Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একই অঙ্গে কৃষ্ণ-কালী

আর ক’দিন পর কালীনামে ডুব দেবে গোটা বাংলা। শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি চতুর্দিকে। শক্তি সাধনার ধারা দু’টি। একটি কালীকুল। অন্যটি শ্রীকুল। বাংলা মা কালীর ভক্ত। এ ধারাতেই মুণ্ডমালিনীর বিরাট সংসার। সেই সংসারে ভেদাভেদ নেই। জাতপাত নেই।

একই অঙ্গে কৃষ্ণ-কালী
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী: আর ক’দিন পর কালীনামে ডুব দেবে গোটা বাংলা। শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি চতুর্দিকে। শক্তি সাধনার ধারা দু’টি। একটি কালীকুল। অন্যটি শ্রীকুল। বাংলা মা কালীর ভক্ত। এ ধারাতেই মুণ্ডমালিনীর বিরাট সংসার। সেই সংসারে ভেদাভেদ নেই। জাতপাত নেই। 

Advertisement

তিনি দুর্ধর্ষ ডাকাতেরও মা। আবার দুষ্কৃতী দমনকারীরও মা। তিনিই আবার গৃহস্থের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভগবতী দক্ষিণাকালী কিংবা কাল ভৈরবী। তিনিই আবার কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, রামপ্রসাদ, বামাক্ষ্যাপা, অঘোরি সাধু অজয় নাথদের মতো সাধকদের কাছে আত্মার আত্মীয়। পরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে মা কালী হয়ে ওঠেন যেন রক্তে মাংসে গড়া আমাদের আপন গর্ভধারিণী। বাংলায় আজকে যে এই পাড়ায় পাড়ায়, অলিতে গলিতে কালী নামে সবাই পাগলপারা—এর পিছনে শ্রীরামকৃষ্ণের অবদান 
অনস্বীকার্য। তিনিই মা কালীর ভয়ঙ্কর, উগ্র রূপকে মমতাময়ী এক মায়ের চেহারায় নামিয়ে এনে মাতৃ আরাধনার পথকে পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। যেখানে শ্মশানবাসিনী হয়ে উঠেছেন সবার ঘরের মা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ঘোর কলিকালের অবতার। কালীর এই মমতাময়ী, স্নিগ্ধ, আলোকময়ী, হিতৈষিণী রূপকে সামনে এনে তিনি কাল বা সময়ের অচলায়তন ভাঙতে চেয়েছিলেন। কালী সাধনার মধ্য দিয়ে বিভেদকামী সমস্ত শক্তিকে প্রেম-ভক্তির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এনে বলেছিলেন—‘ওরে পাগল, যিনি শ্যাম তিনিই শ্যামা।’ শুনে রে রে করে উঠেছিলেন তৎকালীন তান্ত্রিকদের একটা অংশ। এটা কখনও সম্ভব নাকি! মা কালী মানেই মানুষের মুণ্ডমালা পরিহিতা। লগলগে জ্বিহায় রক্তের ধারা। তাঁর উপাসনায় ‘পঞ্চ-মকার’ (মদ্য-মাংস-মৎস্য-মুদ্রা-মৈথুন) উপাচার অঙ্গ। রাক্ষসদের সঙ্গে সর্বদা শ্মশানে বাস। অন্যদিকে, শ্যাম বা শ্রীকৃষ্ণের অবস্থান মা কালীর একেবারে ভিন্ন মেরুতে। তিনি প্রেম-পূজারি। রাধারানি, গোপী, গোপা, গোরু, পাখি নিয়ে মনোরম এক পরিবেশে বসবাস করেন। বাঁশি বাজান। সেই শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে মা কালীকে এক করে দেখা অশাস্ত্রীয়, গর্হিত অপরাধও বটে। 
কিন্তু, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কি আর শাস্ত্র না জেনে এমন তত্ত্বকথা বলতেন? মোটেও নয়। দ্বারকাধিপতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই দেখিয়ে গিয়েছেন তিনিই একাধারে শ্যাম, একাধারে শ্যামাও। চামুণ্ডা মুণ্ডমালিনীর হাতে প্রেমের বাঁশি ধরিয়ে শ্রীরাধিকার পুজো গ্রহণ করেছেন। রাধারানির উপাস্য কালী তখন উগ্রচণ্ডা, ভয়ঙ্করী নন। বরং তিনি প্রেম-ভালোবাসার এক মূর্ত প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার প্রেমকে চিরন্তন করতে তিনি আবিভূর্তা। সত্যিই তো, সেদিন ব্রজের কাননে স্ত্রী রাধাকে কৃষ্ণের সঙ্গে একান্তে দেখলে নিশ্চয় একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড বাঁধিয়ে বসতেন স্বামী আয়ান ঘোষ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছলনা তিনি টের পাননি বলেই হয়তো রাধাকৃষ্ণের প্রেম আজও অমর। যুগল মূর্তিতে দু’জনে আমাদের আরাধ্য। কিন্তু, সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল ব্রজধামে? এ নিয়ে দুর্দান্ত এক পৌরাণিক উপাখ্যান রয়েছে। সে কথায় পরে আসছি। তার আগে সংক্ষেপে জেনে নেওয়া ভালো মা কালী এলেন কোথা থেকে? তা হলে উপাখ্যানটির মর্মার্থ আত্মস্থ করা খানিক সহজ হবে। 
কালিকা পুরাণ থেকে জানা যায়, পুরাকালে সারা ব্রহ্মাণ্ডে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুর। তাঁদের অত্যাচারে দেবতারা পর্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত। যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে তাঁরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। দেবলোক থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় দেবরাজ ইন্দ্রকে। বেগতিক বুঝে তিনি আদ্যাশক্তি মা মহামায়ার তপস্যা শুরু করেন। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে আবির্ভূতা হন। তাঁর শরীরের কোষ থেকে সৃষ্টি হন দেবী কৌশিকী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা। এটাই আজকের দেবী কালীর আদিরূপ। ওদিকে অসুরদের তাণ্ডবলীলা চলছেই। তাঁরা ব্রহ্মার আশীর্বাদে বলিয়ান। রোখার সাধ্যি কার! রুদ্রমূর্তি ধারণ করে কৌশিকী শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেও দেখলেন স্বর্গ-মর্ত্যে অসুরদের অত্যাচার বন্ধ হচ্ছে না। বীরবিক্রমে কৌশিকীর উপর নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন চণ্ড এবং মুণ্ড নামে দুই অসুর। তীব্র ক্রোধের সঙ্গে জবাব দেন দেবী। তাঁর ক্রোধ এতটাই ছিল যে মুখ কালো হয়ে যায়। কপাল থেকে বেরিয়ে আসে কালী।  ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত গ্রন্থ ‘দেবীমাহাত্ম্যম্‌’-এ আমরা কালীর যে চেহারার বর্ণনা পাই তা এরকম—গাঢ় নীলবর্ণা। ক্ষীণ চোখ। বাঘের চামড়া দিয়ে তৈরি  শাড়ি পরিহিতা। গলায় মানুষের মাথার খুলি দিয়ে গাঁথা মালা। এই উগ্রমূর্তি ধারণ করে তিনি চণ্ড ও মুণ্ডকে পরাজিত করেন। কিন্তু, অসুরদের প্রধান রক্তবীজকে কোনওভাবে দেবী বাগে আনতে পারছিলেন না। ব্রহ্মার বরে তিনি অপরাজেয়। তাঁর এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লেই জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার অসুর। মহামায়া দেখলেন এ তো ঘোর বিপত্তি! তখন তিনি নিজের ভ্রু যুগল থেকে সৃষ্টি করলেন মা কালীর আর এক রূপ। সেই রূপ দেবী কৌশিকীর চেয়েও আরও ভয়ঙ্কর। এক এক করে সব অসুরকে বধ করতে থাকেন তিনি। সব শেষে রক্তবীজকে খতম করে তাঁর দেহের সমস্ত রক্ত পান করে নেন মা কালী। যাতে এক ফোঁটা রক্তও মাটির স্পর্শ না পায়। এখানে আমরা মা কালীর দু’টি রূপের কথা জানলাম। এছাড়াও একাধিক পুরাণে ভিন্ন ভিন্ন রূপে তিনি আবির্ভূতা হয়েছেন। 
এমনই এক মা কালীর পরম সাধক ছিলেন শ্রীরাধিকার স্বামী আয়ান ঘোষ। জটিলা ও কুটিলা ছিলেন তাঁর মা ও বোন। দু’জনেই সর্বদা চেষ্টা করতেন, রাধা আর কৃষ্ণের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে। তারজন্য নানা কৌশল অবলম্বন করতেন। কৃষ্ণকে উদ্দেশ করে কটু মন্তব্য করতেন। বিনা দোষে শাস্তি দিতেন। উদ্ভট নামেও ডাকতেন তাঁকে। কৃষ্ণ খুব একটা গোলমালে যেতেন না। অবিরাম শান্ত তিনি। 
দুধ-ঘিয়ের কারবার করে সংসার চালাতেন আয়ান। একদিন তিনি হাটে গেলেন ভালো একটা গোরু কিনতে। অনেক বাছাইয়ের পর একটি গোরু তাঁর মনে ধরে। বিক্রেতাকে কড়ি মেটাতে গিয়ে দেখলেন কিছুটা কম পড়েছে। সেই কড়ি নিতে ঘরে আসবেন ঠিক করলেন। এদিকে, আয়ানের হাটে যাওয়ার আগে কৃষ্ণ একটা কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছেন। আয়ান বাড়িতে থাকবেন না জেনেই রটিয়ে দেন, রাধারানিকে দেখতে আয়ানের ছদ্মবেশ ধরে তাঁর বাড়িতে যাবেন কৃষ্ণ। হাওয়ার খবর শুনে কৃষ্ণকে উচিত শিক্ষা দিতে তৈরি জটিলা-কুটিলা। গ্রামে ঠিক ঢোকার মুখে লাঠিসোঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দু’জনে। ছদ্মবেশী কৃষ্ণকে কোনওভাবেই রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দেবেন না। 
বিকেল গড়িয়ে তখন গোধূলি। কড়ি নিতে ঘরে ফিরছেন আয়ান। গ্রামে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই জটিলা-কুটিলা তাঁকে ছদ্মবেশী কৃষ্ণ ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আয়ান যতই মা-বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তিনি কৃষ্ণ নন। গোরু কেনার টাকা কম পড়েছে, সেটা নিতে এসেছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! বাধ্য হয়ে আয়ান পালিয়ে যান। এর ঠিক কিছু পরেই আয়ানের ছদ্মবেশে রাধিকার সঙ্গে দেখা করতে আসেন কৃষ্ণ। তাঁকে দেখে জটিলা ও কুটিলার দরদ উথলে ওঠে। জড়িয়ে ধরে কৃষ্ণের অভিসন্ধির সবিস্তার ব্যাখ্যা করেন। কৃষ্ণ কীভাবে আয়ানের ছদ্মবেশে রাধিকার সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিলেন, কীভাবে তাঁরা তাড়িয়েছেন—ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্তর্যামী কৃষ্ণ শুধু মুচকি হাসেন। এরপর গুরুগম্ভীর মুখ করে তিনি বলেন, ওসব বাদ দাও। রাধারানির এখন উচিত মঙ্গলময়ীর পুজো করা। এরজন্য তাঁকে উপবাস করতে হবে। সারা রাত মন্দিরে পুজো করতে হবে। জটিলা-কুটিলা ছদ্মবেশী কৃষ্ণের কথায় সায় দিয়ে রাধারানিকে ব্রজের জঙ্গলে মঙ্গলময়ীর মন্দিরে যাওয়ার ছাড়পত্র দেন। রাধারানি কৃষ্ণের এই ছলনা সম্পর্কে জানতেন। আর সময় নষ্ট না করে তিনি মহানন্দে মঙ্গলময়ীর মন্দিরে চলে যান। 
গোল বাঁধল আয়ান ঘোষ ঘরে ফিরে আসতেই। জটিলা-কুটিলা তো হতবাক। তাঁরা এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, প্রথমে যাঁকে তাঁরা কৃষ্ণ ভেবেছিলেন, তিনিই আসলে আয়ান ঘোষ। আর যাঁর নির্দেশে তাঁরা রাধাকে মন্দিরে পাঠিয়েছেন, তিনি আসলে ছদ্মবেশধারী শ্রীকৃষ্ণ। আয়ানও বুঝতে পারলেন, একটা কোথাও গোলমাল হয়ে গিয়েছে। রাধিকাকে ঘরে ফিরিয়ে আনাই এখন তাঁর একমাত্র উপায়। জটিলা-কুটিলাও নির্দেশ দিলেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না আয়ান। যদিও রাধারানির পবিত্রতা নিয়ে আয়ানের চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস। তাঁর স্ত্রী খারাপ কিছু করতেই পারেন না। কেননা, রাধা সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। গত জন্মে কঠোর তপস্যার পর শ্রীলক্ষ্মীকে পত্নী রূপে পেয়েছেন তিনি। ঠিক সময়ে স্ত্রী ফিরে আসবে। কিন্তু, জটিলা-কুটিলার প্ররোচনায় রাধাকে খুঁজতে গেলেন জঙ্গলে। পিছনে পিছনে জটিলা-কুটিলা।
মঙ্গলময়ীর মন্দিরে তখন একান্ত প্রেমে মশগুল শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা। কৃষ্ণ অবশ্য জানতেন, স্ত্রীর খোঁজে আয়ান জঙ্গলে আসবেনই। রাধার কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, স্বামী তাঁর খোঁজে জঙ্গলে আসবেন! শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণের আশঙ্কাই সত্যি হল। তিনি দেখলেন আয়ান আসছেন। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রাধিকাকে বললেন, দ্রুত কিছু ফুল কুড়িয়ে এনে আমাকে নিবেদন করো। কৃষ্ণের কথা মতো রাধিকা তড়িঘড়ি কিছু ফুল এনে পুজো করতে শুরু করলেন। ততক্ষণে আয়ান, জটিলা-কুটিলা মন্দিরের সামনে চলে এসেছেন। রাধিকাকে ধমক দেওয়ার মুহূর্তে আয়ান দেখলেন, ইনি তো কৃষ্ণ নন! সে এক অপূর্ব দৃশ্য। স্ত্রী রাধিকা ভক্তিভাবে শক্তিদেবীর আরাধনায় মগ্ন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎ মুণ্ডমালিনী মা কালী। হাতে বাঁশি। স্বয়ং আদ্যাশক্তির পায়ে ফুল নিবেদন করছেন স্ত্রী রাধিকা। একজন কালী সাধকের কাছে এরচেয়ে আর কী ভালো হতে পারে? আয়ান ভাবতে লাগলেন, আমি মা কালীর সাধক হয়েও মায়ের এমন রূপ তো কখনও দেখিনি। তিনিও স্ত্রীর পাশে বসে প্রার্থনা করতে লাগলেন। 
পৌরাণিক এই উপাখ্যান থেকে সৃষ্টি হল মা কালীর আর এক রূপ—তিনি কৃষ্ণকালী। ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে ‘যিনিই শ্যামা তিনিই শ্যাম’। আসলে, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর শক্তি-স্বরূপ সর্বদা বিরাজ করেন যোগমায়া। সেই মায়ার খেলাতেই রাধিকার সঙ্গে প্রেম বন্ধনকে চিরন্তন করতে কৃষ্ণ নেন কালী রূপ। এই কৃষ্ণকালী হিন্দুধর্মের দুই বিবদমান ধারা শাক্ত এবং বৈষ্ণবের সমন্বয়ের প্রতীক। উভয় সম্প্রদায়েরই কাছে তিনি উপাস্য। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ