শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: বৈধ ভোটার। কমিশন স্বীকৃত নথিও জমা দিয়েছেন। কিন্তু স্রেফ কমিশনের গাফিলতির জেরে এবার ১৪ লক্ষেরও বেশি ‘নাগরিক’কে শুনানির মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ, সময় মতো তাঁদের নথি জমা পড়লেও তা না চিনতেই পারেনি কমিশনের ‘এআই ভিত্তিক সফটওয়্যার’। আর তাতেই বিপত্তি। ‘বৈধ’ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও নামের পাশে রয়েছে যুক্ত হয়েছে ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি। আর তাঁরা পড়ে গিয়েছেন কমিশনের ‘শুনানি-ফাঁদে’। এখানেই শেষ নয়। জানা যাচ্ছে, ‘কাকতালীয়ভাবে’ বিশেষত সংখ্যালঘু এবং সীমান্তবর্তী এলাকার ভোটাররাই এই ঘটনার শিকার।
এসআইআরের ইনিউমারেশন পর্বের মাঝপথে সন্দেহজনক ভোটার চিহ্নিত করতে একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করেছিল কমিশন। অভিযোগ, কোনওরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই খসড়া তালিকা প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এআই ভিত্তিক ওই সফটওয়্যার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর দেখা যায়, খসড়া তালিকায় অন্তত ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে ওই সফটওয়্যার। তাঁদের সিংহভাগেরই ইনিউমারেশন ফর্মে উল্লিখিত বাবা-মা বা আত্মীয় নামে গলদ রয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে বাবা বা মায়ের সঙ্গে ভোটারের বয়সের ফারাক ১৫ বছর। এছাড়াও ছয় বা তার বেশি ভোটার একজন ব্যক্তিকেই বাবা বা আত্মীয় হিসাবে চিহ্নিত করেছে—এমন ভোটাররাও সন্দেহের তালিকায়।
সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) মারফত এইসব ভোটারদের কাছে নথি চেয়ে পাঠিয়েছিল কমিশন। নির্দেশ মতো ভোটাররা কমিশন নির্ধারিত ১৩টি বৈধ নথির মধ্যে যে কোনও একটি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বৈধ ভোটারের সেই জমা দেওয়া নথি গ্রহণই করেনি কমিশনের এআই ভিত্তিক সফটওয়্যার। ফলে এবার তাঁরা শুনানির মুখে পড়তে বাধ্য। জানা যাচ্ছে, অন্তত ১৪ লক্ষ ভোটারের বৈধ নথি চিনতেই পারেনি কমিশনের সফটওয়্যার। নথি জমা দেওয়ার পর কমিশন জানিয়েছিল, অন্তত ৪২ লক্ষ ভোটার আর সন্দেহের তালিকায় নেই। বাকি ৯৪ লক্ষ ভোটারকে শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সফটওয়্যারের গলদের জেরে ১ কোটি ৮ লক্ষ ভোটার এখনও সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়ে গিয়েছেন। কমিশন সূত্রে খবর, সফটওয়্যারের সৌজন্যে যা পরিস্থিতি, তাতে সব মিলিয়ে অন্তত ১ কোটি ৪০ লক্ষ ভোটারকে শুনানির নোটিস ধরানো হবে।
সূত্রের খবর, বিশেষত রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলা দুই ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ার ভোটারই বাড়তি ভুগছেন। একাধিক ইআরও বলছেন, জমা পড়া নথি দেখে বোঝা যাচ্ছে, সেটি বৈধ। কিন্তু কিছু করার উপায় নেই। একরকম বাধ্য হয়েই বৈধ ভোটারকে শুনানির নোটিস পাঠাতে হচ্ছে। বিএলওদেরও একই বক্তব্য। তাঁরা বলছেন, ভোটারের নথি আপলোড করার পর অ্যাপে দেখা যাচ্ছে, তা গৃহীত হয়েছে। কিন্তু তারপরও সংশ্লিষ্ট ভোটারের নামে শুনানির নোটিস আসছে। কারও কাছেই বিষয়টি নিয়ে কোনও সদুত্তর নেই।
যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে উত্তর ২৪ পরগনায় অন্তত ১৭ লক্ষ ভোটারকে শুনানির নোটিস পাঠানো হবে, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ ভোটারের বৈধ নথি আগেই জমা পড়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও মুর্শিদাবাদেও এমন ভুক্তভোগী ভোটার সংখ্যা কমপক্ষে ৬ লক্ষ। নদীয়াতেও প্রায় লক্ষাধিক ভোটার এই তালিকায় রয়েছেন। এছাড়াও এই সফটওয়্যারের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে পূর্ব মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমানের মতো জেলাগুলির কয়েক লক্ষ বৈধ ভোটারকে।