ফিরদৌস হাসান, শ্রীনগর: দুপুর আড়াইটে। জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁও থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে, বৈসরণ উপত্যকা তখন জমজমাট। পাহাড়ের কোলে পাইন বন আর সবুজ তৃণভূমি যেন ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’! কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অসংখ্য পর্যটক বেশ খোশমেজাজে। ভূস্বর্গের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এক তরুণ দম্পতি ভেলপুরি খাচ্ছিলেন। একটু দূরে আর এক দম্পতি খুনসুঁটিতে মেতে। কেউ ভাড়া নেওয়া টাট্টুঘোড়ায়, কেউ আবার হেঁটেই ছবি তুলছেন উদ্দেশ্যহীনভাবে। হঠাৎই পথ আটকাল সেনার পোশাকে আসা ৬-৭ জঙ্গি। পর্যটকদের ধর্মপরিচয় জানতে চাইল। কিছুক্ষণ পর একটানা গুলির শব্দ... যাকে বলে ‘ব্রাশ ফায়ারিং’। কোথাও লুকনোর জায়গা নেই। মুহূর্তে রক্তস্নাত সবুজ তৃণভূমি। মাটিতে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল ব্যাগ, জুতো, ভেলপুরির ঠোঙা আর রক্তাক্ত মৃতদেহ। ভয়ে কাঁপতে থাকা মহিলাদের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি গোটা উপত্যকাজুড়ে—‘দয়া করে কেউ বাঁচান!’
মঙ্গলবার দুপুরে পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ এই জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৭ জনের। জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের এক বাসিন্দাও। বিতান অধিকারী (৪০) নামে ওই যুবকের বাড়ি কলকাতার বৈষ্ণবঘাটা বাই লেনে। কর্মসূত্রে বর্তমানে তিনি থাকেন আমেরিকায় ফ্লোরিডায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন নৌসেনার এক অফিসার, দুই বিদেশি এবং দুই স্থানীয়ও। জখম কমপক্ষে ২০। শবরী গুহ নামে কলকাতার আর এক বাসিন্দাও আহত হয়েছেন। হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তোইবার স্থানীয় সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)। জঙ্গিদের খোঁজে শুরু হয়েছে তল্লাশি। সেনা অফিসারদের সন্দেহ, জম্মুর কিস্তওয়ার থেকে কোকেরনাগ হয়ে বৈসরণ পৌঁছেছিল জঙ্গিরা।
উপত্যকায় বেড়াতে এসেছিলেন শুভম ও ঐশন্যা দ্বিবেদী। সদ্য বিয়ে হয়েছিল তাঁদের। জঙ্গিদের গুলি কেড়ে নিয়েছে শুভমের প্রাণ। শোকে ভেঙে পড়েছেন ঐশন্যা। তিনি জানিয়েছেন, আচমকা চড়াও হয় জঙ্গিরা। ওরা প্রথমে ধর্মপরিচয় জানতে চাইছিল। অন্তর্বাস খুলে দেখার চেষ্টা করে। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি চালাতে থাকে। গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন মঞ্জুনাথ রাও নামে কর্ণাটকের এক ব্যবসায়ীও। তাঁর স্ত্রীকে জঙ্গিরা বলে ‘তোকে মারব না। যা, মোদিকে গিয়ে বল!’ হামলার পর উদ্ধারকাজে প্রথম নামেন স্থানীয়রাই। পরে পুলিস ও সেনা ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্সের ভারত সফর চলাকালীন এমন জঙ্গি হামলায় উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এদিনই সৌদি আরবে পৌঁছন। জঙ্গি হামলার খবর পেয়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। মৃতদের পরিবারকে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি মোদির বার্তা, ‘এই হামলার পিছনে থাকা জঙ্গিদের ছাড় দেওয়া হবে না। ওরা কোনওভাবেই সফল হবে না। সন্ত্রাসবাদ খতম করতে আমাদের লড়াই আরও দৃঢ় হবে।’ সন্ধ্যায় শ্রীনগরে পৌঁছন অমিত শাহ। তিনি বলেন, ‘হামলায় জড়িতদের রেয়াত করা হবে না।’ পর্যটন মরশুমে হিংসার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন কাশ্মীরীরাও। পহেলগাঁওতে মোমবাতি মিছিল হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লার কথায়, ‘হামলকারীরা অমানুষ। ক্ষমার যোগ্য নয়।’ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘অত্যন্ত নিন্দনীয় ঘটনা। দোষীরা কেউ যেন রেহাই না পায়।’ চলতি মাসেই কাশ্মীর সফরে গিয়ে অমিত শাহ দাবি করেছিলেন, জঙ্গিদের মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরই এই ঘটনা। পুলওয়ামার পর এত বড় জঙ্গি হামলা দেখা যায়নি। সামনেই অমরনাথ যাত্রা। তার আগে এই হামলা ফের একরাশ প্রশ্ন তুলছে। ভূস্বর্গ কি আদৌ নিরাপদ?