গত ১১ মে প্রকাশিত হয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ রিপোর্ট। তাতে দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতার প্রশ্নে ভারতের মান অত্যন্ত খারাপ। কেননা ১৮০টি দেশের করাপশান পারসেপশন ইনডেক্সে (সিপিআই) ভারতের র্যাঙ্ক ৯৬। এই র্যাঙ্ক ঠিক হয় ০-১০০ স্কোরের ভিত্তিতে। সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের জন্য বরাদ্দ স্কোর ০, সবচেয়ে স্বচ্ছ দেশের স্কোর ১০০। এই বিচারে ভারতের স্কোর মাত্র ৩৮। পূর্ববর্তী বছরের নিরিখে ভারতের সিপিআই তিন ধাপ নেমে গিয়েছে। ২০২৩ ও ২০২২ সালে ভারতের স্কোর ছিল যথাক্রমে ৩৯ ও ৪০। ভারতের সিপিআই র্যাঙ্ক ২০২৩ সালেও ৯৩ ছিল। ২০২৪ সালে সেটি ৯৬ হয়ে যাওয়ার অর্থ ভারতের মান তিন ধাপ নেমে গিয়েছে এবং দেশে বেড়ে গিয়েছে দুর্নীতির বহর। ভারত যে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের পংক্তিভুক্ত, তা দেশবাসী প্রতি পদেই টের পায়। দারিদ্র্যসীমার নীচের নাগরিকদের জন্য চালু বিবিধ সরকারি প্রকল্প থেকে শিল্প-বাণিজ্য, ঋণ, রাজনীতি, নির্বাচন, শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, এমনকী বহু ধর্মক্ষেত্র—দুর্নীতি কোথায় নেই—সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সমস্ত রসদ এবং সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ভারত যে একটি ‘অনুন্নত’ দেশ বলেই গণ্য হয়, তার কারণ সরকারি ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্নীতি। কালো টাকার সমান্তরাল অর্থনীতিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপি মনে করত, কালো টাকা উদ্ধার করা গেলে প্রতিটি ভারতবাসীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা করা সম্ভব। ইউপিএ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নির্বাচনী প্রচারে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদিই দাবি করেন, তাঁরা কালো টাকা উদ্ধার করবেন এবং কালোবাজারিদের শায়েস্তা ও নির্মূল করে ছাড়বেন। আর তারই ফলশ্রুতি হিসেবে, প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মোদি সরকার ১৫ লক্ষ করে টাকা জমা করবে। ওই প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আর উচ্চবাচ্য করেন না। তবে মাঝেমধ্যেই হুংকার ছাড়েন যে, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। সোজা কথায়, তাঁর সরকার দুর্নীতির সামনে গদা উঁচিয়েই রয়েছে! কিন্তু এই কথারও যে কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইটাও যে মোদি সরকারের আরও একটি ‘জুমলা’ তাও দেশবাসী জানে। যে দেশে বছরের পর বছর শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি থমকে থাকে কিন্তু কিছু ব্যক্তি ধনী থেকে ধানঢ্য হয়ে ওঠে এবং বিশ্বশ্রেষ্ঠ ধনীর তালিকা সমৃদ্ধতর করে তুলতে নিয়মিত অবদান রাখে, সেই দেশের অর্থব্যবস্থা আর যাই হোক সাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পরিচালিত নয়। অস্বচ্ছতা বা দুর্নীতিই হল বৈষম্য বৃদ্ধির এই প্রবণতার জনক।
ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে খাদ্যে ভেজাল একটি সাধারণ ঘটনা। অল্পবিস্তর ভেজাল খাদ্যে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঝুঁকি কম। তাই খাদ্যে ভেজালের ব্যাপারটা নিয়ে ভারতবাসী আর তেমন মাথা ঘামায় না। এটা তাদের গা-সওয়াই হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভেজালের কারবারিরা এখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তারা ওষুধকেও আর ছাড় দিচ্ছে না। সম্প্রতি স্যালাইন থেকে শুরু করে জীবনদায়ী ইঞ্জেকশন এবং অন্যান্য ওষুধও তারা জাল করছে। রীতিমতো রমরমিয়ে চলছে জাল ওষুধের কারখানা। প্যাকেজিং থেকে বারকোড প্রভৃতিও হুবহু নকল করে বহু কোটি টাকার ব্যবসা ফেঁদে বসেছে দুর্বৃত্ত শ্রেণি। এই কাণ্ড সামান্য কিছু সাধারণ ব্যবসায়ী বা দুর্বৃত্তের দুষ্কর্ম ভাবার সুযোগ আর নেই। এর পিছনে যে বহু বড় মাথার আশীর্বাদ রয়েছে তাও খোলসা হচ্ছে ক্রমে। কেননা, একের পর এক হানায় দেখা যাচ্ছে জাল ওষুধের কারবার শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা একটি দুটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত বিহার, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রসহ নানা প্রান্তে। ড্রাগ কন্ট্রোলের যাবতীয় সাফল্য এবং তদন্তের অগ্রগতিই হঠাৎ বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে গিয়েছে। খেল দেখাতে শুরু করেছে উপরতলার কেউ কেউ। শোনা যাচ্ছে, ফোন এসেছে খোদ দিল্লি থেকে। জাল ওষুধ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে এবার লাগাম টানারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে! তাদের তরফে বলা হচ্ছে—‘অনেক হয়েছে। এবার জাল ওষুধের তদন্ত বন্ধ করুন।’ স্বভাবতই তটস্থ হওয়ার পালা ড্রাগ কন্ট্রোলের অফিসারদের। তাই সংগত প্রশ্ন, ঢিলটা কি সত্যিই মৌচাকে পড়েছে? তবে ড্রাগ কন্ট্রোলের সংশ্লিষ্ট অফিসাররা কোনোমতেই দমে যেতে রাজি নন। রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরও বিষয়টির উপর নজর রাখছে বলে আশ্বস্ত করেছে। দেশজুড়ে ভেজাল ওষুধের প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রকও। দুর্নীতি চক্রকে জব্দ করার ব্যাপারে তারপরও কেন মোদি সরকারকে উপযুক্ত ভূমিকায় পাওয়া যাচ্ছে না? আইনি সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়েও এই লড়াইকে দুর্বল করে দেওয়া অন্যায় হবে। দিকে দিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা ছাড়া এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনোদিনই সম্ভব নয়। প্রয়োজনে কঠোরতর আইন আনুক কেন্দ্র।