তন্ময় মল্লিক: বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, সাপ হয়ে কামড়ে ওঝা হয়ে ঝাড়া। এসআইআর ইস্যুতে বঙ্গ বিজেপি এখন ‘ওঝা’ হতে চাইছে। এসআইআর ‘বিষে’ জর্জরিত রাজ্যবাসী। তারজন্য বিজেপিকেই দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। সেটা টের পেতেই আম জনতার হয়রানির দায় রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের উপর চাপিয়ে বঙ্গ বিজেপির নেতারা ‘সাধু’ সাজার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, তাতে লাভ হবে না। কারণ বাংলার মানুষ হল সেই ‘রাজহাঁস’ যারা দুধ আর জলকে আলাদা করার ক্ষমতা রাখে।
এরাজ্যের বিরোধীরা শাসকদলকে চেপে ধরার জন্য অনেক ইস্যু পেয়েছিল। কিন্তু, কোনো ইস্যুই দানা বাঁধেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরি দিতে চান না, বিরোধীদের এই প্রচার এখন আর ধোপে টিকছে না। কারণ শুরু হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া। কয়লা, গোরু পাচার নিয়ে হইচই করলেও কেন্দ্রীয় এজেন্সি কাউকে শাস্তি দিতে পারেনি। বিরোধীরা এই সমস্ত ইস্যুতে বাজার গরম করেছে। চেষ্টা হয়েছে বিভাজন সৃষ্টির। কিন্তু, তাতে সাধারণ মানুষ প্রভাবিত হয়নি। ২০১৬ সাল থেকে হওয়া প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি ফলে মিলেছে তারই প্রমাণ।
এটা বাংলায় ভোটের বছর। তাই পেশ হয়েছে অন্তর্বর্তী বাজেট। তাকে ঘিরেও মানুষের ছিল প্রত্যাশা। বাড়বে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা। প্রসারিত হবে সামাজিক প্রকল্পের আঙিনা। পূরণ হয়েছে প্রত্যাশা। বেড়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুদান। প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা মিলবে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই। আর আগস্ট থেকে শুরু হবে বেকার যুবক-যুবতীদের মাসে দেড় হাজার টাকা অনুদান দেওয়া। অবশ্য তার আগে হবে নির্বাচন। ফলে এটা আপাতত প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তা কার্যকর হওয়া নিয়ে কোনো সংশয় নেই। মানুষের এই বিশ্বাসের কারণ, প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তাই তাঁর আশ্বাস আর বিজেপির গিমিকের ফারাকটা সকলের কাছেই স্পষ্ট। সেই কারণে মহিলাদের মাসে ৩ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বিজেপি বললেও বিশ্বাস করছে না কেউই।
বিজেপি মনে করে, সামাজিক প্রকল্প নয়, সংখ্যালঘু ভোট তাদের বাংলা দখলের পথে প্রধান অন্তরায়। তাই চলছে সংখ্যালঘু ভোট ভাঙানোর মরিয়া চেষ্টা। এসআইআরকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু ভোট কাটতে পারলেই বাংলায় বিজেপি অভীষ্ট লক্ষ্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস। তবে, উতরে দেওয়ার দায়িত্বটা ছিল বিজেপির সঙ্গে ঘর করে আসা হুমায়ুন কবীরের উপর। বাবরি মসজিদের শিলান্যাস নিয়ে সংখ্যালঘুদের চেয়ে গেরুয়া নেতাদের আগ্রহ কোনো অংশে কম ছিল না। তাঁরা আশা করেছিলেন, মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলায় শাসক দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে হুমায়ুনের বাবরি মসজিদ। কিন্তু, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির জন্য বিজেপির সেই ‘চাল’ ভেস্তে গিয়েছে।
সমস্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের তালিকায় থাকলেও সংখ্যালঘুরাই টার্গেট। সংখ্যালঘুরা সাধারণত বিজেপিকে ভোট দেন না। কিন্তু, তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের উপর রাগ থেকে অনেকে অন্য দলকে ভোট দেন। এরাজ্যে সিপিএম এবং কংগ্রেস ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। তাদের দিয়ে তৃণমূলের ক্ষতি করা সম্ভব নয় বুঝেই সংখ্যালঘু ভোট ভাঙার জন্য হুমায়ুন কবীরকে হাতিয়ার করতে চেয়েছিল বিজেপির একাংশ।
একটা কথা ঠিক, ‘বাবরি মসজিদ’ নামটির প্রতি মুসলিমদের একটা আবেগ আছে। তাই মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস সংখ্যালঘুদের নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু, এসআইআর হয়রানির ক্ষোভ সেই আবেগকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে। কমিশনের কাজে তাঁরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ এবং একই সঙ্গে ভীতও। তার জবাব নির্বাচনে দেওয়ার জন্য তাঁরা তৈরি হচ্ছেন। মহল্লায় মহল্লায় শুরু হয়েছে হুইস্পারিং ক্যাম্পেন, ‘কিছুতেই ভোট ভাগ হতে দেওয়া যাবে না।’ এই ক্যাম্পেন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের শিলান্যাসের কোনো ফায়দা বিজেপি পাবে না।
বিজেপি নেতারা বলেছিলেন, বাংলাদেশি মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্যই এসআইআর। কিন্তু কমিশনের ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় লক্ষ লক্ষ হিন্দুর নাম। কমিশনের নির্দেশে তাঁদেরও দাঁড়াতে হয়েছে শুনানির লাইনে। তাতে দলমত, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ প্রচণ্ড চটেছে। সেটা বুঝেই বিজেপি নেতারা এসআইআরের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তবে, দায় চাপাচ্ছেন রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের উপর।
বঙ্গ বিজেপি চিন্তাভাবনা করেই এসআইআর হয়বানির দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের ঘাড়ে চাপাতে চেয়েছিল। গোয়েবেলসীয় প্রচারে হয়তো কিছু মানুষ বিভ্রান্ত হত। কিন্তু তাদের সব আশায় জল ঢেলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূল সুপ্রিমোর মানুষের অধিকার রক্ষার সওয়াল। নির্বাচন কমিশনারের কাছে বিহিত চাওয়া যে অরণ্যে রোদন হবে, সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানতেন। তাই তিনি সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের সামনে তুলে ধরেছেন রাজ্যবাসীর চরম হয়রানি ও দুর্ভোগের কথা। তিনি একটিবারও এসআইআর বাতিলের কথা বলেননি। তাঁর একটাই দাবি, মানুষের অধিকার রক্ষা করুন। নামের ও পদবির বানান ভুলকে হাতিয়ার করে কমিশন মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। এর বিহিত করুন।
আদালত বলেছে, ‘ছোটোখাটো ত্রুটির জন্য নাম বাদ যেতে পারে না। মানুষকে নোটিস ধরানোর সময় আরও সংবেদনশীল হতে হবে।’ এছাড়াও বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে মাইক্রো অবজার্ভার এনে নাম বাদ দেওয়ার ছকও ভেস্তে দিয়েছেন মমতা। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত রায় না দিলেও সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের মন্তব্য কমিশনের বেপরোয়া মনোভাবের পায়ে লাগাম পড়ানোর জন্য যথেষ্ট।
এসআইআরের বিরোধিতা করেছে বিজেপি বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দল। তার মধ্যে সিপিএম, কংগ্রেসও আছে। কিন্তু সেই বিরোধিতা সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে। বেকারদের চাকরি খাওয়ার জন্য আদালতে ছোটা সিপিএমের অধিকাংশ আইনজীবীই এসআইআর নিয়ে ছিলেন নীরব। কেউ কেউ ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের বিবৃতি দিয়ে দায় সেরেছেন। কিন্তু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি কাঁপাতেই সিপিএম তাঁকে হেয় করার যৎপরোনাস্তি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনজীবীরা বলছেন, সওয়াল পর্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য বিচারপতিরা যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন তাতে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে কমিশনকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিতে পারে। যদিও আদালত কী রায় দেবে, সেটা সম্পূর্ণভাবে মাননীয় বিচারপতিদের উপর নির্ভর করছে। সেই রায় শোনার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে রাজ্যের মানুষ। তবে রায় যাই হোক না কেন, মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই লড়াই বাঙালির হৃদয়কে ছুঁয়ে গিয়েছে। আদালতে জয়-পরাজয় হয় আইনি লড়াইয়ে, কিন্তু আবেগ জিতে নেয় মানুষের হৃদয়। সেই আবেগের ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক বামপন্থী চিকিৎসক, অধ্যাপক, মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর এই লড়াইকে মুক্তকণ্ঠে সাবাসি দিচ্ছেন। তার জন্য তাঁদের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘চটিচাটা’ তকমা। তবুও কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় করা পোস্ট প্রত্যাহার করেননি। কারণ সময়ের ডাককে তাঁরা উপেক্ষা করতে পারছেন না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইকে যখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রায় সমস্ত দল কুর্নিশ জানাচ্ছে তখন কংগ্রেস, সিপিএম ঘুরপাক খাচ্ছে সেই কানাগলিতে। মানুষের অধিকার রক্ষায় নজিরবিহীন লড়াইয়েও তাঁর পাশে নেই। কারণ তারা মুখে বিজেপি বিরোধী হলেও অন্তরে মমতা-বিদ্বেষী। তাই কেউ খিল্লি ওড়াচ্ছে, কেউ পেশাদার উকিলের সঙ্গে ফারাক খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাম-কংগ্রেস নেতৃত্ব বুঝেছে, মানুষের হয়ে লড়াইয়ে মাঠে বা কোর্টে তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না। ধারে ও ভারে সিপিএম আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে বহু যোজন দূরে। আর কংগ্রেস? সংখ্যার ভার বেশি হলেও বিজেপি বিরোধিতায় মমতার আন্দোলনের ‘ধার’-এর কাছে তারা ‘ভোঁতা’। তাই বিজেপিকে চেপে ধরার বদলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করে গেরুয়া শিবিরকে অক্সিজেন জোগাচ্ছে।
জীবনের হতাশা থেকে মুক্তি দেন রবীন্দ্রনাথ, আবার লড়াইয়ের শক্তিও জোগান তিনিই। তাই রবীন্দ্রনাথ আমাদের এত কাছের মানুষ। এত আপনজন। তাঁর কবিতায় রয়েছে বাধা পেরিয়ে সম্মুখে এগিয়ে চলার নির্দেশ, ‘ছিঁড়ব বাধা রক্ত পায়ে/ চলব ছুটে রৌদ্রে ছায়ে,/ জড়িয়ে ওরা আপন গায়ে/ কেবলি ফাঁদ ফাঁদবে।/ কাঁদবে ওরা কাঁদবে।’ তাই যতই হোক সমালোচনা, যতই পাতা হোক ফাঁদ, তবুও জারি থাক লড়াই-অধিকার রক্ষার।