Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সারা বাংলার জন্য সতর্কতা জরুরি

পরিকল্পিত হামলার শিকার মুর্শিদাবাদ। টানা কয়েকদিনের মুহুর্মুহু আক্রমণে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন কিছু নিরীহ মানুষ। তাঁদের বেশিরভাগই হতদরিদ্র।

সারা বাংলার জন্য সতর্কতা জরুরি
  • ১৬ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পরিকল্পিত হামলার শিকার মুর্শিদাবাদ। টানা কয়েকদিনের মুহুর্মুহু আক্রমণে অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন কিছু নিরীহ মানুষ। তাঁদের বেশিরভাগই হতদরিদ্র। গতবছর বাংলাদেশ অশান্ত হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। বৈষম্য বিরোধিতার নাম দিয়ে ওপার বাংলায় এক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সূচনা হয়। আন্দোলন শুরু করেছিল একদল ছাত্র। তারা বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। তাতে আশান্বিতই হয়েছিল বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ। নীরব সমর্থন ছিল পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র সমাজেরও। কেননা দেশ কাল নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ সবসময় ন্যায় প্রতিষ্ঠার পক্ষেই থাকে। কিন্তু কিছু দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে সংগঠিত ওই আন্দোলন ক্রমে হাসিনা সরকার ফেলে দেওয়ার আন্দোলনের রূপ নেয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দ্রুত আকারে প্রকারে জঙ্গি ও ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। পরিষ্কার হয়ে যায়, এক দল কোমলমতি তরতাজা ছাত্র যুবকে সামনে রেখে পিছন থেকে খেলাটা পরিচালনা করছে কিছু ক্ষমতালোভী রাজনীতির কারবারি। তারা নিছক আওয়ামি লিগ বা হাসিনা বিরোধী নয়, পরিষ্কার ‘পাকিস্তানের দালাল’। তাদের আসল উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের বুক থেকে একাত্তরের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াটুকুও মুছে ফেলা। কারণ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নিয়ে। ক্রমে এও পরিষ্কার হয় যে, গতবছর সংগঠিত ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ভারত বিরোধিতা। পাকিস্তানের দীক্ষিত শক্তির অন্যকিছু যে চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে না। 

Advertisement

মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও যে ভারত বিরোধিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে তৎপর, তা প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বুঝিয়ে দিয়েছেন চীন সফরে গিয়ে। তার আগে কলকাতা দখল, সেভেন সিস্টারস ছিনিয়ে নেওয়া প্রভৃতি হুংকারও একাধিকবার শোনানো হয়েছে সীমান্তের ওপার থেকে। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, পশ্চিমবঙ্গে বড়সড় অশান্তি পাকাবার চেষ্টা তারা করবেই। নয়া ওয়াকফ আইনের বিরোধিতা ওই শক্তিকে হঠাৎই সেই মওকা হাতে তুলে দিল। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ওয়াকফ ইস্যুতে হিংসা, রক্তপাত, অগ্নিসংযোগ আর পাথরবৃষ্টি—কোনোটাই স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ থেকে নয়। বরং মুর্শিদাবাদের সূতি, ধুলিয়ান ও সামশেরগঞ্জের বিভিন্ন অংশকে ‘উপদ্রুত’ বানানোর ব্লু-প্রিন্টটি মাস তিনেকের পুরনো। এই প্ল্যানের হোতারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত দুটি সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এপারের এই সুযোগসন্ধানীদের সঙ্গেই উস্কানি, ইন্ধন, সাহায্য এমনকী গেরিলা কায়দায় হামলা চালানোর জন্য বেশকিছু লোকজনও চোরাপথে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। মুর্শিদাবাদের ওই তিন অংশে অনুমোদনহীন ‘ভুঁইফোড়’ কয়েকটি খারিজি মাদ্রাসায় প্রায় একমাসের বেশি সময় ধরে ‘আশ্রয়’ নিয়েছিল ওই বাংলাদেশিরা। যে কায়দায় হিংসাত্মক ঘটনাগুলি ঘটানো হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নষ্টামির ছাপ স্পষ্ট। এমনকী গত শুক্রবার হাঙ্গামার দিনও ‘দিকনির্দেশ’ করতে সীমান্তের ওপার থেকে তিরিশটির বেশি ফোন এসেছে জঙ্গিপুর মহকুমায়। এই আন্দোলনকে ঢাল করে কীভাবে হিংসাশ্রয়ী হতে হবে, তার নির্দেশ দেওয়া আরও সত্তরটি ‘ঘরোয়া’ মোবাইল কলকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এই হাঙ্গামার ছকে জড়িত জনাপঞ্চাশ দুষ্কৃতীরও হদিশ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। 
গত ফেব্রুয়ারিতে লালগোলা সীমান্তে এক সভায় এসেছিল বাংলাদেশি জঙ্গি সংগঠনের দুই পান্ডা। বড়সড় ‘দাওয়াত’ (হাঙ্গামা?) দেওয়ার কথা শুনিয়ে গিয়েছিল তারা। অশান্তিতে লজিস্টিক সাপোর্ট এবং অর্থ সরবরাহকারী দুটি এনজিওর নামও সামনে এসেছে। পাওয়া গিয়েছে তুরস্ক-যোগ। একসময় কাশ্মীরের বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হতো। তার বিনিময়ে নগদ ‘পারিশ্রমিক’ পেত উচ্ছৃঙ্খল তরুণরা। সারা দুনিয়ার কাছে পরিষ্কার, এই নষ্টামির মদত এবং ফান্ডিং হতো সীমান্তের পশ্চিমপার থেকে। সংগঠিত নষ্টামি সফল করতে পাক সেনা এবং আইএসআই থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া কিছু জঙ্গিকে এপারে চালান করা হতো তখন। মুর্শিদাবাদের মূলত তিন জায়গায় গত বৃহস্পতিবার থেকে যে হাঙ্গামা চলছে তার ভিতরে কাশ্মীরি ছক প্রকট হয়ে উঠেছে। গোয়েন্দাদের কাছে খবর, মুর্শিবাদাদের ঘটনায় অভিযুক্তদেরও ট্রেনিং এবং নগদ পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে। নিকটবর্তী এলাকার রেলপথ থেকে দু’মাস ধরে পাথর জোগাড় করা হয়েছিল। খারিজি মাদ্রাসার পাশাপাশি কিছু গৃহস্থবাড়ির ছাদেও আগাম মজুত করা হয়েছিল বহু পাথর টুকরো। এই ঘটনায় গোয়েন্দা এবং বিএসএফের অদক্ষতা ও ব্যর্থতা পরিষ্কার। এবার অন্তত তাদের সক্রিয়তা জরুরি। অবিলম্বে সমস্ত দোষীকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে শান্তি ফেরাতে হবে দুর্গত প্রতিটি গ্রামে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি যাতে উপযুক্ত পুনর্বাসন পেতে পারে তার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে কেন্দ্র, রাজ্য উভয় সরকারকেই। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে সারা রাজ্যের জন্য। অশান্তির পুনরাবৃত্তি বাংলা চায় না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ