সময়কাল ১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ। ৩২০ বছরের ইতিহাস। ভারত শাসনের এই সময়টা ইতিহাসে সুলতানি যুগ হিসেবে চিহ্নিত। ভারতে মুসলিম শাসনের প্রথম যুগ, যা এ দেশের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করেছিল। এই সুলতানি আমলের শেষ সম্রাট লোধির পরাজয়ের মধ্য দিয়েই ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা। ইতিহাস বলছে, ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭-এই ৩৩১ বছরের বেশি সময় ভারত শাসন করেছে মুঘল সম্রাট বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব। সব মিলিয়ে এই সাড়ে ছ’শো বছরের ইতিহাস এবার সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হল। সৌজন্যে: ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি), ব-কলমে কেন্দ্রের মোদি সরকার। এবং এটা কোনও নতুন ঘটনাই নয়। ইতিহাস যে চলমান বর্তমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তা মানেন সকলেই। ইতিহাস মানে ধারাবাহিকতা। অথচ নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির নামে ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও সময়কে স্রেফ মুছে দিচ্ছে উদ্ধত গেরুয়া বাহিনী। এর আগে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যক্রম থেকে মুঘল ইতিহাস ছাড়াও বাদ পড়েছে শিল্প বিপ্লব, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ, বিভিন্ন সংগ্রাম ও আন্দোলন, গণতন্ত্রের বিপদ সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাতির জনক গান্ধীজির হত্যাপর্বও সিলেবাসের বাইরে চলে গিয়েছে। শুধু ইতিহাসে থেমে নেই এই সরকার। মোদির ‘নতুন ভারত’ করার ঘোষণায় জীবনবিজ্ঞান, রসায়ন, সমাজবিজ্ঞান— কেন্দ্রীয় স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে নানা বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে কাঁচি পড়েছে। রেহাই পায়নি ডারউইনের বিবর্তনবাদও। এ দেশের নারীদের সমানাধিকারের লড়াই, ভারতের জলবায়ু ও বন্যপ্রাণ, রসায়নে বিভিন্ন মৌলের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য, দারিদ্র্য-শান্তি-উন্নয়ন, দেশভাগ, ঠান্ডাযুদ্ধ, গুজরাত দাঙ্গা— সব বাদ পড়েছে। বাদ গিয়েছে আরএসএসকে নিষিদ্ধ করার ইতিহাসও। এবার সপ্তম শ্রেণির সিলেবাস থেকে বাদ পড়ল সুলতানি ও মুঘল যুগের ইতিহাস।
এটা মুদ্রার একটা পিঠ। বিরোধীদের বরাবরের অভিযোগ হল, স্কুল শিক্ষায় নিচুস্তর থেকে গৈরিকীকরণের তৎপরতা শুরু করেছে মোদি সরকার। তাই সিলেবাস থেকে ছেঁটে ফেলা শূন্যস্থান পূরণ করতে বিশুদ্ধ ভারতীয় ঐতিহ্য আনার নামে হিন্দু জাগরণের চেষ্টা শুরু হয়েছে। যেমন, সপ্তম শ্রেণির সিলেবাসে ঢুকে পড়েছে শক্তিপীঠ, জ্যোতির্লিঙ্গ, মহাকুম্ভের মতো ধর্মীয় প্রসঙ্গ। পাশাপাশি মোদি সরকারের ‘সাফল্য’ দেখাতে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র মতো প্রকল্পকে সিলেবাসে জায়গা দেওয়া হয়েছে। তর্কের খাতিরে এই নতুন অন্তর্ভুক্তি মেনে নিলেও দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-এর মহাকুম্ভে ৬৬ কোটি মানুষের উপস্থিতির কথা বলা হলেও সেখানে ব্যারিকেড ভেঙে ৩০ জনের মৃত্যু, নানা অব্যবস্থা ও অরাজকতা, গঙ্গার জল দূষণের মতো নেতিবাচক দিকগুলি সিলেবাসে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই কম। অথবা যে দুটি সরকারি প্রকল্পকে ‘সাফল্যে’র কাহিনি হিসেবে সিলেবাসে জায়গা দেওয়া হয়েছে তার ব্যর্থতার ইতিহাসও কি ইতিহাসের পাতায় জায়গা পাবে? দেখা যাচ্ছে, দশ বছর ধরে চালু ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্পে খরচ দেখানো হয়েছে ৯৫২ কোটি ৪ লক্ষ টাকা। কিন্তু এর মধ্যে ৪৫৫ কোটি টাকা খরচের কোনও হিসাবই নেই সরকারের কাছে! মোদির গর্বের এই প্রকল্পে প্রথম কয়েক বছরের শেষে দেখা গিয়েছে, মোট খরচের ৮০ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয়েছে বিজ্ঞাপন ও প্রচারে! ধরা যাক, ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার’ কথা। এখানেও সেই ‘বাজনা বেশি, কাজ কম’-এর ইতিহাস। গোটা বিশ্বে ভারতকে শিল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ২০১৪ সালে এই প্রকল্পের জন্ম হয়েছিল। অথচ শিল্পোৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থা যে মোদি জমানায় আরও সঙ্গিন হয়েছে, তা সরকারি তথ্যেই জানা যায়। প্রশ্ন উঠেছে, সত্যের খাতিরে এসব তথ্য কি ইতিহাসের পাতায় জায়গা পাবে?
ইতিহাসবিদরা বলছেন, ইতিহাসের কোনও অধ্যায় বা সময়কাল নিয়ে বিরুদ্ধ মত, তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু ইতিহাস মুছে দিলে সে সবের সুযোগই থাকবে না। মোদি সরকারের এই ইতিহাস মুছে ফেলা বা বদলে দেওয়ার প্রবণতা যে আসলে ইতিহাসেরই অবমাননা, তার প্রমাণ জার্মানি। সে দেশে একসময়ে প্রবল দাবি উঠেছিল, স্বৈরাচারী হিটলারের শাসনকাল ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া হোক। কিন্তু তা হয়নি ইতিহাসেরই নিয়ম মেনে। আসলে এসবই হল সেই মার্গ দর্শন। যেখানে বিজ্ঞান, কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, অঙ্ক, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি সব কিছুর সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা। এই দর্শনের হাত ধরেই এমবিবিএস পড়ুয়াদের সিলেবাসে ঢুকে পড়েছে হোমিওপ্যাথি-কবিরাজি-ইউনানির আংশিক শিক্ষা। বলা হচ্ছে, ছাত্রদের পড়তে হবে বৈদিক অঙ্ক, জৈব পদার্থবিদ্যার সঙ্গেই হবে আয়ুর্বেদ চর্চা। লক্ষ্য এক ও অভিন্ন— হিন্দুরাষ্ট্র গঠন।