Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাল্যবিবাহ এখনও মস্ত সমস্যা

গত আড়াই দশকে ভারতে বাল্যবিবাহের সমস্যা কিছুটা কমলেও তা বন্ধ করা যায়নি। ইউনিসেফের হিসেবে, এখনও প্রতি তিন সেকেন্ডে একটি করে নাবালিকাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হচ্ছে! দৈনিক বাল্যবিবাহের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি।

বাল্যবিবাহ এখনও মস্ত সমস্যা
  • ৫ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

গত আড়াই দশকে ভারতে বাল্যবিবাহের সমস্যা কিছুটা কমলেও তা বন্ধ করা যায়নি। ইউনিসেফের হিসেবে, এখনও প্রতি তিন সেকেন্ডে একটি করে নাবালিকাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হচ্ছে! দৈনিক বাল্যবিবাহের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। ২০-২৪ বর্ষীয়া ভারতীয় বধূদের মধ্যে ৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের মধ্যে। এমন হতভাগ্য মেয়ের সংখ্যা ৯ কোটির বেশি। অন্যদিকে ১৮ বছরে পৌঁছনোর আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছে ২৩ শতাংশ তরুণীর। এমন ভাগ্যহত নারীর সংখ্যা ২২ কোটির বেশি। ভারতের এই সার্বিক চিত্রে বাংলার মুখটিও কোনোভাবেই উজ্জ্বল নয়। পঞ্চম জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (২০১৯-২১) অনুযায়ী, বাংলার কোনও কোনও জেলায় বাল্যবিবাহের হার ৫০ শতাংশ ছুঁয়েছে। চতুর্থ সমীক্ষার থেকে রাজ্যে গড় নাবালিকা বিবাহের হারের হেরফের হয়নি। আমরা জানি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চালু করেছে। তার মধ্যে কন্যাশ্রী, সবুজসাথী, রূপশ্রী, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এইসব প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের ছাত্রীদের অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। মেয়েদের ক্ষমতায়নে এই প্রকল্পগুলির সাফল্য জাতীয় স্তরে মডেল হয়ে উঠেছে। মিলেছে একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। তারপরও পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহের হার উদ্বেগজনক—২৩.৩ শতাংশ জাতীয় গড়ের পাশে বাংলায় এই পরিসংখ্যান ৪১.৬ শতাংশ! 

Advertisement

অর্থাৎ রাজ্য সরকারের আন্তরিক একগুচ্ছ কার্যকরী পদক্ষেপ সত্ত্বেও নাবালিকা বিবাহের হার এখনও বেশ চড়া। বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসনিক পদক্ষেপে এখনও কিছু গাফিলতি এবং দুর্বলতার দিকই চিহ্নিত করছে এই দুর্ভাগ্যজনক ছবিটা। বাল্যবিবাহের কারণ একাধিক—আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবার, শিক্ষার থেকে মা-বাবার দূরত্ব, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব প্রভৃতি। মেয়েকে পরিবারের বোঝা ভাবার মানসিকতা, পাচার হয়ে যাওয়া কিংবা পালিয়ে গিয়ে যাকে তাকে বিয়ে করে ফেলার ভয়ও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে। বাল্যবিবাহের মতো বিপজ্জনক প্রবণতার অনড় ছবিটা বলে দেয় যে, হাজার সুনাম সত্ত্বেও বাংলা এই জায়গায় এখনও দুর্বল। বলা বাহুল্য, বাল্যবিবাহের শারীরিক, পারিবারিক এবং সামাজিক পরিণাম সবচেয়ে খারাপ। নিরন্তর স্বাস্থ্যবান, শিক্ষিত সুনাগরিক পাওয়ার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ মারাত্মক অন্তরায়। বাংলাসহ ভারতকে ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত’ করার লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে কড়া আইন এবং নানাবিধ প্রশাসনিক পদক্ষেপও করা হয়েছে। কিন্তু বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন ২০০৬ এবং শিশুদের যৌননিগ্রহ প্রতিরোধের আইন ‘পকসো’ ২০১২ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি? এনসিআরবির তথ্য কিন্তু সেই সাক্ষ্য দেয় না। ২০১১ সালের জনগণনায় বাংলায় ৯ লক্ষ ২০ হাজার বাল্যবিবাহের কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু তার দরুন মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল মাত্র ২৭০টি! অর্থাৎ বাকিগুলি দেখেও দেখা হয়নি। নীরব সমর্থনই জোগানো হয়েছে মারাত্মক সামাজিক অপরাধের প্রতি। 
এই জিনিস আর মানবে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন। বাল্যবিবাহ কোনও একটি বা দুটিমাত্র পরিবারের যোগসাজশে সম্ভব হয় না। তার পিছনে সামাজিক সমর্থনও যে পুরোমাত্রায় থাকে, তা পরিষ্কার। শিক্ষার মর্ম উপলব্ধি করেছে এমন কিছু ব্যতিক্রমী মেয়ে নিজেদের বিবাহ রুখে দেওয়ার মতো সাহস দেখিয়েছে। তারা পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে পুলিস প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত প্রায়ই আমাদের সামনে আসে। তারপরেও দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় অল্পবয়সি মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতা পুলিস এলাকাতেও এমন ঘটনার খবর মিলেছিল। নবান্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মেয়েদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আর বরদাস্ত নয়। এমন বিয়ের ভোজ খেতে গেলেও শ্রীঘরবাস করতে হবে নিমন্ত্রিতদের। পোলাও, মাটনের পরিবর্তে খেতে হবে পুলিসের লাঠি! নাবালক পাত্র-পাত্রীর মা-বাবা ও অন্য অভিভাবকরা তো বটেই, ছাড় পাবেন না পুরোহিত, নাপিত, এমনকী সংশ্লিষ্ট ক্যাটারার, ডেকরেটরও। এমন আইনি সংস্থান আর কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি থাকবে না, তার নির্মম সক্রিয়তাই হবে দস্তুর। প্রস্তুতি হিসেবে রাজ্য শিশু সুরক্ষা কমিশনের বিভিন্ন কর্মশালায় বিষয়গুলি নিয়ে সিরিয়াসলি আলোচনা চলছে। আইনের ধারাগুলির উল্লেখসহ বিভিন্ন জেলায় জিঙ্গেল, পোস্টার, হোর্ডিং প্রভৃতি তৈরি হয়েছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাল্যবিবাহের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরার পাশাপশি জানানো হচ্ছে আইনের বিধান। সচেতনতা বৃদ্ধিতে অনেক জেলায় হাতিয়ার সমাজমাধ্যমও। এই উদ্যোগ সব মিলিয়ে সময়োচিত এবং প্রশংসনীয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এই দায় আমাদের সকলের। ‘এগিয়ে বাংলা’ এবং ‘অমৃতকাল’ স্লোগানের বাস্তবায়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সাফল্যই হোক আমাদের বড় হাতিয়ার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ