পরিষ্কার ভাবের ঘরে চুরি করে চলেছে আমেরিকা। আরও খোলাখুলি বলা যায়, এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং! আবারও তিনি ধাক্কা দিয়েছেন তাঁর ঘোষিত ‘বন্ধু’ নরেন্দ্র মোদিকে। ট্রাম্প মঙ্গলবারই হুমকি দিয়েছিলেন, ‘রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার পরিণামে ভারতের জরিমানা হবেই। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আরও চড়া শুল্ক চাপাব।’ সেই হুমকি সত্যি করেই বুধবার হোয়াইট হাউস অতিরিক্ত জরিমানার অঙ্ক ঘোষণা করে দিল—আরও ২৫ শতাংশ! সেইমতো এগজিকিউটিভ অর্ডারে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। তাঁর আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার থেকেই ২৫ শতাংশ শুল্ক চেপেছে ভারতীয় পণ্যের উপরে। তার ২৪ ঘণ্টা আগেই জরিমানা ঘোষণা করা হয়। অতিরিক্ত জরিমানা অবশ্য কার্যকর হবে ২৭ আগস্ট থেকে। অর্থাৎ, তখন থেকে মোট শুল্ক ধার্য হবে দ্বিগুণ বা ৫০ শতাংশ! মার্কিন মুলুকে বাণিজ্যে এটাই হতে চলেছে সর্বোচ্চ শুল্ক হার। একমাত্র ব্রাজিলকেই এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বুধবার ভারতকেও এক পংক্তিতে বসিয়েছেন মার্কিন ধনপতি।
ট্রাম্পের এই নয়া শুল্ক-মহাযুদ্ধে ভারতের অর্থনীতি সাময়িকভাবে বিপাকে পড়তে পারে। সবচেয়ে ধাক্কা খেতে পারে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য এবং কাজের বাজার। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত কড়া প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে ভারত। প্রথমে বিদেশ মন্ত্রক এবং পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। ভারতের তরফে সাফ জানানো হয়েছে, আমেরিকার এই পদক্ষেপ ‘ভুল’, ‘অন্যায়’ ও ‘অন্যায্য’। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করতে ভারত প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেবে। তবে ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্কের এই ধাক্কা এড়াতে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপের কথা সরকার ভাবছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিষয়টিতে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সবরকমে তৈরি থাকারই পরামর্শ দিয়েছেন আরবিআই গভর্নর। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত আর্থিক ‘ব্ল্যাকমেল’ আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প আসলে ভারতকে হেনস্তার চেষ্টা করছেন। ‘ট্রাম্প-ট্যারিফ’-এ বড় ধাক্কা খেতে পারে গাড়ির যন্ত্রাংশ, পোশাক, চর্ম, বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম, ইস্পাত, কেমিক্যাল, ওষুধ ও মেডিক্যাল সরঞ্জামের রপ্তানি বাণিজ্য। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ইস্যুতে ইতিমধ্যেই ট্রাম্পকে পাল্টা আয়না দেখিয়েছে ভারত। বিদেশ মন্ত্রক পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রমাণ করে দিয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের দোহাই দেওয়া আমেরিকা নিজেও কীভাবে বিভিন্ন রুশ পণ্য আমদানি করে চলেছে। পুতিন মুলুক থেকে মার্কিন আমদানির তালিকায় রয়েছে পারমাণবিক শিল্পের জরুরি উপাদান ইউরেনিয়াম, হেক্সাফ্লোরাইড, প্যালাডিয়াম এবং নানারকম সার ও রাসায়নিক দ্রব্য। এমনকী, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষ চলাকালেও আমেরিকার আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
তবে এই প্রশ্নে আমেরিকার ন্যাকামির অন্ত নেই! জানতে চাওয়া হয়, রাশিয়ার কাছ থেকে আমেরিকা কি এখনও ইউরেনিয়াম ও সার কিনছে? বিড়ম্বনা এড়াতে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘এই বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। খোঁজ নিয়ে জানতে হবে।’ গুরুতর প্রশ্ন ট্রাম্প এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নিলেও সারা বিশ্ব যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। মার্কিন ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ দপ্তর থেকে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৫২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে আমেরিকার আমদানির পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলার। আমেরিকার সেন্সাস ব্যুরো এবং ব্যুরো অব ইকনমিক অ্যানালিসিস-এর তথ্য বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি পরবর্তী সময়ে রাশিয়া থেকে মোট ২,৪৫১ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে আমেরিকা। এর মধ্যে ২০২৪ সালে আমদানি করা হয় ১২৭ কোটি ডলারের সার। ওই বছরেই ইউরোনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম আমদানির অর্থমূল্য ৬২ কোটি ৪০ লক্ষ ডলার। ৮৭ কোটি ৮০ লক্ষ ডলারের প্যালাডিয়ামও আমদানি করেছিল ট্রাম্পের দেশ। অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধের দোহাই দিয়ে ট্রাম্প ভারতকে দুষলেও আমেরিকা নিজেই মস্কোর সঙ্গে দিব্য বিপুল পরিমাণে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের তোলা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে মার্কিন সরকারেরই নথিতে। পরিষ্কার যে, এই কারণেই না-জানার ভান করছেন ‘ম্যাগা’ নায়ক ট্রাম্প। তাঁর জানা উচিত, সারা বিশ্বকে অন্যায়ভাবে দাবিয়ে রাখার নীতি নিয়ে তিনি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ করতে পারবেন না। ‘বন্ধু’ আর ‘দালাল’ এক জিনিস নয়। ভারত বন্ধুত্বের নীতিতেই আস্থাশীল, মুনিরের মতো দালালি ভারতের রাষ্ট্রনীতিতে নেই। তাই ট্রাম্পের গোঁসা এবং ক্রোধের দায় ট্রাম্পেরই। ভারত তাতে ভয় পাবে না। তাঁর এই ভয়ানক স্বার্থপরতার নীতির পরাজয় নিশ্চিত করবেন যে নায়ক তিনি নিশ্চয় কোনও ‘গোকুলে’ বেড়ে চলেছেন। অহংয়ে অন্ধ আমেরিকা যেন এই অপ্রিয় সত্যটাও ভালোভাবে মনে রাখে।