শান্তনু দত্তগুপ্ত: তিরিশটির বেশি দেশের নির্বাচন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করেছে তারা। কোথাও স্রেফ হ্যাক করে, কোথাও অন্তর্ঘাত, কোথাও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে স্রোতের মতো ভুয়ো খবর ও প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে। ক্লায়েন্ট? সরকার, রাজনৈতিক দল, সিক্রেট সার্ভিস, সরকারি এজেন্সি বা পয়সাওয়ালা প্রভাবশালী ‘শক্তি’। সাধারণ মানুষকে এরা ধরা দেয় না। কিন্তু নিমেষে ঢুকে পড়তে পারে সাধারণের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে, জি-মেলে, ল্যাপটপে, ফোনে। অন্ধকারের সঙ্গে মিশে থাকা এই ইউনিট যিনি চালান, তাঁর নাম তাল হানান। ইজরায়েলের স্পেশাল সার্ভিসের প্রাক্তনী। বছর ৫০ বয়স। কিন্তু সার্কিটের লোকজন তাঁকে চেনেন অন্য একটি নামে। বরং বলা ভালো ছদ্মনামে। হোরহে। ডাকনাম জর্জ। এর বেশি কিছু তাল হানান সম্পর্কে জানা যায় না। বছর দুয়েক আগে একটি মিডিয়া কনসর্টিয়াম স্টিং অপারেশন চালিয়েছিল। ঢুকে পড়েছিল টিম হোরহের অন্দরমহলে। ক্লায়েন্ট সেজে। বলেছিল, আফ্রিকার একটি দেশে নির্বাচন। সেটা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য কলকাঠি নাড়তে হবে। হেসেছিলেন হানান—হয়ে যাবে।
কাট। চিত্রনাট্যে সামান্য ছেদ প্রয়োজন।
এখানে একটা জরুরি প্রশ্ন রয়েছে। দু’বছর পর আবার ওই প্রসঙ্গ সামনে এল কেন? এর উত্তরেও একটা প্রশ্ন—ওই ৩০টি দেশের মধ্যে কি ভারতও রয়েছে? এই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে কংগ্রেস। ‘ভোট চুরি’ এই মুহূর্তে রাহুল গান্ধীর সবচেয়ে হ্যাপেনিং স্লোগান। প্রচার। এবং অস্ত্র। এই ইস্যুতে লাগাতার প্রেস কনফারেন্স করছেন তিনি। মামলা করছেন না। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগও জানাচ্ছেন না। শুধু সাংবাদিক সম্মেলন। আর কংগ্রেসের নেতানেত্রীরা সেটাই শেয়ার করছেন তাঁদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে। বিরোধী রাজনীতির তেজ এখানেই অস্তাচলে। যাই হোক, এটা সম্পূর্ণ ওই দলের বিষয়। বিরোধিতায় তারা সংসদ অভিযান করবে, কমিশনের অফিস ঘেরাও করবে, নাকি শুধুই সাংবাদিক সম্মেলন। তবে প্রশ্নটা কিন্তু কংগ্রেস মোক্ষম তুলেছে... ওই ৩০টি দেশের মধ্যে ভারত নেই তো?
কাট। ব্যাক টু ফ্ল্যাশব্যাক। হানানের অফিস।
ওপেন সোর্স, সাইবার, স্পেশাল অপারেশন, ইন্টেলিজেন্স। ছ’ঘণ্টার স্টিং অপারেশনে ক্যামেরার সামনে এই সবেরই প্রেজেন্টেশন দেখিয়েছিলেন হানান। তেল আভিভ থেকে ২০ মাইল দূরের দপ্তরে। একটি মোবাইল থাকলেই হবে, আপনার ঠিকুজি-কুষ্ঠি জানতে হানান সাহেবের বেশিক্ষণ লাগবে না। শুধু তাই নয়, আপনার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারেন তিনি। আপনার মেল পড়তে পারেন। গুগল ড্রাইভে ঢুকতে পারেন। আপনার ছবি হাতিয়ে নিতে পারেন। ব্যাংক থেকে যে সব মেল এসেছে, সেগুলো স্ক্যান করতে পারেন। এমনকী আপনার মেসেজ ইনবক্সও তাঁর হাতের মুঠোয়। ঝড়ের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার এক অ্যাকাউন্ট থেকে হাজার হাজার অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে যায় ফেক নিউজ। বদলে যায় পাবলিক ওপিনিয়ন বা জনমত। দু’দশক ধরে এই কাজ করে এসেছে ‘টিম হোরহে’। ৩৩টি অপারেশন। তার মধ্যে সফল ২৭টি। কীসের মাধ্যমে চলছে এই মহান কর্মকাণ্ড? অ্যাডভান্সড ইমপ্যাক্ট মিডিয়া সলিউশন বা এইমস। একটি সফটওয়্যার। এই সফটওয়্যার যদি সেনাপতি হয়, তাহলে এর অধীনে রয়েছে ৩০ হাজারেরও বেশি ভুয়ো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট। এক্স, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, জি-মেল, লিঙ্কডইন এবং ইউটিউবে। এর মধ্যে কোনও ভূতুড়ে ব্যক্তির তো আমাজন অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড, আর বিটকয়েন ওয়ালেটও আছে। সরকার, কর্তৃপক্ষ, সংস্থা মনে করছে, এইসব ব্যক্তির অস্তিত্ব আছে। কিন্তু না। এরা সবাই ‘ভূত’। সাইবার দুনিয়ায় বলা হয় ‘বট’। দেখে মনে হবে, এই সবের পিছনে কোনও ব্যক্তি আছে। কিন্তু না, এমন হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এআইয়ের মাধ্যমে। আর এই সব ভূতের রাজা? হানান। দু’দশক ধরে ভূতেদের চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অথচ, তাঁর ব্যাপারে কেউ কিচ্ছু জানে না। সম্পূর্ণ অন্ধকারে তাঁর অতীত-বর্তমান। ইজরায়েলের সিক্রেট সার্ভিসে অনেকেই কাজ করেছেন। এটা আঁধার দুনিয়ার এমন এক প্রভাবশালীর পরিচয় হতে পারে না। কারা আছে তাঁর পিছনে? কেউ তো রয়েইছে! হানানের সাম্রাজ্যকে বলা হচ্ছে ‘ডিসইনফরমেশন ইন্ডাস্ট্রি’। ‘ব্ল্যাক অপস’। এমনভাবে ভুয়ো তথ্য ও খবর তারা ছড়িয়ে দেবে যে, ভোটে দ্বিতীয় পক্ষের কোমরই ভেঙে যাবে। হয়তো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বাড়িতে আমাজন থেকে এমন ‘উপহার’ গেল, যা দেখে সংসার টিকিয়ে রাখাই মুশকিল। তিনি আর ভোটে লড়বেন কী! প্রার্থীর দুর্নীতির ভুয়ো খবর ছড়িয়ে দেওয়া হল লক্ষ লক্ষ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে। বদলে গেল ভোটের ধারাটাই। কোথা থেকে ছড়ানো হল ফেক নিউজ? ওইসব ‘বট’ বা ভূত। তারা বসে আছে বিশ্বজুড়ে হোরহে ইউনিটের ছ’টি অফিসে। যে কোনও সমাজ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট বানানোটা তাদের কাছে কয়েক মিনিটের ব্যাপার। স্টিং অপারেশনে যাওয়া রিপার্টারদের সেই ডেমোও দেখিয়েছিলেন হানান। ‘আসুন একসঙ্গে একটা প্রোফাইল বানাই। কেমন চাই আপনার? স্প্যানিশ, রাশিয়ান, এশীয়... সব আছে।’ একটি ছবি পছন্দ করলেন হানান। এক সুন্দরী যুবতীর ছবি। বললেন, ‘ইসলা সইয়ার... নাঃ, এই নামটা আমার ভালো লাগছে না। সোফিয়া ওয়াইল্ড! এটা আমার বেশ পছন্দ হচ্ছে। কী বলেন?’ মুহূর্তের মধ্যে তার প্রোফাইল তৈরি হয়ে গেল। সে ব্রিটিশ। লিডসে থাকে। তার অথেন্টিক জন্ম তারিখ আছে। সে ফেসবুক করে, ইনস্টাগ্রাম, এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে এবং ভুয়ো খবর ছড়ায়। প্রয়োজন মতো ‘ব্লগার মেশিন’ কনটেন্ট তৈরি করছে, আর এই ধরনের ফেক অ্যাকাউন্ট তা ছড়িয়ে দিচ্ছে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ বা ভোটারের প্ল্যাটফর্মে। তাঁরা দেখছেন এবং প্রভাবিত হচ্ছেন। এখানেই সাফল্য হোরহে ইউনিটের। একটি বিধানসভা কেন্দ্রে যদি ৬ লক্ষ ভোটার থাকে, তার মধ্যে নির্ণায়ক হয়ে যায় ৫০-৬০ হাজার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সেইসব ফ্লোটিং ভোটারকে খুঁজে বের করাই প্রধান কাজ এই সংস্থার। তাদের প্রভাবিত করতে পারলে ভোটের ফল ‘অনুকূলে’ আসবেই। মজার ব্যাপার হল, একটি ভূতুড়ে অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ আসছে। আপনি তা শেয়ার করছেন, তারপর আবিষ্কার করছেন, সেই ওরিজিন অদ্ভুতভাবে উধাও হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ তা ডিলিট করা হয়েছে। সবটাই করছে ‘এইমস’ সফটওয়্যার। কোথায় পাওয়া যায়? শুধুমাত্র হোরহে ইউনিটের কাছে। দাম? যে যেমন দেবে। কখনও ৪ লক্ষ মার্কিন ডলার। কখনও ৬ লক্ষ। টাকার অঙ্কে সাড়ে ৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। অপারেশনাল খরচ আলাদা। হানান স্বীকার করেছিলেন, ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, মেক্সিকো, সেনেগাল এবং ভারত সহ ২০টি দেশে অপারেশন চালিয়েছে টিম হোরহে। তার মানে কি ভোটকে প্রভাবিত করা নয়? এই স্পাইওয়্যার কাদের কাছে মোবাইলে ঢুকে পড়েছে? বিরোধী রাজনীতিক? সাংবাদিক? সমাজকর্মী? বদলে যাচ্ছে সমীকরণ। রাজনীতির। সমাজের। বদলে দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে। এমন স্পাইওয়্যার কি ঢুকে পড়তে পারে ভোটার তালিকার অন্দরেও? মুছে দিতে পারে নাম? জুড়তে পারে ভোটার? এই প্রশ্ন কিন্তু কংগ্রেস তুলছে। গোটা দেশে এসআইআর বা ইন্টেনসিভ রিভিশন নিয়ে এত তাড়াহুড়ো কেন? পরবর্তী লোকসভা ভোট তো ২০২৯ সালে। তাহলে এই বছরই তা শেষ করতে হবে কেন? তাহলে কি বহু ভুয়ো নাম ঢুকে পড়েছে তালিকায়? নাকি বাদ গিয়েছে? সেইসবেরই ড্যামেজ কন্ট্রোল চলছে? বাংলা সীমান্তবর্তী রাজ্য। ভোটের আগে এখানে এসআইআর হওয়ার মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। বাংলাদেশ থেকে এখানে অনুপ্রবেশ ঘটতেই পারে। ঘটেও। একই অঙ্ক পাঞ্জাব বা রাজস্থানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু গোটা দেশে কেন? রাহুল গান্ধী একের পর এক রাজ্যের এবং কেন্দ্রের ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বলে? কেন্দ্রের নাম ধরে ধরে কত ভোটার নয়ছয় হয়েছে, সেই তথ্য ফাঁস করছেন বলে?
ভোটার তালিকায়, ভোটে, প্রচারে নয়ছয় বা রিগিং কোনও নতুন ঘটনা নয়। চিরকাল হয়েছে এবং হবেও। সময়ের সঙ্গে শুধু এর ধারা বদলেছে। প্রক্রিয়া বদলেছে। আগে যে কাজ লাঠিসোঁটা নিয়ে হতো, এখন সেটাই প্রযুক্তিনির্ভর। আর তা আরও বেশি আতঙ্কের। কারণ আজ শত্রুকে চোখে দেখা যায় না। মেঘনাদের মতো আড়ালে থেকে সে হামলা চালিয়ে যায় সমাজের মনস্তত্ত্বে। শাসক তা ব্যবহার করে, কারণ তার হাতে টাকা আছে। জাতীয় নিরাপত্তার নামে যে কোনও দেশ, যে কোনও রাজনৈতিক দল, যে কোনও রাষ্ট্রনায়ক তা প্রয়োগ করতে পারে সমাজের উপর। ধীরে ধীরে তা আগ্রাসী করে তোলে মানুষকে, মেরুকরণে শান দেয় এবং গণতন্ত্রকেও ঠেলে দেয় একনায়কের শাসনের দিকে। হানান দাবি করেছিলেন, ২০১৫ সালের নাইজরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘কাজ’ করেছেন তিনি। ডিল হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও। যদিও তা রাজনৈতিক নয়। হানান দাবি করেছিলেন, সব গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থার মধ্যে ‘গ্র্যাজুয়েট’ তার ইউনিট। কোন কোন বিষয়ে এক্সপার্ট? অর্থনীতি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্নায়ুযুদ্ধ। ছদ্মবেশে যাওয়া রিপোর্টারদের একজন হানানকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এই যে প্রোফাইল বানাচ্ছেন, ছবিগুলো কোথা থেকে আসছে?’ হানানের উত্তর ছিল, ‘আমি সেটা আপনাকে বলব না। আর বললে, ভবিষ্যতে আমায় আপনাকে খুন করে বডি বালিতে পুঁতে দিতে হবে। আপনি নিশ্চয়ই সেটা চান না!’
বিশ্বের সিগন্যালিং টেলিকম সিস্টেম বা ‘এসএসসেভেন’ হ্যাক করেছে তারা। এই দাবি ছিল হানানের। তাই পৌঁছে যাচ্ছে যে কোনও নম্বরে, অ্যাকাউন্টে, প্রচারে, প্রোপাগান্ডায়। শুধু সঠিক মূল্য দিতে হবে। কে দেবে? হয়তো কোনও সরকার! তাদের সুরক্ষা দেবে? সেটাও হয়তো কোনও সরকার। কারণ, এদের কাছে তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। যা মুহূর্তে সরকার ফেলে দিতে পারে। যুদ্ধ বাঁধাতে পারে। বেআব্রু করে দিতে পারে শাসকের উদ্দেশ্য এবং বিধেয়। তাই টিম হোরহে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক পরিচালিত ডেমোম্যান ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমেও অপারেশন চালাতে পারে। দ্য গার্ডিয়ান এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া নেওয়ার জন্য সেই সংস্থা, মন্ত্রক, কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার মতো টিম হোরহের ‘অংশীদার’ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনও উত্তর পায় না। ফেসবুকের পরিচালক সংস্থা মেটা জানায়, এমন অভিযোগ পেলেই আমরা ভুয়ো অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে ফেলি। আর তাল হানান? তাঁর বক্তব্য, ‘কোনও কিছুই তো আইনের বাইরে করিনি!’ সত্যিই তাই। এইসব সংস্থার স্পাইওয়্যার ব্যবহারের জন্য আমেরিকার মতো দেশ আইন বদলায়। জাতীয় নিরাপত্তার নামে কোনও রাষ্ট্র এদের অভ্যর্থনা জানায়। সবটাই তাহলে আইনের মধ্যেই! আমরা তো চোখের সামনে দেখছি... অনিয়ম হবে। কিন্তু তা আইনের ফাঁক খুঁজে। দুর্নীতি হবে, প্রচারের মাধ্যম হিসেবে। সমাজের ভিত নড়ে যাবে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। আমরা দেখব। মুখ বুজে শুনব। আর মানিয়েও নেব। কারণ, রাষ্ট্রের উপর কেউ নয়।
হানান কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময় দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, ‘এর বেশি বলতে গেলে আমাকে উপরতলায় কথা বলতে হবে।’ কে সেই উপরতলা?