নাগপুরে আরএসএস-এর পৃথিবী থেকে বিভিন্ন সময়ে যেসব তত্ত্বকথা সশব্দে আছড়ে পড়ছে, সাধারণ দেশবাসীর জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনায় তার কোনও তল খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বাস্তব পরিস্থিতি ও বিজ্ঞান দিয়েও তার তেমন কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। আরএসএস-বিজেপির মাথারা তা জানেন না, বোঝেন না— তা নয়। তবু অশিক্ষা-অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত একটা বড় অংশের দেশবাসীকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কারে আটকে রাখতে চাইছে বর্তমান শাসকেরা। এবং রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে থাকার সুযোগ নিয়ে তারা সব কিছু পাল্টে দেওয়ার খেলায় মেতে উঠেছে! এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য হল হিন্দুরাষ্ট্র গঠন। এই খেলার অন্যতম কুশীলব আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ফের নিদান দিয়েছেন, দেশের জনসংখ্যার হার ধরে রাখতে প্রত্যেক ভারতীয় দম্পতির উচিত তিনটি করে সন্তানের জন্ম দেওয়া। ভারতে এখন পরিবার পরিকল্পনা নীতি মেনে ‘হাম দো, হামারে দো’, অর্থাৎ পরিবার পিছু গড়ে দু’টি সন্তানের জন্ম হয়। যদিও প্রকৃত জন্মহার তার চেয়ে কম (১.১)। আরএসএস-কর্ণধারকে নাকি ডাক্তাররা বলেছেন, তিনটি সন্তান একটা গোটা পরিবারের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। তিন সন্তানের দম্পতির পরিবারে অশান্তি থাকে না, সন্তানেরা অহংকারী হয় না। ভাগবত আসলে পরোক্ষে যা বলতে চেয়েছেন তা হল, দেশে জনবিস্ফোরণের জন্য দায়ী মুসলিমরা। এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বেড়েছে যে গতিতে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে হিন্দুরাই হয়তো ভারতে ‘সংখ্যালঘু’ হয়ে পড়বে। অতএব, তিন সন্তান জন্মের তত্ত্ব আসলে হিন্দু দম্পতিদের প্রতি তাঁর আহ্বান। যা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দুত্ববাদীরা আউরে চলেছেন। প্রশ্ন হল, অভাবের ঘরে তিনটি সন্তান পরিবারের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে কীভাবে?
আসলে একটা কাল্পনিক আশঙ্কার বাতাবরণ তৈরি করে মোহন ভাগবতরা যে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তার সঙ্গে তথ্য ও সত্যের কোনও সম্পর্ক নেই। প্রথমত, ঐতিহাসিকভাবে এদেশে হিন্দুদের তুলনায় মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি ছিল। কিন্তু গত প্রায় তিন দশক ধরে ভারতে হিন্দু-মুসলমান সহ সব সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জাতীয় গড় হার কমতে শুরু করেছে। দ্বিতীয়ত, এই সময়ে মুসলিমদের মধ্যে জন্মহার দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। যেমন, ১৯৯২-৯৩ সালে মুসলিমদের মধ্যে জন্মহার ছিল ৪.৪, হিন্দুদের ৩.৩। ২০১৯-২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের জন্মহার নেমেছে ২.৪-এ, হিন্দুদের ১.৯-এ। অর্থাৎ এই সময়ে মুসলিমদের মধ্যে জন্মহার হ্রাস পেয়েছে ৪৬.৫ শতাংশ, হিন্দুদের ক্ষেত্রে ৪১.২ শতাংশ। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতে, ২০২৫-এ ভারতের জনসংখ্যা পৌঁছবে ১৪৬ কোটিতে। এই হিসেবে ভারতে হিন্দু জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ (১১০ কোটির বেশি), মুসলমান ১৪ শতাংশের সামান্য বেশি (২০ কোটির বেশি)। সুতরাং মুসলিমরা একদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে— হিন্দুত্ববাদীদের এমন প্রচার ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ঘটনা হল, বিপুল জনসংখ্যা নিয়ে এখনই ত্রাহি ত্রাহি রব দেশজুড়ে। ভাগবতের তত্ত্ব মানলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশি জনসংখ্যা তখনই আশীর্বাদ হতে পারে, যখন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে সেই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়। যেমনটা করে দেখিয়েছে চীন। কিন্তু বেকারত্ব, অপুষ্টি, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চরম সঙ্কট, ধুঁকতে থাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পরিকাঠামো থেকে সামাজিক উন্নয়নের বিপুল ঘাটতি, মানবোন্নয়নের প্রায় প্রতিটি সূচকে বিশ্বে পিছিয়ে পড়া দেশগুলির মধ্যে একটি ভারত, যে আজও ‘মধ্যবিত্ত’-এর গণ্ডি পেরতে পারেনি। মোদি জমানায় উন্নয়নের চেয়ে ধর্ম-বিভাজনের সুর বেশি চড়া। এই বিপুল জনসংখ্যার সুবাদে সার্বিক জিডিপি বেশি হওয়ায় মোদির ভারত হয়তো বা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু মাথাপিছু আয়ের নিরিখে এদেশের নাগরিকদের খয়াটে চেহারাটা আড়াল করা যাচ্ছে না। যে দেশের সব নাগরিক দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না, খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাতে হয় কোটি কোটি মানুষকে, অপুষ্টিতে প্রাণ যায় সদ্যোজাত ও প্রসূতির, অভুক্ত সন্তানের মুখে খাদ্য জোগাতে না পেরে মা সন্তানকে খুন করে নিজে আত্মঘাতী হন, কাজের আশায় হা-পিত্যেশ করে থাকে যুব সমাজ, যে দেশে কাজ হারানো আত্মঘাতী শ্রমিক বা ঋণগ্রস্ত কৃষকদের সংখ্যা বেড়েই চলে— সেই দেশে পরিবার পিছু তিনটি সন্তানের জন্ম দিয়ে জনসংখ্যা বাড়ালে তা যে আসলে ‘অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়াবে, ভাগবতবাহিনী যত তাড়াতাড়ি এই সত্য বুঝতে পারে, ততই ভালো।