সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্প চলবে, নাকি বাতিল হবে? বিস্তারিত শুনানি শেষে এই মামলার রায়দান স্থগিত রাখল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার শুনানি চলাকালীন জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের দোহাই দিয়ে রাজ্যের প্রকল্প বন্ধের মরিয়া চেষ্টা চালায় মোদি সরকার। তার জেরেই বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা এবং বিচারপতি এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চে কড়া সমালোচনা শুনতে হল কেন্দ্রের আইনজীবী শৈলেশ মাডিয়ালকে। বিচারপতি সন্দীপ মেহতা বলেন, ‘গ্রাহকরা যদি সুবিধা পান, তাহলে আপনাদের আপত্তি কেন? তাছাড়া রেশন প্রকল্পে ডিলাররা সুবিধা পাচ্ছেন কি না, সেটা তো আদতে লক্ষ্য নয়। টার্গেট হল, গ্রাহকরা তা পাচ্ছে কি না। তাই ঘরে বসে পেলে এটি তো রেশন ব্যবস্থার ‘ব্লিঙ্ক ইট’! একই সুরে বিচারপতি বিক্রম নাথও বলেন, ‘আদতে যাদের জন্য এই রেশন, তারা পাচ্ছে কি না, সেটাই তো দেখার।’
যদিও কেন্দ্রের আইনজীবীর সওয়াল, ‘এখন ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড চালু হয়েছে। যে-কোনো রাজ্যের গ্রাহক যে-কোনো রেশন দোকান থেকে খাদ্যশস্য পেতে পারেন। দুয়ারে রেশন কার্যকর করতে সপ্তাহে চারদিন দোকান বন্ধ থাকছে। আর গ্রাহকরা দোকানে গিয়ে ফিরে আসছে।’ তা শুনে বিচারপতি সন্দীপ মেহতার পালটা মন্তব্য, ‘গ্রাহক যদি জানেন বাড়িতে আসবে রেশন, তাহলে শুধু শুধু দোকানে যাবেন কেন?’ রাজ্য সরকারের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী বলেন, ‘জাতীয় আইনেই রেশন ব্যবস্থার সংস্কারের সুযোগ রয়েছে। সেই মতো সংস্কার করেছি। তাছাড়া দুয়ারে রেশন কার্যকর করতে সরকার ডিলারদের প্রতি মাসে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা দেয়। গাড়ি কিনতেও এক লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে।’ যদিও মামলায় বিবাদী রেশন ডিলারদের একাংশের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ, রাজু রামচন্দ্রনদের সওয়াল, ‘চালক, জ্বালানি, খাদ্যশস্য তোলা-নামানো সহ নানা খাতে মাসে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। রাস্তায় দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক কারণে খাদ্যশস্য নষ্ট হলে, তার দায় দোকানিদের উপর চাপায় রাজ্য। ফলে দুয়ারে রেশন ব্যবস্থা বন্ধ হওয়া উচিত।’ ‘অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার্স ফেডারেশন’ও সার্বিকভাবে দুয়ারে রেশন বন্ধের পক্ষে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসু বলেন, মানবিকতার খাতিরে একাকী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য বাড়ি গিয়ে রেশন দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সার্বিকভাবে সব গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছানো কঠিন। আশা করি সুপ্রিম কোর্ট সবদিক বিচার করেই রায় দেবে।
জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গণবণ্টন ব্যবস্থায় বলা আছে ‘ডোর স্টেপ’ ডেলিভারি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ২০২১ সালে এটিকে আক্ষরিক অর্থে কাজে লাগিয়ে ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্প শুরু করে। তার বিরোধিতা কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে রেশন দোকানদারদের একাংশ। রাজ্য সরকার সেখানে হেরে যায়। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য। সেই থেকে ১১ বার শুনানি হয়। এদিন শুনানি শেষে তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, এরপরও যদি কারও কিছু বক্তব্য থাকে, তাহলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে লিখিত আকারে জমা দিতে পারবেন। রায়দান রিজার্ভ রাখা হল।