Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ব্র্যান্ড নেহরু, ধুস! একটি খোলা চিঠি মোদিজিকে

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহাশয়, আপনাকে অনেক অভিনন্দন। লালকেল্লার ভাষণে আপনি আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা বেঁধে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমরা ধরে নিচ্ছি, আরও দুটো টার্ম আপনি থাকছেন স্যার।

ব্র্যান্ড নেহরু, ধুস! একটি খোলা চিঠি মোদিজিকে
  • ১৯ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহাশয়, আপনাকে অনেক অভিনন্দন। লালকেল্লার ভাষণে আপনি আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা বেঁধে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমরা ধরে নিচ্ছি, আরও দুটো টার্ম আপনি থাকছেন স্যার। বিরোধীদের মুখে চুনকাম করে, সঙ্ঘকে ম্যানেজ দিয়ে এবং বিপুল প্রচারের ফানুসে ভেসে। ইতিহাস গড়লেন আপনি। বুঝিয়ে দিলেন, দলের বাকিদের জন্য ৭৫ একটা বয়স হতে পারে, আপনার জন্য স্রেফ একটা নম্বর। দলের জন্য যেটা নিয়ম, আপনার জন্য সেটাই ব্যতিক্রম। ইতিহাস গড়তে ভালোবাসেন আপনি। ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের রেকর্ড ভেঙেছেন। লালকেল্লায় দীর্ঘতম ১০৩ মিনিটের ভাষণও দিয়েছেন। এই সবই লেখা হয়ে গিয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। লেখা আরও চলছে। এবার স্কুলপাঠ্যেও। কেমন সুনিপুণভাবে দেশভাগের জন্য শুধুমাত্র কংগ্রেসকে দায়ী করে ফেলেছেন আপনারা! মহাত্মা গান্ধী-জওহরলাল নেহরুকে কালপ্রিট বানিয়ে দিয়েছেন। আরএসএসকে মহান, মহৎ, মহোত্তম। স্কুলের ছেলেমেয়েরা এই ইতিহাস পড়বে। আর কিশোর বয়স থেকেই তাদের মনে ঢুকে যাবে বিভেদের বিষ। গান্ধী-নেহরু বিদ্বেষ। চরম প্ল্যানিং। এরপর হয়তো স্বাধীনতা সংগ্রামে সঙ্ঘেরও নতুন কোনও ভূমিকা ছোট ছোট পড়ুয়ারা আবিষ্কার করবে। আমরাও করব। খোঁজ পেলেই। জানি আপনি এবং আপনার নিযুক্ত টিম স্বাধীনতা সংগ্রামে সঙ্ঘের ইতিবাচক ভূমিকা নিরন্তর খুঁজে চলেছে। পেয়ে গেলেই ইতিহাস। লিখবেন আপনি। বলতেই হবে, এভাবে ইতিহাস গড়া আপনাকেই মানায়। যেমন, মুখে নেহরুর নিন্দামন্দ করলেও তাঁকে লক্ষ্য করেই ছুটে চলেছেন আপনি। ইন্দিরার পর তো উনিই একমাত্র আপনার সামনে! প্রধানমন্ত্রিত্বের আর একটা ইনিংস মানেই ছুঁয়ে ফেলবেন আপনি নেহরুজিকে। এইটা আপনাকে করতেই হবে। তাহলেই ইতিহাস। আরও একটা। যদিও পরিস্থিতি এক নয়। একটা ছিল শতবর্ষের সংগ্রাম, বলিদান, রাজনীতি এবং দেশভাগের যন্ত্রণার ভিতের উপর গড়ে ওঠা স্বাধীন ভারতের দায়িত্ব নেওয়া। আর একটা সমাজ, অর্থনীতি, গণতন্ত্রের নির্মিত ইমারতের উপর এক্সপেরিমেন্ট চালানো। আপনার কাজ অনেক বেশি কঠিন। প্রায় সাত দশক ধরে ভারতের মনে বসে যাওয়া ধারণাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উপড়ে ফেলা। যতদিন ওইসব ধারণা মানুষের মনে গেঁথে থাকবে, ইতিহাস হবে না। স্রেফ ঘটনাক্রম নিয়ে খুশি থাকতে হবে। এমন চ্যালেঞ্জ কোন প্রধানমন্ত্রীকে সামাল দিতে হয়েছে? নেহরুজিকে নিয়ে বেকার লোকজন লাফালাফি করে। কী এমন করেছেন তিনি? আপনার দূরদর্শিতা, ভিশন, পরিকল্পনা, একের পর এক প্রকল্পের পুনর্জন্ম... নেহরুতে দেখেছে কি ভারত? হতে পারে স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি বলতে কিছু ছিল না, সংবিধান ছিল না, দুই সীমান্তে দাঙ্গার ঘা দগদগে হয়ে রয়েছে, কোনও প্রশাসন নেই, ভারতে কত মানুষ বাস করে সেটা জানা নেই, গণতন্ত্র কয়েক মুহূর্তের বেসামাল পদক্ষেপে স্বৈরতন্ত্রে বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে... প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্রেডিট নিচ্ছেন, আর এইসব সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াবেন না? এর জন্য নেহরুজিকে নম্বর দিতে হবে? হতে পারে ১৯৫০ সালে তিনি সংবিধান কার্যকর করেছেন, হতে পারে ১৯৬১ সালের মধ্যে ভারত তৃতীয় বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। হতে পারে তিলে তিলে বিদেশনীতির ভিত গড়েছিলেন নেহরু। কিন্তু ওগুলো তো ডিউটি। করতেই হতো। আপনার মতো কি দূরেরটা ভাবতে পেরেছিলেন উনি? আপনারটাই প্রকৃত ভিশন। আপনি বলেছিলেন, কালো টাকা ১০০ দিনের মধ্যে ফেরত আনবেন। নিশ্চয়ই সেই কাজ চলছে। আমরা বিশ্বাস করি। কারণ, কবে সেই ১০০ দিনের কাউন্টডাউন শুরু হবে, সেটা আপনি বলেননি। সময় এলে নিশ্চয়ই বলে দেবেন। আপনার প্রতিশ্রুতি ছিল পূর্ণাঙ্গ লোকপালের। বড় কাজ। সময় তো দিতেই হবে। আর বিরোধীরা কি না বলে চলেছে, ওটাও আপনার ধাপ্পা। এদের মোটেই রেয়াত করা উচিত নয়। আপনার আশ্বাস ছিল, ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ হবে। হয়নি কেন? কারণ, ওরাই আপনার ভিশন বোঝেনি। এত আন্দোলন করলে কি আয় বাড়ে? কৃষি আইন কার্যকর হলে একটু না হয় কর্পোরেটদের সুবিধা হতো। তাতে সাধারণ কৃষকদের মাথাব্যথা না করলেই চলছিল না? ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের কথা না হয় আইনে ছিল না। তার জন্য এত হট্টগোল? লোকজন তো দেখছি নমামি গঙ্গে নিয়েও হাঁকডাক করছে। একবারও দেখছে না এত বড় প্রজেক্ট, সময় দিতে হবে না? ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রথমেই তো বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন আপনি। সেই টাকা কীভাবে খরচ হল বিরোধীরা সেইসব ভুলভাল প্রশ্ন করছে। কোনও মানে হয়? বুলেট ট্রেন চালাবেন বলেছিলেন আপনি। ২০২২ সালের মধ্যে। আরে এইসব দেশবাসী বন্দে ভারতের গায়েই ইট ছোড়ে। বুলেট ট্রেন ভাগ্যিস চালু করেননি! আপনি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র। অথচ আমাদের মতো দেশবাসীর অবস্থা দেখুন, তারা সেই স্বপ্নটা পূরণই করতে পারছে না। দেশে তৈরি জিনিসপত্র কেনাকাটা করলে উৎপাদন ক্ষেত্র সচল হতো। আর সবাই আপনাকে নকল করতে ছুটছে। ‘বুলগারি’ এবং ‘ভাসাশে’ ব্র্যান্ডের সানগ্লাস, বোয়িং কোম্পানির ব্যক্তিগত বিমান, মঁ ব্লা’র পেন, মুভাডো বা রোজার ডুবুয়ি’র ঘড়ি, কপার ভিশনের চশমা, কেনেথ কোল সংস্থার জুতো, রেঞ্জ রোভার গাড়ি... এসব আপনাকেই মানায়। আর আম আদমি কি না এসব দেখে অনুপ্রাণিত হতে চায়! আরে ভারতের ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের সম্পদ আর আয়ের হিসেব বাদ দিলে মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকাও মাথাপিছু ইনকাম নয় এদের। আর এরা কি না বিদেশি ব্র্যান্ডের স্বপ্ন দেখে! আত্মনির্ভর ভারত তো এদের জন্যই করা আপনার। হ্যাঁ, একটু দাম তো দেশীয় জিনিসপত্রেরও বাড়তে পারে। তার জন্য ভোগ্যপণ্য কিনবে না? আসল দেশদ্রোহী তো এইসব খেতে না পাওয়া মানুষগুলো! ইতিহাস গড়া থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে আপনাকে। আপনি এগিয়ে আসতে চাইছেন, আর এরা আবার ঠেলে দিচ্ছে। ঈশ্বরের বরপুত্র আপনি। ঈশ্বর নিজে আপনাকে দেশের জন্য দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে। আর এরা সেটাই দেখতে পাচ্ছে না। বুঝতে পারছে না। অত্যন্ত দুঃখজনক। 

Advertisement

জানেন, পুরনো একটা পত্রিকার কথা মনে পড়ে গেল। প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। স্বাধীনতার আগে। নাম ছিল ‘মডার্ন রিভিউ’। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এর নেপথ্যে। ১৯৩৭ সালে জওহরলাল নেহরু তৃতীয়বারের জন্য কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ওই পত্রিকায় একটা কলাম প্রকাশিত হল। চাণক্য নামে। ওটি যে ছদ্মনাম, সে বোঝার জন্য আইনস্টাইন হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। ছদ্মবেশের আড়ালে নামটা কার, তার থেকেও বেশি চর্চায় ছিল লেখার বিষয়বস্তু—‘রাষ্ট্রপতি’। সেখানে দেখানো হল জওহরলাল নেহরুকে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে। কীভাবে তিনি হুডখোলা গাড়িতে সফর করছেন, হাত নাড়ছেন ঘিরে থাকা অগুনতি সাধারণ মানুষকে, উপভোগ করছেন তাদের আস্থা... বিশ্বাস। চাণক্য লিখলেন, ‘স্লোগান উঠছে, রাষ্ট্রপতি জওহরলাল কি জয়। কিন্তু মাঝে মাঝেই তাঁর ফ্যাকাশে মুখটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বেরিয়ে আসছে ভিতরটা। ওই হাসি, মাথা নাড়ানো, হাত দেখানো... সবটাই ধোঁকা। ওই হাসি, আত্মীয়তা, পাশে থাকার বার্তা... এ কি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা নয়? কেন এই তঞ্চকতা? এই লোকটাই কি দেশ শাসন করবে? কী চায় সে? মুখোশের আড়ালে কী আছে? ক্ষমতার লোভ?... দু’বছর ধরে জওহরলাল নেহরু কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হয়ে বসে আছেন। ধীরে ধীরে দল এবং মানুষের মধ্যে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।... যেন জুলিয়াস সিজার যুদ্ধজয়ে বেরিয়েছেন। এই ব্যক্তি গণতন্ত্রের জন্য আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না তো?... সামান্য একটা ট্যুইস্ট, আর জওহরলাল বদলে যাবে ডিক্টেটরে। মুখে যতই গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের স্লোগান থাকুক না কেন, তাঁর ভাষায় ফ্যাসিজম লুকিয়ে আছে। কোনওদিন সেটা সামনে চলে আসবে না তো?’ চাণক্যর এই লেখা তোলপাড় ফেলেছিল শিক্ষিত মহলে। এভাবে নেহরুকে হাটের মাঝে নামিয়ে আনার ক্ষমতা কার আছে? জানা গিয়েছিল পরে... চাণক্য ছদ্মনামের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন স্বয়ং নেহরু। নিজের প্রতি নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। নিজের মুখোশটা খুলে রেখেছিলেন দেশবাসীর সামনে... যাতে এই মুখোশ আর না পরতে হয়। স্বাধীনতার পর। ক্ষমতালাভের পর। সতর্ক করেছিলেন তিনি কংগ্রেসকে। দেশের মানুষকে। কেন এমনটা করেছিলেন তিনি? রাষ্ট্রনেতা হওয়ার দৌড়ে থাকা এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কি এভাবে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেন? কংগ্রেস বলেছিল, এর জন্য ধক লাগে। আর অন্য রংধারী কয়েকজন বাঁকা হাসি হেসেছিল... বোকামো ভেবে। আপনার কী মনে হয় মোদিজি? সত্যিই তো, দুর্বলতা প্রকাশের মধ্যে কীই বা ক্রেডিট আছে? যা পাওয়া যায় রাশি রাশি প্রতিশ্রুতির বন্যায়। পূরণ হোক বা না হোক। প্রতিশ্রুতির ধারাটা বহমান রাখতে হবে। ভুল বুঝিয়ে যেতে হবে দেশবাসীকে। মূল্যবৃদ্ধি একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। বেকারত্বও। তা সত্ত্বেও বলতে হবে, মূল্যবৃদ্ধি? কোথায়? বেকারত্ব? নেই তো! এই যে এত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছি। সেগুলো নিন্দুকেরা দেখতে পায় না কেন? আদপে চাকরি হোক না হোক। ঘোষণা তো আছে! আপনার জমানায় কত সুন্দর সুন্দর টুপি উপহার দিয়েছেন দেশবাসীকে। আমরাও সেটা পরে ফেলেছি। মশগুল আছি বিকশিত ভারতের আশায়। সবকা সাথ... সবকা বিকাশ। নেহরুজিও এইসব গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের প্রয়োগই করেছিলেন সমাজে। এই ভারতবর্ষে। কিন্তু কোনও স্লোগান দেননি। ওটাই তো ভুল। মার্কেটিং কীভাবে করতে হয়, জানতেনই না উনি। তাই তো দেশভাগের কালপ্রিট। কিন্তু বুঝি না, তাহলে বি আর আম্বেদকর এমন কেন লিখেছিলেন যে, দ্বিজাতি এবং দুই রাষ্ট্রের তত্ত্ব ছিল সাভারকারের? কেন তিনি লিখেছিলেন, ‘মিস্টার সাভারকার এবং মিস্টার জিন্না একে অপরের বিরোধিতা করতেন। রহস্যের বিষয় হল, তাঁরাই দেশভাগে এক কথায় সায় দিয়েছিলেন। তাঁরা শুধু সহমত হননি। বরং সাভারকার এবং জিন্না দেশভাগে জোর দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দুটো দেশই চাই।’ 
আপনি এসবে কান দেবেন না মোদিজি। বিরোধীরা অনেক কিছু বলবে। আপনি আপনার বিপুল কর্মকাণ্ডে এগিয়ে চলুন। আমরা আরও প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই। স্বপ্ন দেখতে চাই। ইতিহাস গড়তে চাই... আপনার সঙ্গে। শুধু ছোট মুখে একটা বড় কথা... নেহরুজির জুতোয় পা গলাতে যাবেন না। ওটা বড্ড বড়। আপনি নিজের কেনেথ কোল আরও কাস্টমাইজ করে নিন। ইতালির ফেরোগামো সংস্থার হ্যান্ড স্টিচড জুতোও ট্রাই করতে পারেন। আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকব। হীরক রাজার দেশে ছবিতে মগজ ধোলাই মেশিন থেকে বেরিয়ে আসার পর ঠিক যেমনটা হতো।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ