Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিজেপির অভিন্ন দেওয়ানি বিধির টার্গেট সংখ্যালঘুরাই

ভগবানের চোখে তাঁর এই জগৎ সংসারের সব প্রাণীই সমান। পরীক্ষাগৃহ তাই ‘দেবভূমি’ উত্তরাখণ্ড! দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে সম্প্রতি উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালু করেছে।

বিজেপির অভিন্ন দেওয়ানি বিধির টার্গেট সংখ্যালঘুরাই
  • ৯ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অভিজিৎ দাস: ভগবানের চোখে তাঁর এই জগৎ সংসারের সব প্রাণীই সমান। পরীক্ষাগৃহ তাই ‘দেবভূমি’ উত্তরাখণ্ড! দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে সম্প্রতি উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালু করেছে। এর আগে গোয়ায় ১৯৬৭ সালের পর্তুগিজ সিভিল কোডের ভিত্তিতে এক ধরনের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হয়েছিল বটে, তবে তাতে ঔপনিবেশিক শাসনের গন্ধ ছিল। বিদেশি শাসন পরবর্তী অধ্যায়ে দেশের বর্তমান গেরুয়া শাসকের এই উদ্যোগে নিশ্চিতভাবেই নজর রাখতে হবে। সমাজের সব অংশের মধ্যে সমতা আনার অছিলায় কী অঙ্ক চলছে? সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিত ও তার যৌক্তিকতা— খতিয়ে দেখা প্রয়োজন দুই বিষয়ই।

Advertisement

শুরু করা যাক প্রেক্ষিত দিয়ে। প্রতিষ্ঠালগ্ন 
থেকেই ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রে প্রাপ্ত হিন্দুত্বের এজেন্ডা নিয়ে পথ চলা শুরু করেছিল বিজেপি। সামগ্রিকভাবে সঙ্ঘ পরিবারের নয়া-ফ্যাসীবাদের রাজনৈতিক 
মুখ পদ্মপার্টি। রামমন্দির আন্দোলন ‘ডেড ইস্যু’ হয়ে পড়ায় বিজেপির হিন্দুত্বের এজেন্ডার নয়া 
হাতিয়ার হতে চলেছে দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর জিগির। উত্তরাখণ্ড দিয়ে শুরু হয়েছে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
উত্তরাখণ্ড দিয়ে শুরু হয়েছে ঠিক কথা। তবে এ পথে পা বাড়াতে চাইছে বিজেপি শাসিত অন্য রাজ্যগুলিও। প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু করেছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ। ইচ্ছুক রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম হল অসম, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও উত্তরপ্রদেশ। গুজরাত সরকার ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গড়েছে। খসড়া বিল তৈরির লক্ষ্যে প্রাথমিক কাজকর্ম করবে ওই কমিটি। তবে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা সত্ত্বেও উত্তরাখণ্ডের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট ও কম জনসংখ্যার রাজ্যেও পূর্ণভাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে ব্যর্থ হয়েছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সরকার রাজ্যের তফসিলি উপজাতিভুক্ত মানুষকে ইউসিসির আওতার বাইরে রাখতে বাধ্য হয়েছে। উত্তরাখণ্ডের জনবিন্যাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই পাহাড়ি রাজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি বাসিন্দা হিন্দু। মুসলিম জনসংখ্যা ১৪ শতাংশের মতো। বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান ও শিখ সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের সংখ্যা একত্রে ৩ শতাশের আশপাশে। এই রাজ্যে সামগ্রিকভাবে তফসিলি উপজাতি শ্রেণিভুক্ত মানুষের সংখ্যাটা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে। তা সত্ত্বেও এই শ্রেণিকে চটানোর সাহস হয়নি শাসকদলের। ভোট যে বড় বালাই! উত্তরাণ্ডের মতো ছোট রাজ্যে এই হাল হলে যেসব রাজ্যে প্রচুর আদিবাসী মানুষের বাস, সেখানে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক রীতিনীতিতে হাত দেওয়ার হিম্মত কি দেখাবে বিজেপি? বাস্তব বুদ্ধি বলছে, সেখানে বিজেপির তথাকথিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির জলহীন মাছের দশা হবে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রচারের কারণে আদিবাসী সমাজের ক্ষোভ টের পেয়ে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বই আবার দু’মুখো কথা বলছেন। আদিবাসী মানুষের জন্য পৃথক বিধির কথা শোনা যাচ্ছে তাঁদের মুখে। ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, সারনা ধর্মের জন্য পৃথক বিধি তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করবে বিজেপি। আবার সেই অমিত শাহই বাকি সব জায়গায় বলে বেড়াচ্ছেন, বিজেপি শাসিত সব রাজ্যেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে। কিন্তু ঝাড়খণ্ডে শাহ যা বলেছেন তা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রচার কি আরও একটা জুমলা? বিষয়টি দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের ভরসায় চলা বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির নিছক আরও একটি কৌশল ছাড়া অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রচার আর কিছুই নয়। কারও কারও অভিযোগ, দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলিম সমাজকে হেনস্তা করা ছাড়া এর আর অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।
এ তো গেল পরিপ্রেক্ষিতের দিকটি। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর যৌক্তিকতা? বলা হচ্ছে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সবচেয়ে বড় দিক হল মহিলাদের ক্ষমতায়ন। অভিন্ন বিধি চালুর উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোনও সম্প্রদায় বা ব্যক্তিকে টার্গেট করা নয়। সম্প্রতি দেরাদুনে ৩৮তম ন্যাশনাল গেমসের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্য ছিল, সাম্যের মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করেই উত্তরাখণ্ডের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি তৈরি করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ মহিলাদের জন্য সমানাধিকারের গ্যারান্টি। ক্রীড়াক্ষেত্রেও বৈষম্যহীনতার এই আদর্শই মেনে চলা হয়। এর আগে ঠিক একই সুর শোনা গিয়েছিল উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির মুখে। পাহাড়ি এই রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর ঘোষণা করার সময় তাঁর বক্তব্য ছিল, বহুগামিতার নিষিদ্ধকরণ, বিবাহ বিচ্ছেদের অভিন্ন প্রক্রিয়া ও পারিবারিক সম্পত্তিতে পুরুষ ও মহিলাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে উত্তরাখণ্ড প্রগতিশীলতার পথে বড় পদক্ষেপ করল। কিন্তু ঘটনা হল, উত্তরাধিকার ও বিবাহ বিচ্ছেদের প্রশ্নে লিঙ্গ বৈষম্য এড়াতে আগে থেকেই আইন রয়েছে। আবার উত্তরাখণ্ডের অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে যেভাবে লিভ-ইন সম্পর্ককে নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, তাতে গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। মুখ্যমন্ত্রী ধামির যুক্তি, ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানো নয়, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দিল্লির শ্রদ্ধা ওয়াকার হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে তাঁর মন্তব্য, ‘কোনও ‘আফতাব’ যাতে আর কখনও আমাদের মেয়ে ও বোনেদের ওইভাবে টার্গেট করতে না পারে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা।’ একটি আইনের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে এর থেকে খারাপ ও বিভাজনমূলক যুক্তি আর হতে পারে কি? এবিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হওয়ার প্রথম দশদিনে মাত্র একটি লিভ-ইন সম্পর্ক সরকারি খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আইনের মাধ্যমে সরকারি চাপ সত্ত্বেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার খর্ব হোক, তা মোটেও চাইছেন না সেরাজ্যের সাধারণ নাগরিকরা।  
মুখে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা বলা হলেও বাস্তবে তার টার্গেট শুধুমাত্র মুসলিম পার্সোনাল কোড। উত্তরাধিকারি আইনের দিকটিই যদি ধরা হয়, হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের (এইচইউএফ) বিশেষ অধিকারের জায়গায় হাত দেওয়া হয়নি। ফলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর ক্ষেত্রে বাছবিছার করা হয়নি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতের নিরিখে সম্পূর্ণ অভিন্ন 
বিধি স্পষ্টতই অসম্ভব। তা কাঙ্ক্ষিতও নয়। বিচারপতি বি এস চৌহানের নেতৃত্বে ২১তম আইন কমিশনকে (২০১৫-২০১৮) ভার দেওয়া হয়েছিল 
দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য। বিচারপতি চৌহানের নেতৃত্বাধীন 
কমিশন তাদের মতামত পেশ করতে গিয়ে 
বলেছিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর উদ্যোগ ‘অপ্রয়োজনীয়’। একইসঙ্গে তা ‘অযাচিত’ও বটে। ভারতের বৈচিত্র্যের প্রশ্নে এরকম কোনও অভিন্ন বিধি মোটেও সুখকর হবে না।
২১তম আইন কমিশনের ওই মতামত যে রাতারাতি বদলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশে তৈরি হয়েছে, তা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। মহিলাদের ক্ষমতায়ন যে আবশ্যিক, সেবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে হবে, এটা কোনও যুক্তিসঙ্গত কথা হতে পারে না। কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীকে নিশানা না বানিয়ে যদি সত্যিই বাস্তবসম্মতভাবে সামগ্রিক জনকল্যাণের স্বার্থে অভিন্ন বিধি তৈরি করতে হয়, তাহলে সেজন্য বৃহত্তর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এবং অবশ্যই ভারতের বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদকে মর্যাদা না দিয়ে তা করা অসম্ভব। সমাজের সব শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে খোলা মনে ও নিরপেক্ষ পরিসরে বিস্তারিতভাবে সেই আলোচনা করতে হবে। সকলের মত মন দিয়ে শুনতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে তাঁদের সকলের ভাবনা ও প্রচলিত রীতিনীতিকে। খসড়া বিধি নিয়ে আগে গড়ে তুলতে হবে ঐক্যমত। ধৈর্য নিয়ে খোলা মনে না এগিয়ে বিশেষ কোনও অংশ বা শ্রেণিকে নিশানা বানানোর মনোভাব নিলে আদতে দেশে স্থায়ী মেরুকরণের পরিবেশ তৈরি হবে। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ আদতে জুমলায় পরিণত হবে। বিজেপির বর্তমান পদক্ষেপ বাস্তবে সেই লক্ষ্যেই এগচ্ছে। সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার অছিলায় সংখ্যালঘু মুসলিমরাই বোধহয় তাদের একমাত্র টার্গেট।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ