Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফের ভাষা আন্দোলনে বাঙালি

একুশে ফ্রেব্রুয়ারির মাহাত্ম্য সারা পৃথিবী জানে। আর সারা ভারত জানে, একুশে জুলাই দিনটির রাজনৈতিক তাৎপর্য। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ে নেমে একদল বঙ্গসন্তান রক্ত, এমনকী প্রাণও দিয়েছিলেন।

ফের ভাষা আন্দোলনে বাঙালি
  • ২৩ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

একুশে ফ্রেব্রুয়ারির মাহাত্ম্য সারা পৃথিবী জানে। আর সারা ভারত জানে, একুশে জুলাই দিনটির রাজনৈতিক তাৎপর্য। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ে নেমে একদল বঙ্গসন্তান রক্ত, এমনকী প্রাণও দিয়েছিলেন। মাতৃভাষার জন্য বিশ্ব ইতিহাসে এ এক অনন্যসাধারণ নজির। দেরিতে হলেও, ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০০ সাল থেকে তা বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশেষ মর্যাদায়। অন্যদিকে, বাংলায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক আপসহীন লড়াইয়ে নেমেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বাংলার বুকে ‘লালসন্ত্রাস’ কায়েম হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে গণতন্ত্রের পথেই শাসনযন্ত্র কব্জা করেছিল মার্কসবাদী কমিউনিস্টরা। কিন্তু অচিরেই বেরিয়ে পড়ে তাদের ধারালো দাঁত-নখ। জনগণের ‘শাসনব্যবস্থা’ রূপান্তরিত হয়েছিল হার্মাদ বাহিনীর ‘শোষণতন্ত্রে’। সেই জগদ্দল রাষ্ট্রযন্ত্রকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য ‘অগ্নিকন্যা’র ভরসা ছিল গণআন্দোলন। রকমারি ভোট জালিয়াতি রুখতে সব ভোটারের জন্য সচিত্র ভোটার কার্ড (এপিক)  চালু করার দাবিতে সরব হন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা। এই দাবি আদায়ের জন্য ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই রাইটার্স অভিযানের ডাক দেন তিনি। সেই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ার বস্তুত দোর্দণ্ডপ্রতাপ বসুর প্রশাসনের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে সেদিন নিরীহ গণতন্ত্রকামী জনতার উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেছিল পুলিস। যুবদের তাজা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল মহানগরের রাজপথ। বলা বাহুল্য, ওই ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হন। সেই থেকেই জননেত্রীর নেতৃত্বে ধর্মতলায় প্রতিটি ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলার সব প্রান্তের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ নেত্রীর এক ডাকে সেখানে বারবার সমবেত হন। বস্তুত বার্ষিক স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ারের আর এক নাম মহান একুশে।

Advertisement

কাকতালীয় হলেও ১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গে ভাষা আন্দোলনের শহিদ দিবস আর চারদশক বাদে, ১৯৯৩-এ কলকাতায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শহিদ দিবস ২১ তারিখেই! প্রথমটি ফ্রেব্রুয়ারির একুশে আর দ্বিতীয়টি জুলাইয়ের একুশে। গত পরশু, সোমবার পালিত হল ৩৩তম একুশে জুলাই কেন্দ্রিক শহিদ দিবস। প্রতিবার নেত্রী মহানগরে ঐতিহাসিক একুশের মঞ্চ থেকে বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা দেন। তা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকে সারা বাংলা এবং সারা দেশও। সোমবার মমতা বাংলা বিরোধীদের বিসর্জনের ডাক দিয়েছেন। ওইসঙ্গে ‘ভাষা আন্দোলন’ শুরু করারও আহ্বান জানান তিনি। বাংলা বিরোধীদের বিসর্জনের ডাক তিনি আগেও দিয়েছেন এবং রাজ্যবাসী তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে বিপুলভাবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, স্বাধীন ভারতে নতুন করে ভাষা আন্দোলনের ডাক দিতে হল কেন? বাংলা, সংবিধানের অষ্টম তফসিলভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্র বেছে বেছে বাঙালিদের সঙ্গে রকমারি বৈষম্য জারি রেখেছে। প্রথমত, একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাংলার গরিব মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনা চলছে। বিষয়টি সংসদে বারবার উত্থাপন করেও প্রতিকার মিলছে না। তার সঙ্গে শুরু হয়েছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালিদের উপর ধারাবাহিক অত্যাচার। ইতিমধ্যে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে বাংলাভাষী লোকজনকে ‘বাংলাদেশি’ দেগে দিয়ে অত্যাচার করার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। অত্যাচার করছে খোদ সেখানকার সরকারি প্রশাসনই! এমনকী, কয়েকজনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার মতো মারাত্মক অন্যায়ও ঘটে গিয়েছে। তবে এই অত্যাচারের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে অসমে। হিমন্ত বিশ্বশর্মার গেরুয়া সরকারের কারবার দেখে মনে হচ্ছে যে, গত শতকের ষাটের দশকের কুখ্যাত ‘বঙ্গাল খেদা’ ধুয়োর স্মৃতি ফেরাতে মরিয়া তারা। জবরদস্তি এনআরসি চালু করতে গিয়ে কয়েকবছর আগে লাখো লাখো বাঙালি নরনারীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছিল। বাঙালি খুঁজে খুঁজে ফের শুরু হয়েছে এনআরসি নোটিস পাঠানোর নির্মম খ্যাপামি। এমনকী, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং দাবি করেছেন, অসমে কেউ বাংলাকে মাতৃভাষা দাবি করলে তাঁর পক্ষে ‘বিদেশি’ (পড়ুন, বাংলাদেশি) চিহ্নিত করার কাজটি সহজ হয়ে যাবে। 
ভাবা যায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাগোষ্ঠীর জনগণ সম্পর্কে এই মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ কতটা অবমাননাকর! বাংলা এবং বাঙালি সম্পর্কে ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই জিনিস বরদাস্ত করতে পারতেন না। আমরা পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করছি, মোদি-শাহরা হিমন্তকে কোনোরূপ ভর্ৎসনা করলেন না! তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে যে, এর পিছনে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের নীরব সমর্থন রয়েছে? সেই সমস্যা অবশ্য গেরুয়া নীতির। কোনও সচেতন বাঙালি এই জিনিস মেনে নেবেন না। বাংলার নেত্রী যথার্থই জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলা ও বাঙালিকে অপমানের যাবতীয় হিসেব তিনি বুঝে নেবেন। শুরু হচ্ছে আন্দোলন। বাংলাভাষা রক্ষার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন! পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনা গিয়েছে, ‘সংসদেও বাংলায় কথা বলব আমরা। বাংলাভাষা আমাদের গর্ব।’ শাসক দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের এই বাঙালি অস্মিতাও আমাদের আশ্বস্ত করে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ