Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাশিয়ার সস্তা তেল, বড় ঝুঁকি!

চলতি বছরের আগস্টে ভারতের জন্য প্রথম ধাক্কা ছিল, রাশিয়ার তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে আমেরিকার ভারতীয় পণ্য আমদানির উপর ৫০ শতাংশ শুল্কারোপ। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে এক চুক্তি করেছেন।

রাশিয়ার সস্তা তেল, বড় ঝুঁকি!
  • ২১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

চলতি বছরের আগস্টে ভারতের জন্য প্রথম ধাক্কা ছিল, রাশিয়ার তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে আমেরিকার ভারতীয় পণ্য আমদানির উপর ৫০ শতাংশ শুল্কারোপ। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে এক চুক্তি করেছেন। তিনি ‘শীঘ্রই’ রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করবেন। পরের দিন দিল্লিতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ বলেন, রাশিয়ার তেল ভারতের অর্থনীতি ও জনগণের কল্যাণের জন্য খুবই লাভজনক। ভারত সরকার জানায়, তাদের আমদানি নীতি ‘উচ্চমাত্রার অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজারে ভারতীয় ভোক্তাদের স্বার্থ অনুযায়ী’ নির্ধারিত হয়। আসলে মস্কোর সঙ্গে পুরানো বন্ধুত্বের পাশাপাশি ওয়াশিংটন থেকে ক্রমাগত চাপ বাড়তে থাকায় ভারতের জ্বালানি নীতি এখন পরিণত হয়েছে সূক্ষ্মভাবে ভারসাম্য রক্ষার খেলায়। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, রাশিয়ার তেল ভারতের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এই মুহূর্তে রাশিয়ার তেল ছাড়া চলতে পারবে ভারত?

Advertisement

গত বছর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ভারত রাশিয়া থেকে ৫২.৭ বিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল কিনেছে, যা দেশের মোট তেল বাবদ খরচের ৩৭ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, নাইজেরিয়া ও আমেরিকা। রাশিয়ার তেলের আমদানি বাড়ার আগে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারতের শীর্ষ ১০ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশ ছিল রাশিয়া, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, আমেরিকা, ব্রাজিল, কুয়েত, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া এবং ওমান। এছাড়া আরও ৩১টি দেশ কম পরিসরে ও চুক্তিভিত্তিকভাবে ভারতে তেল আমদানি করত এবং আমদানি খরচ বিশ্ববাজারের তেলের দামের ওঠা-নামার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। তবে এটাও ঠিক, ভারত শুধু রাশিয়ার তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। মার্কিন তেলও ভারতের আমদানির বড় অংশ। দিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ভারত মার্কিন পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য ৭.৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, যার মধ্যে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার অপরিশোধিত তেলের জন্য। তারপরও ভারতের সঙ্গে মার্কিন পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হয়েছে। ২০১৮-১৯ সাল থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে ভারতের তেলের আমদানির প্রথম বড় পরিবর্তন ঘটে। ইরান ও ভেনিজুয়েলা থেকে আমদানির পরিমাণ একসময় মোট আমদানির ১৭ শতাংশ বা ৪১ মিলিয়ন টন ছিল। কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়। কারণ, দুই দেশের উপরেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তা ভারতের জন্য তেল আমদানি কঠিন করে তোলে। তাদের জায়গা পূরণ করে ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। রাশিয়ার তেলের আমদানি ২০২১-২২ সালের ৪ মিলিয়ন টন থেকে ২০২৪-২৫ সালে ৮৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়। এর মূল কারণ, রাশিয়ার ছাড়। পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার পর মস্কো তেলের দাম তুলনামূলকভাবে কম করে ভারতীয় রিফাইনারদের কাছে রাশিয়ার তেলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ২০২১-২২ সালের পর রাশিয়ার তেল গড়ে ২০২২-২৩ সালে ১৪.১ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ সালে ১০.৪ শতাংশ ছাড়ে বিক্রি হয়েছে। এর মাধ্যমে ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানি বাবদ বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বা মোট আমদানি খরচের ৩-৪ শতাংশ সাশ্রয় করেছে। যদিও ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ভাগ ১১ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে, তবুও তাদের আসল পরিমাণ অপরিবর্তিত রয়েছে। কারণ, ভারতের মোট আমদানির পরিমাণ ১৯৬ মিলিয়ন টন থেকে ২৪৪ মিলিয়ন টনে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তনটি মূলত অন্যান্য দেশগুলির উপর পড়েছে। আমেরিকা, ব্রাজিল, কুয়েত, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও ওমানের কাছ থেকে আমদানি অর্ধেকের বেশি কমেছে। ৩১টি ছোট সরবরাহকারী দেশ থেকেও আমদানি কমেছে। তবে ভারতে অ্যাঙ্গোলা ও দক্ষিণ কোরিয়ার তেল আমদানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত রাশিয়ার তেল কিনে কিছুটা সাশ্রয় করছে। ভারতের মোট ৯০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও পরিষেবা আমদানি খাতে এর প্রভাব যদিও এক শতাংশের কম, তবুও ৯ বিলিয়ন ডলারের মতো অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। অন্যদিকে, ভারত যদি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করত, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ত। যা কেবল ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের আমদানি খরচ আরও বাড়িয়ে দিত। রুশ অপরিশোধিত তেল কিনে ভারত নিজের অর্থনীতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি গোপনে বিশ্ববাজারের দামও স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে। তাছাড়া ভারতীয় অধিকাংশ শোধনাগার রাশিয়ার ভারী অপরিশোধিত ইউরাল তেলের জন্য মানানসই। পাতলা মার্কিন শেল তেল ব্যবহার করতে গেলে ব্যয়বহুল পুনর্বিন্যাস দরকার হবে। এর ফলে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের উৎপাদন কমে যেতে পারে। ভারতের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত— সস্তার রুশ তেল কিনে আমেরিকার প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেওয়া, নাকি মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার ব্যয়বহুল তেল ব্যবহার করে ঘরোয়া জ্বালানির দাম বাড়ানো। নয়াদিল্লি কোনদিকে যাবে সেটাই দেখার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ