বিরোধীদের ‘শায়েস্তা’ করতে হাতে রয়েছে ইডি, সিবিআই, এনআইএ-র মতো একাধিক তদন্তকারী সংস্থা। মোদি জমানার এগারো বছরে বারবার দেখা গিয়েছে শাসকের প্রতিহিংসার রাজনীতির মুখ্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এ ধরনের সংস্থাগুলি। এই অভিযোগ বিরোধীদের। এই পথে আরও দ্রুত এগতে এবার ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন অমিত শাহরা। সংসদের উভয়কক্ষে সংবিধান (১৩০তম সংশোধন) বিল এনে সরকার প্রস্তাব করেছে, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্র বা রাজ্যের কোনও মন্ত্রী গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে টানা ৩০ দিন জেলে থাকলে তাঁর মন্ত্রিত্ব চলে যাবে। এই বিল সংসদীয় যৌথ কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। কমিটি বিলে সম্মতি জানালেই তা পাস হওয়া মুশকিল। কারণ সংবিধান সংশোধনী কোনও বিল পাস করতে গেলে সংসদের উভয়কক্ষে শাসকদলের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা বিজেপির নেই। তাছাড়াও এমন কোনও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা ষোলোআনা। সেক্ষেত্রে সরকারের মুখ পোড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ একাধিক। প্রথমত, সংবিধান অনুযায়ী ভারতের ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, একমাত্র দোষী সাব্যস্ত হলেই কারও মন্ত্রিত্ব যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আইন বলছে, কেন্দ্র বা রাজ্যে মন্ত্রী নিয়োগ বা অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালের এবং তা হয় যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে। তৃতীয়ত, ২০১৩ সালের ১০ জুলাই কেন্দ্র বনাম লিলি থমাস মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় ঘোষণা করে জানায়, কোনও এমপি, এমএলএ, এমএলসি দোষী সাব্যস্ত হয়ে দু’ বছর জেলে থাকলে তাঁর সদস্যপদ চলে যেতে পারে। তিনি নির্বাচনেও দাঁড়াতে পারবেন না। সংবিধান, আইন ও বিচার বিভাগের এমন স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও অমিত শাহ বিল এনে শাসকের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তুলে দিতে উদ্যত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, নরেন্দ্র মোদি কি তবে ‘হিটলার’ হয়ে উঠতে চাইছেন?
দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। এক্ষেত্রে শাসকের উদ্দেশ্য বা মতিগতির প্রসঙ্গটিকে না হয় বাদ দেওয়া গেল। বিল পেশ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, সাধারণের কাছে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ প্রশাসন তুলে ধরা, দুর্নীতি ও অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় না দেওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য। এককথায় নৈতিকতার পাঠ শুনিয়েছেন শাহ। ভালো কথা। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দেওয়া যাক, একটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে প্রমাণসহ অভিযোগপত্র জমা পড়লেও ইডি কখনও তদন্ত করেনি। ললিত মোদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন বিদেশমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। একের পর এক রেল দুর্ঘটনার পর নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে রেলমন্ত্রী কিংবা মণিপুর জ্বললেও সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ না করে দু’বছর পদ আঁকড়ে থাকার সময় নৈতিকতার প্রশ্ন তো তোলেনি বিজেপি! শাহ নিশ্চয়ই ভুলে যাননি ব্রিজভূষণ সিং বা উন্নাওয়ের বিধায়ক কুলদীপ সিঙ্গারের কথা। ধর্ষণের মতো অভিযোগ উঠলেও সেই সময় মৌনী ছিলেন শাসক নেতারা! একটু লোকসভার কিছু সদস্যের দিকে চোখ ফেরানো যাক। তাতে দেখা যাচ্ছে, মোট ৫৪৩ জন এমপির মধ্যে ২৫১ (৪৬.২ শতাংশ) জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে। এর মধ্যে বিজেপিরই ৯৪ জন আছেন। মোট ২৫১ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১৭০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। শুধু অভিযোগ নয়, ২৩ শতাংশ এমপি মামলায় দোষীও সাব্যস্ত হয়েছেন। আসলে অমিত শাহদের রাজনীতি পরিষ্কার। তদন্তকারী সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের যেকোনও উপায়ে ৩০ দিন জেলে রাখতে পারলে চাপ তৈরির পাশাপাশি জনমানসে নিজেদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তুলে ধরার সুযোগ মিলবে। এতে সরকার ফেলে দেওয়ার কাজও সহজ হবে। প্রশ্ন হল, নৈতিকতার পাঠ কেন নিজের দলের অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের ‘শাস্তি’ দিয়ে শুরু করছেন না মোদি-শাহরা? কেন একজন ‘দাগী’ বলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রার্থী করা হচ্ছে? আসলে এটা করলে মোদি সরকারই হয়তো থাকবে না।
সন্দেহ নেই, কেন্দ্রীয় সরকার যা চাইছে তা সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, সাধারণের অধিকার, সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। এই পদক্ষেপে ফ্যাসিবাদী লক্ষণ স্পষ্ট। মূল লক্ষ্যই হল, তারা চায় বিরোধী বলে কিছু থাকবে না। এক রাষ্ট্র, এক দল-এর শাসন থাকবে এদেশে। এই কারণেই দেখা যায়, ইডির তদন্তে উঠে আসা নামের তালিকায় ৯৫ ভাগই বিরোধী দলের নেতানেত্রী। অভিযোগ, এই বিরোধীদের ‘ফাঁসাতে’ ১৯৩টি মামলা করেছে ইডি। কিন্তু দোষী সাব্যস্ত করা গিয়েছে মাত্র ২ জনকে! দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিধায়ক ও সাংসদদের বিরুদ্ধে ৫ হাজার মামলা নাকি ঝুলে রয়েছে। উদ্দেশ্য এবং তার ফলাফল এমন লজ্জাজনক হলেও ‘বিরোধী দমনে’ নতুন ‘অস্ত্র’ আনতে তৎপর গেরুয়া শিবির। ভারতীয় সেনার হাতে থাকা সুপারসনিক মিসাইল ক্রুজ ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ শব্দের গতির চেয়েও তিনগুণ বেশি গতিসম্পন্ন এবং নিশানায় অব্যর্থ এক অস্ত্র। দেশের শাসক দলও এই গতিতেই বিরোধীদের অব্যর্থ নিশানায় আনতে চাইছে। এই ‘দানবীয়’ বিলটির তাই যৌথ সংসদীয় কমিটির চৌকাঠ পেরনো উচিত নয় বলে মনে করছেন অনেকেই।