হতো না? কিন্তু প্রশ্ন হল, এই গোটা ঘটনাক্রমে সবচেয়ে বেশি হোঁচট খাচ্ছে কে? উত্তর একটাই— মেধা।
আজকের দিনে জেনারেল ক্যাটিগরি হওয়া মানে উচ্চশিক্ষা বা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫০ নম্বর পিছনে থেকে শুরু করা। তাই যোগ্য হওয়াটা আর যথেষ্ট নয়। যোগ্যতমের উদবর্তনই জীবনের এই ঘোড়দৌড়ে টিকে থাকার একমাত্র ফর্মুলা। আরও বেশি নম্বর। আরও বেশি যোগ্যতা। আরও বেশি সুপারিশ। তাহলেই একমাত্র এক চিলতে আলো দেখতে পান জেনারেল ক্যাটিগরির ছেলেমেয়েরা। তাঁরা জানেন, ১০০টা পদে লোক নেওয়া হলে তাঁদের লড়তে হবে ৫০টি পদে। বাকি সব সংরক্ষিত। ১৫ শতাংশ এসসি, ৭.৫ শতাংশ এসটি এবং ২৭ শতাংশ ওবিসি। সেটাও সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করার পর। শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, কোনও অবস্থাতেই সংরক্ষণ ৫০ শতাংশের বেশি হবে না। কিন্তু আজকের জমানায় রাজ্য সরকারগুলি যে হারে ওবিসি তালিকা সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করে চলেছে, তাতে শুধু অনগ্রসর শ্রেণিই ৫০ শতাংশ ছাপিয়ে গিয়েছে। তাই আদালতের নির্দেশে জারি হয়েছে আর্থিক সিলিং। মোদি জমানায় বার্ষিক আয় ৮ লক্ষের নীচে হলে তবেই ওবিসি সংরক্ষণের জন্য আবেদন করা যায়। এই একই শর্ত রয়েছে কিন্তু আর্থিক দিক থেকে অনগ্রসর শ্রেণির জন্যও। তাঁদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ মাত্র ১০ শতাংশ। সেটাও ওই ৫০ শতাংশের বাইরে। তাহলে যাঁদের বাবামায়েরা বছরে ৮ লক্ষ টাকার উপর আয় করেন এবং জেনারেল ক্যাটিগরির ছাতার তলায় তাঁদের আশ্রয় হলে যুদ্ধটা কত আসনের জন্য? মাত্র ৪০ শতাংশ। আর হ্যাঁ, ৮ লক্ষ টাকা কিন্তু নেহাত কম নয়! আমাদের দেশে মাসে ক’জন ৬৫ হাজার টাকার উপর আয় করেন? একবার ভেবে দেখবেন। সংখ্যাটা প্রচুর হলে ৮০ কোটি মানুষকে ফ্রিতে রেশন দিতে হতো না। এঁরা কারা? এঁরাই সামাজিক, আর্থিক এবং শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি। এঁদেরকেই সমাজের সামনের সারিতে তুলে আনার কথা বলা হয়েছিল সংবিধানে। এঁদের জন্যই ভাবা হয়েছিল সংরক্ষণের কথা। স্বাধীনতার পরবর্তী জমানায় যেহেতু তফসিলি জাতি এবং উপজাতির লোকজনই সামাজিক এবং আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়াদের মধ্যে ছিলেন, তাই তাঁদের জন্য সংরক্ষণ মানা যায়। কিন্তু এটাও মানতে হবে, আজ চিত্রটা বদলেছে। তফসিলি জাতিভুক্ত একজন বিচারপতি হলেন। আর অবসর নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য। তারপরও তাঁর সন্তান সংরক্ষণের সুবিধা পাবে? এই উদাহরণ আজ থেকে ৩৫ বছর আগে দিয়েছিলেন রাজীব গান্ধী। তারিখটা ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৯০ সাল। ‘মণ্ডল কমিশন’ নিয়ে আলোচনায় লোকসভায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় একটা কথা বলেছিলেন রাজীব গান্ধী— ‘সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জাতপাতের রাজনীতিতে ইন্ধন দিচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশকে এর চড়া মাশুল গুনতে হবে।’ ৩৫ বছর... সেই জাতপাতের রাজনীতি প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছে, রাজীব গান্ধী কতটা সঠিক কথা বলেছিলেন। চড়া দাম সত্যিই দিচ্ছি আমরা। প্রতিদিন। আমরা বুঝতে পারছি না, আজ জাতি গণনা সরকারি সিলমোহর পেয়ে যাওয়ার পর লড়াই আরও বাড়বে। প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। এরপর হয়তো মোদি সরকার সংবিধান সংশোধন করবে... তখন আর ৫০ শতাংশে বেঁধে রাখা যাবে না সংরক্ষণের দানবকে। আর এর দায় নিতে হবে রাজীব গান্ধীরই সুপুত্রকেও। নেহরু, ইন্দিরা এবং রাজীব... প্রত্যেকে এই একটি সুরে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন—জাতপাতহীন সমাজ। কিন্তু জাতের দাবিতে লাগাতার হাঁকডাক করে গিয়েছেন রাহুল গান্ধী। বিহার হোক, কর্ণাটক বা তেলেঙ্গানা। তেজস্বী যাদব কিংবা অখিলেশ যাদব এই ফর্মুলায় সায় দেবেন, তাতে নতুন কিছু নেই। এটা তাঁদের চেনা সিলেবাস। এবং মুখস্থ করে রাখা সিলেবাস। কারণ, বিহার এবং উত্তরপ্রদেশে জাতের অঙ্কে ভোট এখনও হয়। কিন্তু রাহুল গান্ধী কেন? শুধুই কি রাজনীতির ময়দানে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার জন্য? তিনি কি তাঁর বাবা-দাদুর ইতিহাস জানেন না? নাকি এইসব সিদ্ধান্তই গান্ধী পরিবারের মুষলপর্বের সূত্রপাত?