সমৃদ্ধ দত্ত: বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে সফর করলে লক্ষ করা যায় বঙ্গবাসীর একাংশ তার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে। কারণ কী? কারণ এটা ভারতের সর্বোত্তম প্রিমিয়াম ট্রেন। এই ট্রেনে সফর করা একটা প্রিভিলেজড ক্লাসের মর্যাদা দেয় যেন। সম্পূর্ণ এয়ার কন্ডিশনড মেট্রো ট্রেন যখন চালু হয়েছিল কলকাতায়, সেটি ছিল অত্যন্ত আনন্দের এবং আলোচ্য বিষয়। মানুষকে দেখা যেত অধীর প্রতীক্ষায় কখন এসি ট্রেন আসবে। সেজন্য নন এসি ট্রেন ছেড়ে দেওয়া হতো। লোকাল ট্রেনে যাতায়াতকারী ডেলি প্যাসেঞ্জারদের কাছে আগামী দিনে ফের আসছে একটি প্রিমিয়াম সার্ভিস। এসি লোকাল ট্রেন। স্বাভাবিকভাবে দেখা যাবে সেটিকে ঘিরেও উত্তেজনা ও উৎসবের অনুভব। অথচ এসবই বাংলার অনেক আগে অন্য রাজ্যে চালু হয়ে গিয়েছে। ২০১২ সালের বাজেটে মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেন এসি করার ঘোষণা হয়। ২০১৭ সালে চালু হয় লোকাল এসি। বাংলায় এখনও অপেক্ষা। বাংলায় সবার আগে আটের দশকে এসে গিয়েছে মেট্রো রেল। অথচ এসি কামরা এসেছে সবার শেষে। তার আগে দেশের সর্বত্র এসি মেট্রোই চলে।
এই যে উন্নয়নের স্পর্শ, আধুনিকতার আগমন ভারতের পূর্বপ্রান্তে সর্বদাই দেরি করে আসা, এই প্রবণতা পূর্ব ভারতকে শুধু যে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছে তাই নয়, মানসিকভাবে অনেকটাই অনগ্রসর করে দিয়েছে। সেটাই বৃহৎ ক্ষতি। কেমন? বাঙালিকে বহুকাল ধরেই দেখা যায় ভিনরাজ্যে বেড়াতে গেলে সবথেকে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে রাস্তাঘাট নিয়ে। ভ্রমণের পর আড্ডায় বলা হয় কী দুর্দান্ত ঝকঝকে রাস্তাঘাট। এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যেতে কত কম সময় লাগে। এসবই হল, অনুন্নয়নের অভ্যাস। অর্থাৎ আধুনিক ও নতুন কিছু দেখলে মনে হয় এটা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
রান্নার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমেই রান্নাঘরে আসবে। তার বিল হবে। সিলিন্ডারের ঝামেলা নেই। এই প্রবণতা দিল্লি, মুম্বইয়ে বহু বছর আগে থেকে চলছে। অথচ কলকাতায় ঘরে ঘরে এখনও চালু হল না। সিএনজিতে অটো, বাস, গাড়ি চললে পরিবেশ দূষণ কমবে। কিন্তু কলকাতা তথা বাংলায় সেই দৃশ্য নেই। সিএনজি স্টেশনই নেই।
মুঘল আমলে পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় ভারতই ছিল অর্থনীতি ও শিল্পোন্নয়নের ভরকেন্দ্র। ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসন হাতে নেওয়ার পর থেকে ক্রমেই ২০০ বছরে দেখা গিয়েছে পূর্ব প্রান্তকে অনুন্নয়নের দিকে ঠেলে দেওয়া। পশ্চিমের উদয়।
বাংলাকে ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চনা এবং ঘৃণা করা হয়েছে। ১৯১১ সালে বাংলা থেকে রাজধানী সরিয়ে প্রথম সবথেকে বড় ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল। যেখান থেকে আর্থিক উন্নতির পতনের শুরু। ১৯৪৩ সালে জাপানের অগ্রগমনের জন্য গোটা ভারতকে বিপদে ফেলল না ব্রিটিশ। বেছে বেছে বাংলার ৩৫ লক্ষ মানুষকে অনাহারে মেরে ফেলল। স্বাধীনতার পর দেশভাগ নিয়ে সেমিনার, বিলাপ, হাহাকার, রাজনীতি গোটা দেশই করল। কিন্তু কোটি কোটি উদ্বাস্তু চাপিয়ে দিল বাংলার উপর। আর কেউ দায় নিল না। স্বাধীনতার পর থেকে সবথেকে আর্থিকভাবে উন্নতি ঘটেছে যে পশ্চিম ভারতের, তাদের উপর উদ্বাস্তু সমস্যার আঁচই লাগেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত সময়সীমায় পশ্চিমবঙ্গ সব প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে এবং চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও আর্থিক কাঠামোয় ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ রাজ্যের একজন হয়ে থাকতে পেরেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল ২০২৪ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ভারতের রাজ্যগুলির উন্নয়নের ক্রমঅগ্রগতির একটি সমীক্ষা। রিপোর্টের নাম, রিলেটিভ ইকনমিক পারফরম্যান্স অফ ইন্ডিয়ান স্টেটস। সেই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ১৯৬০-৬১ সালে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধিহার অর্থাৎ জিডিপি গ্রোথের নিরিখে প্রথম পাঁচ রাজ্য ছিল, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং বিহার। অর্থাৎ ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ আর্থিক উন্নতির হার যে পাঁচ রাজ্যের, তাদের মধ্যে দুটি পূর্ব ভারতের। পশ্চিমবঙ্গের স্থান ভারতে তৃতীয়। কত ছিল বাংলার জিডিপি গ্রোথ? ১০.৫ শতাংশ। ১৯৯০ সালে সেটা অর্ধেক হয়ে যায়। ৫.৬ শতাংশ।
১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের পার ক্যাপিটা ইনকাম কত ছিল? অর্থাৎ মাথা পিছু আয়ের হার। জাতীয় আয়ের ১২৭ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় আয়কে ছাপিয়ে আরও ২৭ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে সেই পার ক্যাপিটা ইনকাম হয়েছে জাতীয় আয়ের ৮৩ শতাংশ।
বিগত শতকের ছয়ের দশকের পর থেকে ‘সবুজ বিপ্লব’ কর্মসূচি দুই রাজ্যকে এক ধাক্কায় আর্থিক উন্নতির অনেকটাই শিখরের দিকে নিয়ে যায়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানাকে। কিন্তু যারা ছিল সবথেকে সম্ভাবনাময়, সেই বাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশের বিপুল অবনতি শুরু হয়ে যায়।
ঠিক এখানেই প্রশ্ন ওঠে যে, প্রধানমন্ত্রীর অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল এই রিপোর্ট প্রকাশ করার পাশাপাশি বাংলা অথবা বিহারের মতো পূর্ব প্রান্তের জন্য ঠিক কী কী কর্মসূচি বা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে? বিগত ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতাসীন হয়েছেন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হয়েছেন। অথচ একই প্রবণতা আজও চলছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের পূর্বপ্রান্ত থেকে ট্যাক্স ও খনিজ সম্পদের ভাগ নিয়ে গিয়ে সবথেকে বেশি উপহার দিচ্ছে পশ্চিম ভারতকে। দিল্লিতে চারটি এয়ারপোর্ট। আরও একটি তৈরি হচ্ছে গ্রেটার নয়ডায়। মুম্বইয়ে দুটি টার্মিনাল। বাংলায় ক’টা? পাটনায় এই বছর বাজেটে আরও একটি নতুন এয়ারপোর্টের ঘোষণা হয়েছে। কারণ কী? কারণ নীতীশকুমারের সমর্থনে কেন্দ্রীয় সরকার বেঁচে আছে। পাটনার তুলনায় কলকাতায় আর একটি এয়ারপোর্টের প্রয়োজন এটা কি কোনও তর্কের বিষয়? কই দেওয়া হল না তো?
ভারত সরকারের শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রী কে? পীযুষ গোয়েল। তিনি কোন রাজ্যের মানুষ? মহারাষ্ট্র। মুম্বইয়ের এমপি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোন রাজ্যের মানুষ? গুজরাত। ভারতের পশ্চিমের কোন দুই রাজ্যে সবথেকে বেশি বিদেশি শিল্প লগ্নি হয়? মহারাষ্ট্র ও গুজরাতে। সবথেকে নতুন শিল্পোৎপাদন ইউনিট কোথায় হয়? গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটকে। বিগত দুই বছরে সবথেকে বেশি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ন্যাশনাল হাইওয়ে কোথায় হয়েছে? উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, গুজরাত। ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন কোন কোন রাজ্যে? মহারাষ্ট্র ও গুজরাত। ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ কোথায় হয়? আমেদাবাদে। কোল্ড প্লে কনসার্ট কোন কোন শহরে হয়? মুম্বই ও আমেদাবাদ। চীনের প্রেসিডেন্ট দিল্লি ছাড়া আর কোন রাজ্যে গিয়ে বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে? গুজরাত। ডোনাল্ড ট্রাম্প কোথায় গিয়েছিলেন সভা করতে? আমেদাবাদ।
মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর ব্রিটিশ আমলে সবথেকে দুটি সেক্টর সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়েছে। কৃষি এবং টেক্সটাইল। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বাংলার সর্বনাশের সূত্রপাত হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এখনও সেই ইংরেজ সরকারের বাংলা বঞ্চনা প্রবণতা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। আলু, ফুল, ধান ইত্যাদি উৎপাদন ও রপ্তানিতে গ্রামবাংলা প্রথম স্থানে। অথচ বাংলায় কৃষিভিত্তিক কোনও শিল্পপ্রকল্প কি হল? হল না। বাংলাজুড়ে বস্ত্রশিল্পীদের জোয়ার। তাদের কাজে লাগিয়ে কোনও জাতীয় স্তরের বৃহৎ স্কিম অথবা শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। এমনকী গ্রামোন্নয়নের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। সম্প্রতি লোকসভায় পেশ হওয়া রিপোর্টে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পর্যন্ত কেন্দ্রকে বলেছে, গ্রামীণ বাংলার মানুষ চরম সঙ্কটে পড়েছে। বাংলার বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিন।
যে কোনও অত্যাধুনিক প্রকল্প, আধুনিকতম প্রয়াস, প্রযুক্তি, শিল্প, পরিষেবা সর্বদাই শুরু হয় দিল্লি অথবা পশ্চিম ভারতে। ভারতে প্রথমবার চালু হচ্ছে কোনও আধুনিক ব্যবস্থা এবং সেটি শুরু হচ্ছে কলকাতা থেকে এটা শেষবার কবে হয়েছে? মেট্রোরেল! তারপর থেকে ভারত অনেক এগিয়ে গিয়েছে। অন্যত্র যা আগে এসে গিয়েছে, বাংলায় সেটা পরে আসে। আর তাই বঙ্গবাসীর মধ্যে নতুন কিছু পেলে উৎসাহ উদ্দীপনার উন্মেষ হয়। আর সেই সময় পশ্চিম ভারত অথবা দিল্লি কিংবা কর্ণাটক হয়তো মুখ টিপে হাসে। কারণ, এসব তো তাদের কাছে পুরনো হয়ে গিয়েছে। এই যে বাংলা তথা পূর্ব ভারতকে গ্রাম্য এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা এই মনোভাবই সবথেকে বড় অভিশাপ বাঙালির। কর্মসংস্থান, শিল্পকাঠামো, বিদেশি লগ্নি, সাইক্লোন, বন্যা, পার ক্যাপিটা ইনকাম, জিডিপি ইত্যাদি নিয়ে বাংলার সমস্যাকে দেশের সমস্যা হিসেবে ভাবে না দিল্লি। উদ্বাস্তু সমস্যার সময় জওহরলাল নেহরুও ভাবেননি। আজকের নরেন্দ্র মোদিও ভাবেন না! অথচ বিজেপির কিন্তু বৃহৎ ভোটব্যাঙ্ক আছে বাংলায়।
বাংলা চিরকাল বঞ্চনার শিকার। প্রকৃতির রাজ্যে সূর্যোদয় হয় পূর্বে। কিন্তু ভারতের উন্নয়নের উদয়স্থান পশ্চিম প্রান্ত।