Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিজেপির কানাগলির রাজনীতি

ক্ষুদ্রভাবে সৃষ্ট কোনও জিনিস সুন্দর হতে পারে। কারণ সেই ক্ষুদ্রত্বে সম্পূর্ণতাও বিদ্যমান। কিন্তু যখন কোনও আস্ত জিনিসকে খণ্ড খণ্ড এবং ক্ষুদ্র করে ফেলা হয় তখন সেই খণ্ডিত অংশগুলির মধ্যে সম্পূর্ণতার অভাব প্রকট হয় স্বতঃই। ফলত, খণ্ডিত ক্ষুদ্রাংশগুলি স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে সূচনাতেই।

বিজেপির কানাগলির রাজনীতি
  • ২০ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ক্ষুদ্রভাবে সৃষ্ট কোনও জিনিস সুন্দর হতে পারে। কারণ সেই ক্ষুদ্রত্বে সম্পূর্ণতাও বিদ্যমান। কিন্তু যখন কোনও আস্ত জিনিসকে খণ্ড খণ্ড এবং ক্ষুদ্র করে ফেলা হয় তখন সেই খণ্ডিত অংশগুলির মধ্যে সম্পূর্ণতার অভাব প্রকট হয় স্বতঃই। ফলত, খণ্ডিত ক্ষুদ্রাংশগুলি স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে সূচনাতেই। এই লক্ষণ বিচ্ছিন্নতার অভিশাপ মাত্র। ক্ষুদ্রত্বের সাধনায় যে কোনও সমাধান নেই, তার প্রমাণ এই উপমহাদেশ উপলব্ধি করে সর্বক্ষণ। ধর্মের জিগির তুলে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে কী পেয়েছিল বিচ্ছিন্ন দুটি ভূমিভাগ? জিন্নার স্বপ্নরাষ্ট্র অচিরে আরও বিচ্ছিন্নতাবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টির সুখ পাকিস্তানবাসীর জন্য সিকি শতকও স্থায়ী হয়নি। পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ নাম নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তারপরেও কি সুখে আছে খণ্ডিত পাকিস্তান এবং ‘স্বাধীন’ বাংলাদেশ? এই দুই রাষ্ট্রের সামনে আজও বৃহত্তম চ্যালেঞ্জের নাম বিচ্ছিন্নতাবাদ। বিশেষ করে পাকিস্তানের কোণে কোণে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয়। তারা পাকিস্তানকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে মরিয়া। শাহবাজ শরিফ এবং আসিম মুনিরের খপ্পর থেকে মুক্তিলাভই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। দেশাভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতার জিগিরে ঘুম ছুটে গিয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান মাতব্বর মহম্মদ ইউনুসেরও। অর্থাৎ ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অংশ কোনোভাবেই আর ভারতের তুল্য নয়: গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা, শান্তি-সুস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব—কোনও প্রশ্নেই নয়। বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিতে আক্রান্ত ইউরোপ, আফ্রিকা এবং একাধিক এশীয় অঞ্চলও। ইউএসএসআর-এর সাবেক প্রজাতন্ত্রগুলি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও কি সুস্থিতি খুঁজে পেয়েছে? উত্তর নিহিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভিতরে। ফায়দা লুটছে মূলত আমেরিকা। দুর্বলতর হচ্ছে ইউক্রেন, রাশিয়া উভয়েই। বিচ্ছিন্ন দুই কোরিয়া একে অপরের জাতশত্রু যেন! বিচ্ছিন্ন খণ্ড ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়া যে কোনও সমাধান নয়, তা দেরিতে হলেও বুঝেছিল জার্মানি। আন্তর্জাতিক চক্রান্তে জার্মানি পূর্ব এবং পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। ১৯৯০ সালে ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানি নামে পুনর্মিলিত হয়েই তারা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছিল। 

Advertisement

প্রশাসনিক সুবিধা এবং উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার যুক্তিতে স্বাধীনতার পর থেকে গত আট দশকে ভারতেও কয়েকবার একাধিক রাজ্য পুনর্গঠন করা হয়েছে। কিন্তু বৃহৎ রাজ্য ভেঙে ছোটো ছোটো রাজ্য গঠনই যে সমৃদ্ধির চাবিকাঠি নয়, তার প্রমাণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি। সেখানে উন্নয়নের বদলে বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিই সংক্রামিত এবং বহুবর্ধিত হয়েছে। হিন্দি বলয়ে একাধিক রাজ্য বিভাজনের নীতি কোন সুফল দিয়েছে? ভারতের উন্নয়নচিত্রে কি তার কিছুমাত্র প্রভাব আমরা লক্ষ্য করেছি? নিরপেক্ষ উত্তর: ‘না’। ভারতের যাবতীয় সমস্যার মূলে রকমারি বৈষম্য। বৈষম্য দূর করা যায়নি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থেকেই নানা ক্ষেত্রে বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং অর্থায়ন। উন্নয়নের গতি বস্তুত টেনে ধরে রেখেছে এই রোগ। এর থেকেই অশিক্ষা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, ভগ্নস্বাস্থ্য প্রভৃতি মিলে একটি নাছোড় দুষ্টচক্র সক্রিয় তামাম ভারতে। এই গোড়ার গলদ দূর করার পরিবর্তে এদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি সংকীর্ণতার নীতি নিয়ে চলেছে। তাদের মূল লক্ষ্য, যেনতেন প্রকারে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা। যেমন ফের উঠেছে গোর্খাল্যান্ডের জিগির! মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছে কেন্দ্র। তার ভিতরে প্রকট হয়ে পড়েছে বঙ্গভঙ্গের উসকানি। ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে বিজেপির হাতিয়ার এই বিচ্ছিন্নতার নীতি। আচমকা পাহাড়-ডুয়ার্সের মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিল মোদি সরকার। সেটাও একতরফাভাবে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আলোচনা ছাড়াই। বর্ষা শেষের বিপর্যয় থেকে সবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এলাকা। সেই আবহে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে ফের গোর্খাল্যান্ডের জিগির তোলার কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে। 
এতে বেজায় ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিবাদে শনিবার তিনি চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেই। এই মতলব অবিলম্বে থামবারও দাবি জানিয়েছেন বাংলার নেত্রী। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে পাহাড়ের ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের’ কথা বলেছিল বিজেপি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাগাতার আন্দোলনে কার্যত ‘ব্যাকফায়ার’ করে সেই প্ল্যান। পরবর্তীকালে ফের বঙ্গভঙ্গের জিগির তোলেন মোদি-অমিত শাহের দলের নেতারা। কিন্তু তা ব্যুমেরাং হতেই গত নির্বাচনের ইস্তাহারে পদ্মপার্টি স্পিকটি নট হয়ে ছিল। তবে তলায় তলায় যে বাংলা ভাগের চক্রান্ত চলছিলই, তা ফের প্রমাণিত হল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সর্বশেষ নির্দেশিকায়। দার্জিলিংয়ের বিজেপি এপি রাজু বিস্তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টেও রয়েছে তার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তে খুশি জিএনএলএফ-ও। সোজা কথায়, দার্জিলিং পাহাড়ের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ফের সংকীর্ণ রাজনীতির কানাগলিতে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই সত্য পাহাড়ের অভিজ্ঞ নাগরিকদের এখনই উপলব্ধি করা দরকার। না-হলে সেখানকার উন্নয়ন এবং শান্তিসুস্থিতির যতটুকু অগ্রগতি ঘটেছে সেটুকুও অচিরে জলাঞ্জলি যাবে। তার মূল্য চোকাতে হবে পাহাড়ের অর্থনীতিকেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ