এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গোটা দুনিয়ায় চীনকে নতুন করে অবস্থান তৈরির মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছেন। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের বিশেষ প্রতিনিধি সম্প্রতি খুব আশা নিয়ে বলেছেন, ইউরোপের প্রতি ট্রাম্পের আচরণ এতটাই ‘আতঙ্কজনক’ যে, বেজিংয়ের প্রতি সেই মহাদেশের দেশগুলি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। অথচ, কয়েক মাস আগেও চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের ভাবমূর্তি ছিল বিশ্বব্যাপী ‘ব্যাঘাত সৃষ্টির প্রধান কারিগর’ হিসেবে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসন, তাইওয়ানে হস্তক্ষেপের চেষ্টা, সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত ছিল বেজিং। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর জিনপিং অনেকটা সংযত। ট্রাম্পের উন্মত্ত শুল্কযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে যখন ব্যাপক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, মিত্রদের কোণঠাসা করে দিচ্ছে, তখন জিনপিং কৌশলে গোটা বিশ্বকে নিজের দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি ১৯৫০-এর দশকে কোরীয় যুদ্ধের সময়ে মাও সে–তুংয়ের ভাষণের একটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে জিনপিং বলেছেন, ‘আমরা কখনওই মাথা নোয়াব না, পুরোপুরি বিজয় আসা পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’ বার্তাটি পরিষ্কার। জিনপিং ট্রাম্পের মস্তানির কাছে মাথা নোয়াবেন না। চীন যত ধনী ও শক্তিশালী হয়েছে, ততই জিনপিং কূটনৈতিক ছাড়কে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। মাও সে–তুংয়ের মতোই তিনি শান্তি বজায় রাখতে আপস করতে নারাজ। তিনি ভালো করে জানেন, একজন স্বৈরাচারী ও খামখেয়ালি শাসককে কীভাবে ঠেকাতে হয়, বিরোধীদের দমন করতে হয়, সংবামাধ্যমকে নীরব করে দিতে হয়। মাও সে–তুংয়ের কাছ থেকে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন জিনপিং। মাও সে–তুংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় জিনপিং ছিলেন কিশোর। মাও তাঁর বিখ্যাত ‘সদর দপ্তরে তোপ দাগো’ স্লোগান দিয়ে লাখ লাখ রেড গার্ডকে উস্কে দিয়েছিলেন। এই রূপকের অর্থ হচ্ছে, আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে আক্রমণ করা এবং প্রচলিত ব্যবস্থাকে উৎখাত করা। এর ফলাফলটা ছিল, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে ভয়াবহ কোন্দল। নেতারা একে অপরের বিরোধিতা করতে শুরু করেন। তরুণরা তাঁদের শিক্ষক ও মা–বাবাকে অমান্য করতে শুরু করেন। হিংসাত্মক শ্রেণিযুদ্ধ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জিনপিং ব্যক্তিগতভাবে এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই বড় হয়েছেন। ‘গ্রামে চলো’ কর্মসূচির আওতায় কৃষক ও শ্রমিকের সঙ্গে শেখার জন্য তাঁকে অনেক দূরের গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর বাবা ছিলেন ঝানু বিপ্লবী। তাঁকে প্রতিবিপ্লবী আখ্যা দিয়ে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারা থেকে নিজেকে অনেকটাই সরিয়ে রেখেছেন জিনপিং।
কিন্তু ট্রাম্প যেন মাওয়ের সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারায় চলতে চাইছেন। লালফৌজের আদলে গড়ে তোলা প্রাউড বয়েজস (আমেরিকার উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠী) ও অন্যান্য কট্টর গোষ্ঠীকে উস্কে দিয়েছেন। তারা তথাকথিত ডিপ স্টেটকে (রাষ্ট্রের অদৃশ্য ক্রীড়নক, যাঁরা নীতিনির্ধারণ করে দেন) আক্রমণ করছে, আইনপ্রণেতাদের অমান্য করছে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা উল্টে দিতে প্রেসিডেন্টের মদতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে চাইছে। মাও যেমন করে অশিক্ষিত ও বঞ্চিত চীনের কৃষকদের গত শতাব্দীতে গ্রামীণ বিপ্লবের জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন, ঠিক তেমন করেই ট্রাম্প এখন হতাশ ও ক্ষুব্ধ অনুসারীদের দিয়ে আমেরিকা ও বিশ্বব্যবস্থার ভারসাম্য পাল্টে দিতে চাইছেন। মিত্রদের শত্রু করে তুলছেন। আর সেই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিনপিংয়ের চেয়ে ট্রাম্প অনেক বেশি মাওবাদী নেতা। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও সে–তুং যেসব বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিলেন, তার প্রতি জিনপিংয়ের গভীর অনীহা আছে। কিন্তু ট্রাম্প এখন আমেরিকায় সেটাই করছেন। জিনপিংয়ের ঝোঁক হচ্ছে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক শাসনব্যবস্থার প্রতি। তিনি গণবিক্ষোভকে বিপজ্জনক বলে মনে করেন। জিনপিংয়ের পরিকল্পনা মাওয়ের প্রতিধ্বনি নয়। তিনি একটি শক্তিশালী অর্থনীতির উপর ভর করে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর স্বৈরাচারী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান। তিনি আমেরিকার যুদ্ধংদেহি অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নয়, বরং ধৈর্য ধরতে চান। ইউরোপ ও পশ্চিমের ঐতিহাসিক মিত্র (জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া) দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে চান। আর ট্রাম্প চলছেন ঠিক উল্টো পথেই। এতে আখেরে চীনেরই লাভ হবে!