বাংলা ও ওড়িশার অন্যতম প্রধান উৎসব জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। আর রথের মেলায় বাঙালি বরাবর ভিড়ে ভেসে নিজে পথ হারিয়ে ফেলে,আবার তা খুঁজেও পায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্কিমী উপন্যাসের দশ-এগারো বছর বয়সের নায়িকা ‘রাধারাণী’ হুগলির মাহেশে রথ দেখতে ও সেইসঙ্গে কলা নয়, মালা বেচতে গিয়েছিল। শ্রাবণের প্রবল ধারায় ও আঁধারে সে পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। এমন সময় রুক্মিণীকুমার এসে তাকে তার গন্তব্য শ্রীরামপুরের পথ ধরিয়ে দেন। রথের রাত্রির সেই পথে তার সঙ্গে চলতে চলতেই রাধারাণীর জীবনপথের গন্তব্যও সেদিন মিলে গিয়েছিল রুক্মিণীকুমারের সঙ্গে। রাধারাণীর হাতেগাঁথা সব মালা কিনে তার অসুস্থ মায়ের জন্য পথ্য কেনার পথ তিনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন।
উনিশ শতকের বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বিশ ও বর্তমান শতকের আরেকজন চন্দ্রযুক্ত সাহিত্যিক হলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। এই বছর তাঁর নবতি অর্থাৎ নব্বই বছর পূর্তি চলছে। উপন্যাসের মতোই কথাসাহিত্যের আরেকটি সংরূপ হল ছোটগল্প। শীর্ষেন্দুর ‘আমাকে দেখুন’ গল্পটিতেও আমরা রথের মেলার হারানো সুরকে খুঁজে পাই। গল্পকার নিজেই অরিন্দম বসু নাম নিয়ে যেন গল্পের নায়ক হয়েছেন। রথের দিন ব্যাঙ্কের চাকরি সেরে বাড়ি ফেরার পথ ধরতেই বাড়ির বারান্দায় তিনি দেখতে পান চার বছরের ছেলে হাপুকে। সে বাবার সঙ্গে যাবে রথের মেলায়। সেখানে পাঁপড়ভাজা হাতে নাগরদোলায় চড়ে সে। তারপর বাবাকে আঁকড়ে ধরে মৃত্যুকূপের উঁচু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নীচে দেওয়াল বেয়ে ছুটে চলা মোটরসাইকেল দেখে। সার্কাসে গিয়ে দেখতে পায় আশ্চর্য সিঙ্গিং ডল, আট ফুট লম্বা লোককে। একসময় ছেলে যখন রকমারি দোকান দেখতে ব্যস্ত, বাবা তখন ফুটবলের চিন্তায় বিভোর হয়ে যান। হঠাৎ সংবিত ফিরে পেয়ে গল্পকথক দেখেন তাঁর নীল জামা পরা ছেলেটাকে পাওয়া যাচ্ছে না। না, তাকে আর পাওয়াও যায়নি! কিন্তু হাড়িকাঠে আটকানো বলির পশুর মতোই হয়তো সেদিন রথঘর্ঘরে চাপা পড়ে গিয়েছিল ছেলেহারা বাবার ছেলেকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুল আর্তি, আমাকে দেখুন।
বঙ্কিম-শীর্ষেন্দুর মাঝে আসি পল্লী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের কথায়। কুমুদকে রঞ্জিত করে যা অর্থাৎ সেই চাঁদ। তাঁর ‘উজানী’(১৯১০) কাব্যের প্রথম কবিতায় আমরা পাই এক খঞ্জ বুড়ি ‘চণ্ডালী’-কে। মেদিনীপুর, কটক হয়ে সে যাচ্ছে পুরীতে, রথে কাঙালের হরির শ্রীমুখ দেখতে। হামাগুড়ি দিয়ে এসেও গন্তব্যের পথ শেষ করতে পারেনি সে। এদিকে রথের দিনে রথ অচল হয়ে গিয়েছে। অগণিত ভক্ত এমনকী হাতিও তা টানতে পারছে না। এমন সময় প্রধান পাণ্ডা ধ্যানযোগে সেই রহস্য ভেদ করে পথ হতে খোঁড়া বুড়িকে কোলে তুলে আনলেন। তারপরে যা ঘটল তা এক কথায় অ-ভূতপূর্ব—‘অচল সে রথ চলিতে লাগিল/বুড়ি দিল যবে হাত,/ উল্লাসে সবে গাহিয়া উঠিল/ধন্য জগন্নাথ।’
কি? গল্পটা নিশ্চয়ই খুব চেনা চেনা লাগছে? বঙ্গসাহিত্যের চন্দ্রমাদের কথা ছেড়ে এবার রবির কথায় আসতেই হবে। কবি শক্তি চাটুজ্জের কথার রেশ ধরে বলাই যায় যে তিনি এসেই পড়েন। তেরো বছর পরে ‘রথযাত্রা’(১৯২৩) নাটকে তাঁর তৈরি রথের যাত্রাও এভাবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে উৎসর্গীকৃত ‘কালের যাত্রা’ বইতে নাটকটি স্থান পায় ‘রথের রশি’ নামে। শেষ পর্যন্ত তা চলেছিল নিম্নবর্গীয়দের হাতের পরশে। তবে এই নাটকের ভাব নাট্যকার পেয়েছিলেন তৎকালে নিজের ছাত্র পরবর্তীকালে অধ্যাপক-সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীর মাধ্যমে। প্রমথনাথ নাকি শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় কঙ্কালীতলার দেবীপুকুরের পাশে এক নিশ্চল রথ দেখেছিলেন। পথচলতি সাঁওতালি মানুষদের দিয়ে রথ টানিয়েই তাঁর মাথায় নাটকের ভাবটি আসে। নাটক লিখে দেখিয়েছিলেন গুরুদেবকে। তারপর আজও রয়ে গিয়েছে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। সেই রথনাট্য প্রকৃতপক্ষে কে রচনা করেছিলেন—গুরু না শিষ্য?
গুরুদেবের সোনার রথের কথা বলি, ‘কৃপণ’ কবিতায় আমরা যেটিকে দেখতে পাই। কবির ভিক্ষাপথে তাতে সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলেন অন্তর্যামী। তাঁকে দেখে চিনতেই পারেননি কবিভিক্ষু। তাঁর মতোই অন্তর্যামীকে না দেখার বেদনার কথা নিজের গানে লিখেছিলেন রবি ঠাকুরের ভাইপো, রবীন্দ্র সংগীতের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। গানে শিমূল,পলাশ, কোকিল সেই ব্যথাই ফুটিয়ে তুলেছে—‘সোনার রথে অমরা হতে কে এলো গো, কে এল’। বাংলা সাহিত্যে এই সোনার রথ কাকাভাইপোর হাতেই হয়তো গড়ে উঠেছিল। আবার পথ, রথ, মূর্তি এইসব আড়ম্বরের সারবত্তাহীনতার প্রমাণরূপে বিধাতার শুধুমাত্র মুচকি হাসির কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম’ শীর্ষক কবিতা ‘কণিকা’য়।
সেই লোকারণ্যের চরিত্র সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন ‘হুতোম পেঁচা’ কালীপ্রসন্ন সিংহ, নিজের ‘নকশা’-র দ্বিতীয় ভাগের প্রথম নিবন্ধে। মহানগরীর চিৎপুর রোডে বার্নিশ করা জুতো, সেপাইপেড়ে ঢাকাই ধুতি, কোমরে রুমাল পরে বড়ো ঘরের ছোটো ছোটো ছেলেরা চাকরবাকরের হাত ধরে রথ দেখছে। বিক্রি হচ্ছে মাটির জগন্নাথ, পাখা, শোলার পাখি, কাঁঠাল। এখনকার মতো তখনও অনেক শিশু ভোঁ-ও-পোঁ-ও শব্দ করছে। ইদানীন্তন প্লাস্টিকের হুইসেলের জায়গা তখন নিয়েছিল তালপাতার ভেঁপু। ঘণ্টা, হরিবোল, খোল, করতাল, বৈষ্ণবদের কবিগানওয়ালা নেড়িদের গান, বৈরাগীদের কীর্তন, শখের সংকীর্তনের দল কেউ বাকি ছিল না। তবে সবথেকে বেশি মন টেনেছিল এক মাতালের গান। রথকে মা বলে ডেকে, সর্বাঙ্গে পেরেকমারা চাকা ঘুরিয়ে এগিয়ে চলা রথের চূড়ায় তিনি লক্ষ করেছিলেন
মুকপোড়া অর্থাৎ মুখপোড়া হনুমানকে। তারপরে অনেক রথ চলে গেলে মাথায় গ্যাসবাতি জ্বালানো মই নিয়ে
রাস্তায় নেমে পড়ে গ্যাসজ্বালা মুটেরা। তখনও পুলিসের পাস বা অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রথের যাত্রা সাঙ্গ করতে হতো।
অনেক সময় পুজো বা পরবগুলি কোন দিন পালন করা হবে, একদিন না দুই দিন ছুটি থাকবে তা নিয়ে মতান্তর বাঁধে। শরৎচন্দ্র পণ্ডিত ১৯২৩ সালে স্বসম্পাদিত ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন যে দুই মতের পঞ্জিকার টানাটানিতে ‘জগন্নাথ ঠাকুর মহা মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলেন’। যে পঞ্জিকাগোষ্ঠী সেই বছর ৩১ আষাঢ় সোমবার রথের দিন ধার্য করেছিল চাকুরিজীবীরা তাদের সমর্থন করেছিলেন। এর ফলে তারা রবি সোম দুই দিন ছুটি পেয়ে যান। দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘দুইদিন ছুটী দেশে গিয়ে বাবুদের রথ দেখাও হ’য়েছে, কলা বেচাও চ’লেছে।’
জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ। সকল জগদ্বাসীর প্রভু। এই মাসের প্রথমে ও শেষে কুড়ি দিনের ব্যবধানে রয়েছে কুরবানির ঈদ ও রথযাত্রা। এ মাসের মতোই দুই উৎসবকে এক কাব্যিক সূত্রে বেঁধেছিলেন বিষ্ণু দে। বিষ্ণু মানেও জগন্নাথ। কবিতায় তিনি কিন্তু ঈদগা-মন্দিরে, দেউল-মসজিদে অনেক ঘুরেও অন্তর্যামীর দেখা পাননি। তাই ‘রথযাত্রা ঈদমুবারকে’-র শেষ ছত্রে তিনি উপলব্ধি করেছেন ‘শূন্য রথযাত্রার ঈদ্, শূন্য যেন বিবাহ-বাসর।।’
প্রাথমিক অবস্থান থেকে যাত্রার সূচনা হয়। গন্তব্যে পৌঁছে তা আবার প্রারম্ভিক বিন্দুতে ফিরে আসে। পদার্থবিদ্যার ভাষায় এক্ষেত্রে সরণশুন্য হলেও যাত্রা কিন্তু সম্পূর্ণ হয়। ঠিক তেমনি রথযাত্রা সমাপন হয় উল্টোরথ পার্বণের মাধ্যমে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নামে একটি গল্প রয়েছে। যেখানে সত্য চক্রবর্তী ছোটবেলায় ছেলেদের মারধরসহ কড়া শাসনে রাখতেন। বৃদ্ধ হয়ে গেলে সেই তিনিই উল্টে ছেলেদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন। উল্টো চিত্র বলতে এ হেন নামকরণ করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি বিভূতিবাবু যেন আমাদের ছেলেবেলার একটি ভুলকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমরা অনেকেই ভাবতাম উল্টোরথ মানে রথকে উল্টো করে নিয়ে আসা। আসলে তা উল্টো বা বিপরীত পথে ফেরত নিয়ে আসাকেই বোঝায়।
বেশ কয়েকদিনের ব্যবধানে রথ হল মূলত দুই দিনের উৎসব। কোনও কারণে সোজারথের আনন্দ ছুট হয়ে গেলে ‘উল্টোরথ’ তো আছেই। সেজন্যই হয়তো নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওপাড়ার ময়রাবুড়োর তেরো চুড়োর রথের মেলায় অন্যান্যদের মতো হলুদমাখা গায়ে যেতে না পেরে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ করেননি। উল্টে লিখেছিলেন—‘আমরা পয়সা কোথায় পাবো,/আমরা উলটো রথে যাবো।’
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক