নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও নয়াদিল্লি: আর ঢাক ঢাক গুড় গুড় নয়! বাংলায় বিধানসভা ভোট ঘোষণার ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্য প্রশাসনের খোলনলচে বদল সম্পূর্ণ করে ফেলল নির্বাচন কমিশন। রবিরার রাতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে। আর সোমবার সকালেই বদলি করা হল রাজ্যের ডিজি ও কলকাতা পুলিশ কমিশনারকে। সেই সঙ্গে ডিজি (কারা) এবং ডিজি আইন-শৃঙ্খলাকেও। এত তড়িঘড়ি রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তরে কার্যত আমূল বদল নিয়ে দিনভর তোলপাড় চলেছে ভোটমুখী রাজনীতির আঙিনায়। গর্জে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—‘ছুপা রুস্তমের মতো মধ্যরাতে গুপ্ত তাণ্ডব করেছে কমিশন।’ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের সরাসরি অভিযোগ, এই বদলি নিছক রুটিন প্রশাসনিক রদবদল নয়। বরং নেপথ্যে রয়েছে গেরুয়া নির্দেশ। সেই নির্দেশ কার্যকর করতেই উঠেপড়ে লেগেছে জ্ঞানেশ কুমারের কমিশন।
এদিনই মুখ্যসচিব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নন্দিনী চক্রবর্তীকে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে নিয়োগের নির্দেশ জারি করেছে নবান্ন। পাশাপাশি বদলি করা হয়েছে ৩০ জন ডব্লুবিসিএস অফিসারকেও। রাতারাতি সেই ইস্যুতে দুপুরে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ মিছিল শেষে তোপ দাগেন মমতা। তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘কোনো স্বাভাবিক দলের এটা কাজ নয়। মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী একজন মহিলা। তাঁকে বদল করেছে। এটা থেকে স্পষ্ট বিজেপি নারীবিরোধী। রাজ্যকে কিছু না জানিয়ে একতরফাভাবে মগের মুলুকের মতো কাজ করেছে দিল্লির জমিদাররা। রাত সাড়ে ১২টার পর তাণ্ডব করেছে। বিজেপির দালালি করছে কমিশন।’ এখানেই থামেননি তিনি। সুর আরও চড়িয়ে তাঁর অভিযোগ, ‘শুধুমাত্র মুখ্যসচিব নয়, স্বরাষ্ট্র সচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতার পুলিশ কমিশনারকেও বদল করেছে ওরা। বিজেপি শুধু বাংলা বিরোধী নয়, অবাঙালি বিরোধীও। বিজেপির কথায় কাজ করতে গিয়ে বেছে বেছে অফিসারদের বদল করা হচ্ছে।’ যদিও মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যয়ী দাবি—‘সব পরিবর্তন করে দিলেও, বাংলার সরকার পরিবর্তন হবে না।’ কেন পরিবর্তন করা হল পুলিশ কমিশনারকে? সেই প্রশ্নও তুলেছেন মমতা। নিজেই জবাব দিয়েছেন, ‘ভোটের সময় বিজেপি টাকা ঢোকাবে, হামলা করবে বলেই এই কাজ!’ একই অভিযোগ জানিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠিও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাতে তিনি সাফ লিখেছেন, যেভাবে মুখ্যসচিব, ডিজির মতো রাজ্যের আধিকারিকদের বদল করা হল, তা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তাহলে কীসের ভিত্তিতে এই অপসারণ? নিয়ম মতো, প্যানেল পাঠিয়ে রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা মাফিক মুখ্যসচিব এবং ডিজির মতো আধিকারিককে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভোট ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কমিশনের এই পদক্ষেপ রাজ্যের অধিকার খর্ব করেছে।
অফিসার বদলের আঁচ গিয়ে পড়ছে দিল্লির রাজনৈতিক ময়দানেও। মধ্যরাতে মুখ্যসচিব বদলের প্রতিবাদে এদিন রাজ্যসভার অন্দরে প্রতিবাদ করে ‘ওয়াক আউট’ করেছে তৃণমূল। জিরো আওয়ারে সুযোগ পেয়ে ডেরেক ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, কমিশন তার ক্ষমতাবলে যা করছে, তা ঠিক নয়। সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সমাজবাদী পার্টির সুপ্রিমো অখিলেশ যাদব সাফ বলেন, ‘যতই অফিসার বদল করে বিপাকে ফেলবে বলে ভাবুক নির্বাচন কমিশন, এবার বাংলায় ঐতিহাসিক জয় হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এভাবে ভোট করে বিজেপি যদি ভাবে পশ্চিমবঙ্গে মমতাজিকে বিপাকে ফেলবে, তাহলে ওরা মিথ্যে স্বপ্ন দেখছে।’ উদ্ধবপন্থী শিবসেনার রাজ্যসভার সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদীরও বক্তব্য স্পষ্ট, ‘আসলে এভাবে অফিসার বদলিতে প্রমাণ হচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভয় পাচ্ছে বিজেপি। তাই কমিশনকে দিয়ে এভাবে অফিসার বদল করাচ্ছে। তবে যাই করুক, পাবলিক মমতাদিদির সঙ্গেই আছে।’