ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: বারাণসীর দুর্গাপুজো বললে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। পুজোর ছুটিতে বেনারসে নিছক বেড়াতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত চোরাই কারবারি মগনলাল মেঘরাজের পর্দাফাঁস করেছিলেন ফেলুদা। সত্যজিৎ রায়ের সেই ছবিতে দেখানো হয়েছিল বনেদি ঘোষাল বাড়ির পুজো। বিজয়া-দশমীতে বেঙ্গলি ক্লাবের অনুষ্ঠান আর বিশ্বশ্রীর পেশি প্রদর্শন। আর তার সঙ্গে বারাণসীর অলিগলি থেকে শুরু করে বাঙালি টোলা। বিশ্বনাথ ধামে দুর্গা মায়ের আরাধনার চিত্র ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ আমরা দেখেছি। সেখানে ঘোষাল বাড়ির মতো বাস্তবে এখনও একাধিক বনেদি বাড়িতে হয় দুর্গাপুজো।
প্রায় ২০০ বছর জঙ্গমবাড়ি এলাকায় রয়েছে রায়চৌধুরী পরিবার। সেই বাড়িরই সদস্য উত্তম রায়চৌধুরী জানান, প্রথম পুজো শুরু হয়েছিল মিত্রবাড়িতে। চক এলাকার পাক্কি মহালে মিত্র পরিবারে ৩০০ বছর আগে শুরু হয় দুর্গাপুজো। এখন সে পুজোর বহর অনেকটাই বড়। মিত্রবাড়ির দেখানো পথে আরও অনেক বাঙালি বাড়িতেই দুর্গা আরাধনা শুরু হয়। মুখোপাধ্যায় পরিবারের পুরনো দুর্গাবাড়ির পুজো প্রায় ২৫০ বছর পুরনো। জঙ্গমবাড়িতে রায়চৌধুরীদের বাড়িতেও ৮৫ বছর আগে শুরু হয়েছিল দেবীর আরাধনা। তবে নানা কারণে ৩৩ বছর সেই পুজো বন্ধ রয়েছে। মিত্রবাড়ি ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের পুজো চলে ন’দিন। এই দুই বাড়িতে প্রায় তিনশো বছর আগে প্রথম যে দুর্গাপ্রতিমার পুজো শুরু হয়েছিল, তার বিসর্জন হয়নি। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও মন্দিরের বিগ্রহের মতোই আরাধিত হচ্ছেন মা দুর্গা। বারাণসীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছেন বাঙালিরা। সেই সূত্রে বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সর্বজনীন দুর্গোৎসব। সরকারি হিসেবে কাশী ও বারাণসী মিলিয়ে বর্তমানে অন্তত সাড়ে চারশো পুজো হয়। এর মধ্যে নবরাত্রির আঙ্গিকে ন’দিন পুজো হয় ৪০-৫০ ক্লাবে। দেড়শো বছরের পুরনো পুজোর মধ্যে রয়েছে শ্রী স্পোর্টিং ক্লাব, প্রভাত তরুণ সঙ্ঘ, সাউথ ক্লাব, গোল্ডেন ক্লাব সহ আরও অন্তত দশ-বারোটি পুজো।
দুর্গাপুজো প্রসঙ্গে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কথা না বললেই নয়। ৯৭ বছরের প্রাচীন এই পুজো প্রথম শুরু করেছিলেন স্বামী প্রণবানন্দ। সোনাপুরায় কোচবিহারের রাজার বাড়ির একটি জায়গায় দেবীর আরাধনা করা হয়েছিল। পরে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের আশ্রমে পুজো স্থানান্তরিত হয়। সঙ্ঘের তরফে স্বামী উৎপল মহারাজ বলেন, সঙ্ঘের মূল দুর্গাপুজো হয় বারাণসীতেই। পঞ্চমীর দিন বাঙালিটোলা থেকে অভিনব শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমাকে আশ্রমে আনা হয়। সাধু-সন্ন্যাসীরা ঘোড়া, হাতি, উটে চেপে সেই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে বাঙালিদের পাশাপাশি অবাঙালিরাও আশ্রমে ভিড় জমান।
পুজোর দিনগুলিতে কলকাতার মতোই প্রতিমা দেখার ভিড় উপচে পড়ে সোনাপুরা, রামাপুরা, পাণ্ডে হাভেলি, জঙ্গমবাড়ি, বাঁশফটক, চকের মতো এলাকায়। প্রতিমা দেখার পাশাপাশি মণ্ডপের নানা কারুকাজ ও পটচিত্র দেখার আগ্রহই ভিড়ের অন্যতম কারণ। আনন্দের মরশুমে বাংলা থেকে বারাণসীর একটাই সুর—‘জয় মা দুর্গা’। -ফাইল চিত্র