Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভাঙা রেকর্ড...

ভাঙা রেকর্ডের মতো যে ‘অজুহাত’ ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দেওয়ার কথা, রবিবার দলীয় সভায় বোধহয় সে কথা শুনিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ!

ভাঙা রেকর্ড...
  • ৩ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভাঙা রেকর্ডের মতো যে ‘অজুহাত’ ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দেওয়ার কথা, রবিবার দলীয় সভায় বোধহয় সে কথা শুনিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ! বাংলার বিজেপিকে চাঙ্গা করতে গত বৃহস্পতিবার রাজ্যে এসে মমতার দল ও সরকারের বিরুদ্ধে পাঁচ দফা অভিযোগ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যার জবাবে মোদিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘দম থাকলে বলুন, কালকেই ভোট হোক। আমরা তৈরি, বাংলা তৈরি...’। প্রধানমন্ত্রীর সফরের তিন দিন পর রবিবার মমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে শাহ বললেন, ‘হিংসা, রিগিং না করে ভোটে লড়ে দেখান। আপনার নিজের জামানতটুকুও জব্দ হয়ে যাবে’। শুধু অমিত শাহ নন, বিজেপির বড়-মেজ-ছোট প্রায় সব নেতার বলা এই ভাষ্য বঙ্গবাসীর খুব চেনা। মোদি জমানায় গত এগারো বছরে লোকসভা, বিধানসভা থেকে পঞ্চায়েত পর্যন্ত রাজ্যে যত ভোট হয়েছে তার প্রায় সব ক’টিতেই (ব্যতিক্রম ২০১৯-এর লোকসভা ভোট। সেবার বিজেপি ১৮টি আসন দখল করে রাজ্যের শাসকদলকে আক্ষরিক অর্থে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। যদিও অঙ্কের হিসেবে বেশি আসন পেয়েছিল তৃণমূল) নিদারুণ পরিণতি হয়েছিল পদ্মবাহিনীর। এবং প্রতিবারই দেখা গিয়েছে, নিজেদের ব্যর্থতা নয়, ভোটে হারার জন্য হিংসা আর রিগিং-এর তত্ত্ব খাড়া করেছে গেরুয়া শিবির। ’২৬-এর ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে বিজেপির বঙ্গ নেতারা যতই লাফালাফি করুন, ‘ভোটের চাণক্য’ বলে পরিচিত অমিত শাহের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে কোনও অসুবিধা হয়নি। তিনি বিলক্ষণ জানেন, আবারও কী হতে চলেছে। কিন্তু সব সত্যি প্রকাশ্যে বলা রাজনীতিকদের দস্তুর নয়। ভোটের ময়দানে তো নয়ই। তাহলে দল ধরে রাখাই কঠিন হয়ে যাবে। অতএব চ্যালেঞ্জের নামে সেই ভাঙা রেকর্ডটা সাফাই হিসেবে গেয়ে গেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 

Advertisement

লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে নির্বাচন পরিচালনার পুরোপুরি দায়িত্ব চলে যায় নির্বাচন কমিশনের হাতে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা থেকে ভোট শেষের বিজ্ঞপ্তি জারি—তখন নির্বাচন কমিশনই শেষ কথা। ভোট ক’দফায় হবে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বাহিনী ছাড়াও কত কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোট পরিচালনায় অংশ নেবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র হকদার নির্বাচন কমিশনই। মোদি জমানার ইতিহাস বলছে, বিরোধী শাসিত রাজ্য, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ভোটের দামামা বাজলেই কমিশনের বাড়তি তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। গত এগারো বছরে সবক’টি লোকসভা, বিধানসভা ভোটে দেখা গিয়েছে, রাজ্য প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল করেছে নির্বাচন কমিশন। পক্ষান্তরে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকের ঢল নেমেছে রাজ্যে। কাকতালীয় হলেও সত্যি, মূলত বিজেপির করা অভিযোগকে মান্যতা দিয়ে কার্যত রাজ্য প্রশাসনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার চেষ্টা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দফায় ভোট— তা এই রাজ্যেই হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা— তাও দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। অর্থাৎ ভোট হলেও হিংসা, রিগিং-এর যে প্রচার ও অভিযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিরোধীরা তাতে গুরুত্ব সহকারে সিলমোহর দিয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশন। এবং আইনশৃঙ্খলা সহ ভোট পরিচালনার দায়িত্ব কার্যত অমিত শাহের মন্ত্রকের অধীন কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং কেন্দ্রের পর্যবেক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাই ভোট এলেই এ রাজ্যের মানুষ বিস্ফারিত চোখে দেখে, কমিশনের এমন কড়া দাওয়াইয়ে উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছে গেরুয়া শিবিরে। অনেকে আবার জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেন। বিধানসভা ভোট এলে ‘ছায়া মন্ত্রিসভাও’ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু ভোটের ফলাফল বেরলেই ফের সব স্বপ্ন, আশা তছনছ হয়ে যায়। ২০০টি আসন দখলের খোয়াব থেমে যায় ৭৭-এ। হতাশায় তখনই শোনা যায় সেই ভাঙা রেকর্ড। ‘হিংসা, রিগিং না হলে...’। 
খাতায়-কলমে বিজেপি এ রাজ্যে বিরোধী দল। ২৪-এর লোকসভা ভোটের নিরিখে ৯৭টি বিধানসভা আসনে তারা এগিয়ে ছিল। তৃণমূলের সঙ্গে তাদের ভোটের পার্থক্য মাত্র কয়েক শতাংশ। গত কয়েকটি ভোটে যে তীব্র মেরুকরণের রাজনীতি আমদানি করেছে গেরুয়া শিবির এ তারই ফল সন্দেহ নেই। কিন্তু বিদ্বেষভাষণ, উগ্র হিন্দুত্বের প্রচার, অপারেশন সিন্দুরের ভাবাবেগ উস্কে দিয়ে জাতীয়তাবাদের ঢাক পেটানো, আর গণ্ডায় গণ্ডায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এলেই বিজেপি নবান্ন দখল করে ফেলবে এমন ভাবনা অত্যন্ত সরলীকরণ। অমিত শাহ দলকে নির্বাচনের কাজে এখন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে বলেছেন ঠিকই, কিন্তু এ রাজ্যের বিজেপি অনেকটা ভাঙা কাচের প্লেটের মতো অসংখ্য টুকরোয় বিভক্ত। এ রাজ্যে অর্ধেকের বেশি বুথস্তরে কোনও সংগঠন নেই। একজন রাজ্য সভাপতি ঠিক করা যায়নি আট মাসে। একদম নিচুস্তরে সংগঠনের নেতা ঠিক করা নিয়েও মারপিট করতে দেখা গিয়েছে প্রকাশ্যে। এককথায় নিজেদের ক্যারিশ্মায় লড়াই করার শক্তি নেই বঙ্গ বিজেপির। এই কারণেই আট বছর ধরে মিশন ‘বাংলা দখল’ হচ্ছে না বলে ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন শাহ। সন্দেহ নেই সেই ৮ সংখ্যা এবার ৯ হবে। তারপর আবারও হয়তো শোনা যাবে সেই ভাঙা রেকর্ড, হিংসা, রিগিং না হলে...।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ