২০২৪-এর লোকসভা ভোটে তাদের প্রত্যাশামতো বিজেপি যদি ৪০০ আসন পেত, তাহলে যে সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দু’টির অচিরেই মৃত্যু ঘটত, প্রকারান্তরে সেটাই আবার বুঝিয়ে দিলেন আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে। উপলক্ষ্য ছিল ‘জরুরি অবস্থার পঞ্চাশ বছর’ শীর্ষক আলোচনাসভা। ইন্দিরা জমানায় জরুরি অবস্থা জারির ২৫ জুনের সেই দিনটি ‘সংবিধান হত্যা দিবস’ হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার। সংবিধান ‘রক্ষা’ করার সেই অনুষ্ঠানেই সংবিধানের প্রস্তাবনার মূল সুর বদলে দেওয়ার কথা শোনা গেল আরএসএস-এর এই বড়কর্তার মুখে! তাঁর মতে, প্রস্তাবনায় ওই দুটি শব্দ থাকা উচিত কি না তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা উচিত। আরএসএস নেতার এই পুরনো বিতর্ককে খুঁচিয়ে তোলা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ কিংবা বিজেপি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিবৃতি না দিলেও তাঁদের একাধিক মন্ত্রী-নেতাও মনে করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড় নয়। সেই কারণেই সংবিধান প্রণেতারা প্রস্তাবনায় এই শব্দ দুটি রাখেননি। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মতো নেতাদের অভিমত, এই শব্দ দুটি সংবিধানের উপর বড় ধাক্কা। হিন্দুত্ববাদীদের এই ভাবনাকে অবশ্য গত বছরের নভেম্বর মাসেই ছয় মেরে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে ভারতের শীর্ষ আদালত। তবু দমে যাওয়ার লক্ষণ নেই আরএসএস-বিজেপির! তা তাদের কর্মকাণ্ডেই স্পষ্ট।
দেশে সংবিধান প্রণয়নের সময়ে তার প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (সাধারণতন্ত্র) হিসাবে গড়ে তোলার কথা বলা হলেও তাতে স্থান পায়নি সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ দুটি। জরুরি অবস্থা চলাকালীন ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২তম সংশোধন করে প্রস্তাবনায় শব্দ দুটি ঢোকান ইন্দিরা গান্ধী। বিতর্ক মূলত এই নিয়েই। আরএসএস তথা বিজেপির বক্তব্য, মূল প্রস্তাবনায় এই শব্দ দুটি রাখা হয়নি অনেক চিন্তাভাবনা করেই। অথচ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে চাপিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়েই এই কাজ করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাই এই দুটি শব্দ বাদ দেওয়া উচিত বলে আরএসএস মনে করে। গেরুয়া শিবিরের এই তথ্য খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আদালতও বলেছে, কোনও সংসদ সংবিধান সংশোধন করতেই পারে। কিন্তু সেই সংশোধনী সংবিধানের মূল কাঠামো অনুযায়ী হতে হবে। এই শব্দ দুটি সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী নয়। আসলে এই দুটি শব্দ যে সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার ও নির্দেশাত্মক নীতিগুলির পরিপূরক, সে কথাই বলতে চেয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। সংবিধানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে এক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে দেশের সব ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকে বোঝানো হয়েছে। কোনও বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা নয়। অতএব এই দুটি শব্দ যে সংবিধানের মূল সুর ও তাল কাটছে না, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আসলে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যাদের সেরকম কোনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকাই ছিল না সেই আরএসএস-বিজেপি সংবিধানকে মন থেকে কোনও দিনই মেনে নিতে পারেনি। বার বার সংবিধান প্রণেতাদের নিশানা করে চলেছে বলে কংগ্রেসের অভিযোগ। গেরুয়া বাহিনী মনুস্মৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন সংবিধান করতে চাইছে।
কিন্তু জনগণের স্বার্থে সংবিধানে থাকা সহজ সরল ভাবনাগুলো বুঝতে নারাজ আরএসএস-বিজেপি নেতারা। তাঁদের লক্ষ্য এক মনুবাদী সমাজ গঠন। যেখানে সাম্য প্রতিষ্ঠা, সব ধর্মের সমানাধিকারের ভাবনা অচল আধুলির মতো। গেরুয়া দর্শনে ভারত হবে একটি হিন্দুরাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে অন্য ভাবনা, অন্য দর্শন, ভিন্ন মতের জায়গা নেই। তারা চায় এমন এক প্রকৃত হিন্দুরাষ্ট্র যেখানে বহুত্ববাদের কোনও স্থান নেই। ভারতের সংবিধান এই মতাদর্শের বিরোধী। তাই সংবিধানের বদল চায় নাগপুর। সেজন্য তাদের সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন। ২০২৪-এর ভোটে ২৪০টি আসন মেলায় সেই পরিকল্পনা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। সংবিধান থেকে সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার প্রশ্নে দেশের সুপ্রিম কোর্টও বেসুরো গেয়েছে। কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। তাই লক্ষ্যে অবিচল থেকে বিতর্ক জিইয়ে রাখতে ফের পুরনো ধ্যানধারণাকে সামনে এনেছেন আরএসএস নেতা। এটা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, একটা ধর্মান্ধ পশ্চাদপদ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য থেকে তাঁরা পিছিয়ে যাচ্ছেন না! বরং সেই সুযোগ এলে তাঁরা রাতারাতি সব বদলে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু ভারত তো বিবিধের মাঝে মিলনের কথা বলে। নানা ভাষা, নানা মত, নানা ধর্ম, নানা পরিধানের দেশ। এখানে আছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। তাই তা রক্ষা করাই এখন ১৪২ কোটি দেশবাসীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।