ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়। তার জন্য হাতছাড়া হয় অনেক দুর্লভ সুযোগ। এই জিনিস বারবার ঘটে মানুষের জীবনে। কিন্তু এই কাণ্ড একটি রেজিমেন্টেড পার্টির ক্ষেত্রে হলে তার প্রতি বিশ্বাস ভরসা কমে যায় সকলের। দলের কর্মী-নেতারাও হতাশ হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক দলের মূল লক্ষ্য নির্বাচনি জয়। কিন্তু যে প্রতিপক্ষ উপর্যুপরি আহত হয়েও উঠে দাঁড়াবার শিক্ষালাভে অপারগ, তাকে সত্যিই কিছু বলার নেই। কথাগুলি বঙ্গ বিজেপির জন্য লাগসই। এই যেমন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের কাছে বারবার পর্যুদস্ত হয়েছে—কী লোকসভা নির্বাচন, কী বিধানসভা ভোট, এমনকি লোকাল গভর্নমেন্ট তৈরির ক্ষেত্রেও। নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড়ো খেদ, বাংলা দখল করতে না-পারা। এসআইআরে তৃণমূলকে বেকায়দায় ফেলে বাংলা দখলের শেষ সুযোগ নিতে মরিয়া ছিল বিজেপি। কিন্তু এসআইআরে যে মোটেই সুবিধা হয়নি বেশ বুঝে গিয়েছে তারা। এতে বরং জনমানসে ক্ষোভই বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলায় ভূমিপুত্রদের উপর আর বিশেষ আস্থা রাখতে পারছে না কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাই গত বিধানসভা-লোকসভা নির্বাচনের মতো এবারও বুথ স্তরে পাঠানো হচ্ছে বহিরাগত নেতাদের। আরও লক্ষণীয় যে, এই কারবারের বহর এবার বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য একজন করে ভিন রাজ্যের নেতাকে আনা হয়েছে। সেই ‘ভাড়াটে সৈনিকদের’ দিয়েই বঙ্গবিজয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু যাঁরা এরাজ্যের সংস্কৃতি ও ভাষা বোঝেন না, বাঙালির মন বোঝেন না, তাঁরা বাংলার মানুষের মন জিতবেন কোন জাদুতে?
বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বের ভিতর থেকেই উঠে আসছে এই সংগত প্রশ্ন। কিন্তু তাঁদের আপত্তি এবারও উপেক্ষিত হচ্ছে যথারীতি। দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজস্থান, হরিয়ানা, বিহারসহ কয়েকটি হিন্দিভাষী রাজ্যের আরও প্রায় ছয়শো নেতাকে বাংলায় পাঠাচ্ছেন দিল্লিওয়ালারা। বস্তুত তাঁদের ‘হায়ার’ করা হচ্ছে বাংলার প্রতিটি মণ্ডলের জন্যই। সর্বাধিক সংখ্যক ভাড়াটে সৈনিক পাঠানো হবে পূর্ব বর্ধমান, দুই ২৪ পরগনা এবং দুই মেদিনীপুরে। এরাজ্যে তাঁদের ‘অনুপ্রবেশের’ সূচনা হবে আগামীকাল, মঙ্গলবার থেকে। এই বহিরাগত গেরুয়াবাহিনীর প্রত্যেককেই দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। বাংলায় আগত ভিন রাজ্যের নেতাদের দিনযাপনের জন্য কয়েকদিন আগে প্রত্যাশামতোই এলাহি বন্দোবস্ত করা হয়েছে। হোটেলে থেকে দামি গাড়ি চড়ে তাঁরা বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে যাচ্ছেন। এছাড়া, বিহার থেকে প্রায় ৬০টি মোটরবাইক রাঢ়বঙ্গের জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব যাচ্ছে এখানকার অন্যান্য জোনেও। এতে যথেষ্টই বিরক্ত বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের অনেকে। দলের রাজ্য স্তরের এক নেতার চোখে ধরা পড়েছে, ভিন রাজ্যের নেতাদের জন্য বিপুল টাকা খরচ করা হচ্ছে। অথচ বাংলার বুথ লেভেল সংগঠন চাঙ্গা করতে এর ছিটেফোঁটাও দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত, বুথের কর্মীদের রাজনৈতিকভাবে লড়াইয়ের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। তাঁদের পাশে থাকা। তবেই না পার্টি শাসক দলকে একটা লড়াই দেওয়ার জন্য তৈরি হতে পারবে।
এই নেতাটির পর্যক্ষেণ যথার্থ। কেননা, দিল্লিওয়ালারা ভুলে যাচ্ছেন, ‘বাংলার মাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্জয় ঘাঁটি’। এটা আগেও ছিল। বাংলায় তাঁর তিন দফার বেনজির সুশাসনের সুবাদে এই ঘাঁটি তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সবরকমে দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে। নিরপেক্ষ রাজনৈতিক মহলের অনুমান, রাজ্যের মানুষ বাংলার শাসনভার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে চতুর্থবারের জন্যও তুলে দিতে মুখিয়ে আছেন। নিয়োগ দুর্নীতি, অভয়া কাণ্ড, কসবা ল কলেজে ছাত্রীকে অসম্মানসহ কয়েকটি ইস্যুতে নবান্নকে খানিকটা অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির এক ও একমাত্র উপজীব্য হল উন্নয়ন। তাঁর প্রশাসনের কাছে সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে গরিব ও মধ্যবিত্ত এবং মহিলা। সর্বোপরি তাঁর রাজনীতি এবং প্রশাসনের কাছে সাম্প্রদায়িকতা কখনও কোনওভাবেই প্রশ্রয় পায়নি। কোনও ঘটনাতেই অভিযুক্তদের আড়াল করেনি রাজ্য প্রশাসন। বিরোধীরা দাবি উত্থাপন করার আগেই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে প্রতিটি গন্ডগোলে। সর্বোপরি সব কাণ্ডের আইনি বিচার চলছে এবং রাজ্য সরকার সবসময় রয়েছে আদালতে পাশে। সংবিধাননির্দিষ্টপথে রাজধর্ম পালনের এর চেয়ে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তামাম ভারতের আর কোনও রাজ্য সরকার ইতিপূর্বে স্থাপন করতে পারেনি। তাই বিরোধীদের তোলা বিচ্ছিন্ন ইস্যুগুলি দিনের শেষে গুরুত্ব হারিয়েছে। যেসব ইস্যুতে মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কুপোকাত করার খোয়াব দেখেছিলেন সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্যরা সেগুলি বস্তুত তাঁদেরই কাছে ফিরে গিয়েছে ব্যুমেরাং হয়ে। সারা ভারতকে বশ মানানো যেতে পারে, কিন্তু কোনও সস্তা টোটকায় বাংলা দখলে আসবে না। বিজেপিকে প্রথমে সুসংগঠিত হতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে যে পার্টিটা বাংলার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তার আগে বাংলা ও বাঙালির ভালোবাসা পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। সস্তায় যতবার বাজিমাত করতে চাইবে ততবার হতাশার অধিক কিছুই জুটবে না।