নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বড় শক্তি হয় না, অনেকে এ কথা বলেন। তবে তা প্রমাণ করতে পারেন গুটিকয় কয়েকজন। তাঁদেরই একজন হলেন যুধাজিৎ দে। তিনি চোখে দেখতে পান না। কিন্তু যাঁরা দস্তুরমতো দেখতে পান তাঁদের যুধাজিৎবাবু চিনিয়ে দেন চৌষট্টি খোপ। শিখিয়ে দেন দাবার ম্যারপ্যাঁচ। তিনি উত্তরপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর এই বিরল ক্ষমতাকে এবার সম্মান জানাল দেশ। বুধবার রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেলেন বছর ত্রিশের যুধাজিৎ। পাড়ার ছেলের লড়াইকে সম্মান জানালো দেশ। এই খবর শোনার পর উত্তেজিত উত্তরপাড়া। দিল্লি জয় করে ফেরা ছেলের আসার অপেক্ষায় দিন গুনছে শহর।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের শুভেচ্ছা বার্তায় আপাতত ভাসছেন যুধাজিৎ। তার মধ্যেই দিল্লিতে বসে ইচ্ছাশক্তির জয়গানই করলেন। বলেন, ‘ইচ্ছে থাকলে সত্যিই অনেক কিছু করা যায়। সেই বিশ্বাস নিয়েই জীবনে এগিয়েছি। জন্মের পর চোখ হারিয়েছিলাম। পৃথিবী কেমন দেখতে পাইনি। কিন্তু দু’চোখজুড়ে স্বপ্ন ছিল। হাজার প্রতিবন্ধকতা সেই স্বপ্ন মিলিয়ে যেতে দেয়নি। বাবা, মা এবং যমজ ভাই পাশে ছিলেন। এখনও অনেক কাজ বাকি। সেই পথেই হাঁটতে চাই।’ যুধাজিৎ কথা বলেন ধীরে। প্রতিটি শব্দে প্রত্যয় ফুটে ওঠে। দৃষ্টি নেই বলে সম্ভবত অন্তরের চোখ প্রখর। যে চোখ অন্যের তুলনায় বেশি দেখতে পায়। উত্তরপাড়া পুরসভার চেয়ারম্যান দিলীপ যাদব বলেন, ‘আমরা অপেক্ষায় আছি যুধাজিতের ঘরে ফেরার। উনি উত্তরপাড়া তো বটেই গোটা বাংলাকে গর্বিত করেছেন। উনি আমাদের রোলমডেল।’
খেলা নিয়ে উত্তরপাড়ার ঐতিহ্য আছে। সদ্য উত্তরপাড়াকে গর্বিত করেছেন আকাশ পাল। ভারতের টেবিল টেনিস মিক্স টিমে সুযোগ পেয়েছেন। সম্প্রতি ভারতের প্রতিনিধি হয়ে উড়ে গিয়েছেন চিনের চেংদু’তে। সেখানে বিশ্ব মিক্স টিম টেবিল টেনিসের আসর বসেছে। আকাশকে ঘিরে আবেগ কমার আগেই এসে পৌঁছেছে যুধাজিতের সাফল্যের সংবাদ। গর্বে ভরেছে প্যারিমোহন কলেজ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা দে পরিবারের তিন সদস্যের বুক। চিরকাল বড় ছেলেকে নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন পেশায় ব্যবসায়ী অরূপ দে। দৃষ্টিহীন ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাবা-মা বহু রাত কাটিয়েছেন বিনিদ্র। এবার ছেলে দিল্লি দরবার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন প্রবীণ দম্পতি। এর আগেও বাবা, মা’কে গর্বিত করেছেন যুধাজিৎ। ২০১১ সালে বাংলার রাজ্যপালের হাত থেকে নিয়েছিলেন সেরা ক্রিয়েটিভ শিশুর পুরস্কার। এখন দাবার বেয়াড়া গলিপথে তাঁর অনায়াস চলন। তেমনই ঝড় তুলতে পারেন সেতারে। পাঁচবারের গোল্ড মেডেলিস্ট। তাঁকে সরস্বতীর বরপুত্র বলেন পাড়ার বাসিন্দারা।