Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালির পুজো, বাঙালির ভোট

পিতৃপক্ষের শেষ দেবীপক্ষের শুরু। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠে আধো-অন্ধকারে আজ প্রভাতে বাঙালির অদ্ভুত জাগরণ এক। জন্ম ইস্তক দেখে আসছি এই জাদু! যার অনেক আছে, আর যার কিছুই নেই এই আনন্দযজ্ঞে সবাই কেমন একই বিন্দুতে!

বাঙালির পুজো, বাঙালির ভোট
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: পিতৃপক্ষের শেষ দেবীপক্ষের শুরু। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠে আধো-অন্ধকারে আজ প্রভাতে বাঙালির অদ্ভুত জাগরণ এক। জন্ম ইস্তক দেখে আসছি এই জাদু! যার অনেক আছে, আর যার কিছুই নেই এই আনন্দযজ্ঞে সবাই কেমন একই বিন্দুতে! এই আত্মউন্মোচন আমরা- ওরার দ্বন্দ্বকে ভুলিয়ে দেয় রাজনীতিকে সাময়িক ছুটিতে পাঠিয়ে। আকাশবাণীতে মহিষাসুরমর্দিনী প্রথম সম্প্রচারিত হয় আজ থেকে ৯৪ বছর আগে। সালটা ছিল ১৯৩১। সেই অর্থে বীরেন্দ্রকৃষ্ণর উমা আবাহনের শতবর্ষের আর ৬ বছর বাকি। এত চ্যানেল, সরকারি বেসরকারি রেডিও স্টেশন, নানা কিসিমের গণমাধ্যমের ইঁদুর দৌড়, প্রতিভা অন্বেষণের ভিড়ে আজও অমলিন বাঙালি সত্তার উচ্চকিত স্টেটমেন্ট! সেই জলদগম্ভীর কণ্ঠ, সুরের মূর্ছনার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। দেশ বিদেশের সীমানা পেরিয়ে সুউচ্চ অট্টালিকা থেকে গ্রামের মেঠো পথের আঙিনায় শিউলির গন্ধ মেখে ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশটা কেমন মুহূর্তে বদলে যায়। আলোর বেণুর ছটায় উদ্ভাসিত চারদিক। সেই পুরনো চকমেলান উঠানের যৌথ সংসার আজ বিরল। সুউচ্চ হাইরাইজ প্রাসাদের ছোট্ট দু-কামরার খুপরি যদি ইদানীং আড়াই সদস্যের বাঙালি পরিবারের ঠিকানা হয়, সেখানেও কেমন যেন আনন্দ ছোঁয়ায় অদ্ভুত রেশ ছড়িয়ে পড়ে নিমেষে। বাবা-কাকার একত্রিত পরিবার গিয়ে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির অভিজাত বস্তি কিংবা ভেঙে পড়া বনেদি কড়ি-বরগায় সেই অভিঘাতের বিশেষ তারতম্য হয় না। বদল হয় না সব হারানো মলিন সংসারেও। 

Advertisement

পুজোয় বদলে যাওয়া এই রং যেন তাঁর ৮ রিখটার স্কেলের চণ্ডীপাঠেরই আফটার শক। সেই বিচারে কোনওদিন ভোটে না দাঁড়িয়েও মন্ত্রীসান্ত্রি না-হয়েও শুধুমাত্র ওই একটা দুর্দান্ত বাঙালিয়ানার সম্পদ উপহার দেওয়ার দৌলতে শতবর্ষ পেরিয়েও তিনি আর্ন্তজাতিক। অমরও বটে। যতদিন বাঙালি থাকবে, দেবীপক্ষ ফিরে ফিরে আসবে এবং তাঁর অস্মিতার অনন্ত প্রতীক হয়েই সংবৎসর মহালয়ার পুণ্য প্রভাতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নামটাও উচ্চারিত হবে একই নিঃশ্বাসে। এখানেই হেরে যায় রাজনীতিক, মন্ত্রীসান্ত্রি, তথাকথিত ক্ষমতাধররা। ক্ষমতা হাতছাড়া হলেই আর কাউকে জনগণ মনে রাখে না। বাম আমলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ক’জন সান্ত্রিকে আজও মানুষ স্মরণ করে? আসলে ভোট আসে বিভেদ ঘটাতে। দূরত্ব বাড়াতে। পুজো আসে দূরে চলে যাওয়া দুই বন্ধু ও পরিবারের মিলন ঘটাতে। এখানেই পুজোর কাছে হেরে যায় রাজনীতি। মহালয়া থেকে দীপাবলি পর্যন্ত কেউ মনে রাখে না তৃণমূলের ৪৯ শতাংশ ভোট আর গেরুয়াদের ৩৮ শতাংশ জনসমর্থনের কথা,  কিংবা অবশিষ্ট ৩ শতাংশ ক্ষীণবল বামেদের। বছরকার দিনে সবাই এক-আমরা, অখণ্ড বাঙালি পরিবারের অংশ! দলাদলিই এখানে সবচেয়ে বড় অনুপ্রবেশকারী!
১৯৩১ সালে বাঙালি সমাজজীবনের সামনের সারিতে যাঁরা ছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই আজ বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু ৯৪ বছর পেরিয়েও ফি বছর মহালয়ার প্রভাতে আকাশ মেঘলাই হোক কিংবা রৌদ্রোজ্জ্বল, ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ুক না-হয় মুষলধারে বর্ষণে চারদিক ভেসে যাক তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে ভর করেই বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে প্রবেশ। স্বজন ছেড়ে দূরদূরান্তে কাজের টানে ব্যস্ত বাঙালির ঘরে ফেরার আকুতিও জাগে ওই কণ্ঠের দীপ্তিতেই। সবার চোখেমুখে ঘরে ফেরার গান। অর্থনীতি থেকে সমাজ সংস্কার সব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এই চারটে দিন তার অঘোষিত প্রবেশ নিষেধ! ওই চারটে দিন। পুরনো পথ, ফেলে আসা বহু মুক্তোর মতো স্মৃতি, ভাইবোনের হাত ফসকে পুজোর প্যান্ডেলে হারিয়ে যাওয়া, চকিতে নতুন কাউকে খুঁজে পাওয়া, চোখ মুছে বাবা-মাকে মনে পড়া। পুরনো উঠোনে একটা সন্দেশ ভাইবোনের ভাগ করে খাওয়া, খুনশুটি— সব মনে পড়ে যায় দশক পেরিয়েও। হারিয়ে গিয়েছে অনেক কিছুই, তবু বারো আনা গিয়েও যেটুকু আছে তার জুড়ি উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে আর বড় একটা মিলবে না। এই পরম্পরাটাই বাঙালির অহংকার ও গৌরব। অস্মিতাও বটে। কাশফুলের গন্ধ, মেঘ সরিয়ে রোদ্দুরের খেলা। ঝড় বৃষ্টির দুশো দুর্যোগ, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা কর্পূরের মতো কখন উধাও। উৎসব গায়ে মেখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শপথ!
হিন্দুধর্মের বৃহত্তম এই ঐতিহ্য এবং পরম্পরা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সনাতনীদের জন্মেরও আগের। একালের প্রবক্তারা যতই গণ্ডিটাকে ছোট করে ভোট জয়ের সীমাবদ্ধ রাস্তায় আটকে দেওয়ার চেষ্টা করুন, বাঙালির এই আন্তর্জাতিকতাবাদ কোনও একটি রাজনৈতিক দলের হাতে বন্দি হয়ে থাকতে পারে না। এখানে ধর্ম ও উৎসব হাত ধরাধরি করে চলে। সংখ্যালঘুরাও শামিল হয় সগর্বে। ক্ষুদ্র স্বার্থে আরোপিত কোনও বিভেদ মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি করতে পারবে না। দেবী এখানে মন্দিরে আটকে নেই, নেমে এসেছেন রাজপথে। হরেক থিম থেকে আটপৌরে মণ্ডপের ঘেরাটোপে মানুষের ঢলে ধনী দরিদ্র সব একাকার। শুধু বাংলা নয় দিল্লি, মুম্বই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু কোথায় নেই এর রেশ! তাই ইউনেস্কো বাঙালির দুর্গাপুজোকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের স্বীকৃতি দিয়েছে। এবং বলতেই হবে বাঙালির দুর্গাপুজোর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্ভব হয়েছে এক বাঙালি নারীর জন্যই। ভোট থাকুক আর না থাকুক মহালয়ার আগের দিন থেকেই উদ্বোধনে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। কিন্তু বিরোধীরা যাদের গতবারও তেমন উৎসাহ ছিল না, আসন্ন ভোট দখলের দৌড়ে তারাও পাল্লা দিচ্ছে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে! সবার ভালো হোক, কিন্তু বাঙালি অস্মিতা যেন অটুট থাকুক। রাজনীতি যেন সমাজ ও তার মূল্যবোধকে ঘায়েল করতে না পারে, নজর থাকুক সবার।
বাঙালির এই অনাবিল আনন্দে যুগ যুগ ধরে যাঁরা শামিল তাঁদের যদি বাইরের কেউ হিন্দুত্বের পাঠ দিতে আসে তাহলে ব্যাপারটা ব্যুমেরাং হতে বাধ্য। কারণ আরএসএসের জন্ম ১৯২৫ সালে। আর দুর্গাপুজোর ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। বেলুড় মঠে আধুনিক হিন্দুধর্মের প্রবক্তা স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম পুজো করেছিলেন ১৯০১ সালে। দ্বিতীয় পুজো আর তাঁর দেখা হয়নি। ডায়াবেটিসের ধাক্কায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্রুত বিকল হয়ে যায়। পরের বছরেই ৪ জুলাই দেহ রাখেন তিনি। স্বামীজি না থাকলেও সেই পরম্পরা আজও চলছে বেলুড় মঠে, বাংলার অলিতে গলিতে। তথাকথিত কোনও সনাতনী ছোঁয়া ছাড়াই। বাঙালির এই আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার পথে সনাতনীরা বাদ সাধবেন না দোহাই। ভোট ফুরোলেই কর্পূরের মতো উবেও যাবেন না দয়া করে। 
দুর্গাপুজোর বোধন থেকে দীপাবলির জমজমাট ধামাকার রাত দিয়েই এবার উৎসবের শেষ নয়, নভেম্বরেই আর এক পার্বণ এবার অপেক্ষা করছে। তার নাম এসআইআর। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত কিংবা গুপ্তপ্রেস পাঁজি পঞ্জিকা নয়, এই পার্বণ পরিচালিত হবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে এবং তত্ত্বাবধানে। ভোটার তালিকায় আপনার নাম থাকবে কি না, তার পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশন কোমর বাঁধছে বাঁধুক। ভোটার লিস্ট শুদ্ধ হোক সবাই চায়। কিন্তু তাই বলে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কথায় এবং স্বার্থরক্ষায় যদি পুরো প্রক্রিয়াটি চালিত হয়, সেক্ষেত্রে জোরালো প্রতিবাদ হবেই। যেমন রাজধানী দিল্লির পুজোমণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর ছবি রাখার ফতোয়া পুজো কমিটিগুলি মেনে নেয়নি, বিদ্রোহ করেছে। তেমনি এই বাংলাতেও বাঙালির উৎসবকে রাজনৈতিক জমি দখলের  হাতিয়ার করা হলে প্রতিরোধ অনিবার্য।
নির্মলা সীতারামন দেশের অর্থমন্ত্রী। অত্যন্ত বিদগ্ধ পণ্ডিত বলেই জানি। তিনিও বলছেন, দুর্গাপুজোকে মাথায় রেখেই নাকি জিএসটি কমানো হয়েছে। খুব ভালো কথা। কিন্তু মহামান্য নির্মলাদেবীকে প্রশ্ন বাংলায় ভোট আসন্ন বলেই কি দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাচ্ছেন! গতবারও তো জিএসটি কমাতে পারতেন। কোভিডের পরপরই সারা দেশ থেকে এই দাবি উঠেছিল। এবারই কেন? পুজোকে ব্যবহার করেই জনসংযোগ এবং তা থেকেই বাংলা, বিহার, তামিলনাড়ু, কেরলে ইলেকশন মেশিনারির বিনির্মাণ। এতদ্দ্বারা পুজোটাকেই অসম্মান করলেন না কি? ভোটের বছর হলেই পুজোয় হাওয়াই জাহাজে চেপে দিল্লি থেকে এসে নেতাদের উদ্বোধনের ধুম পড়ে যায় কেন? হিন্দুরা কি এতই ঠুনকো! শুধু ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হবে? নাকি গেরুয়া লাল নীল সবুজ হলুদ সব মিলে এক অদ্ভুত ঐক্যের রং তৈরি হবে? যেখানে কোনও বিশেষ একটি মত আর পথে সে বাঁধা থাকবে না। তাই শ্রীরামকৃষ্ণ দেড়শো বছর আগে সব সনাতনীকে হারিয়ে ধর্মের বহুত্ববাদকে তুলে ধরেছেন একেবারে সহজ সরল ভাষায়—‘যত মত তত পথ!’ সর্বজনীন হিন্দুত্বের এর চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনোগ্রাহী আর কোনও ব্যাখ্যা হতে পারে?
আগমন গজে, প্রত্যাবর্তন দোলায়। ফল মহামারী মড়ক। এসবই শাস্ত্রের কথা। কিন্তু আগামী ছ’মাসে বাঙালির ভবিষ্যতের বিনির্মাণ যেন ধ্বংসাত্মক না হয়। গণতন্ত্রে ভোট আসবে যাবে। ক্ষমতা দখলের নিরন্তর খেলায় বাঙালিকে তাঁর সঠিক পথ বেছে নিতে হবে। ভেদাভেদ, হাঙ্গামা, বিভাজন কখনও যেন আমাদের দুর্বল করতে না পারে। দেশভাগ মন্বন্তর বন্যা খরা যাবতীয় দুর্যোগ এবং ব্যক্তিগত রেষারেষির ক্ষয়কে অতিক্রম করে বাঙালির এই মনটা বেঁচে থাকুক। এর বিশালতা কোনও ভিনদেশির খুঁটে বাঁধা থাকবে না কোনওদিন। চেতলা, সুরুচি, বাগবাজার, শ্রীভূমি পেরিয়ে বাংলার গ্রামেগঞ্জে এই অমূল্য আনন্দরতন যেমন ছড়িয়ে পড়ছে, তেমনি বাদ নেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার বিদেশেও। লন্ডন প্যারিস নিউ ইয়র্কে ছড়িয়ে পড়া এই বিচিত্রগামী বাঙালিকে ক্ষুদ্র ভোটবাক্সে বাঁধবে কোন সংকীর্ণ রাজনৈতিক দল! সনাতনী নয়, বিভেদকামীও নয় বাঙালির সত্তা বেঁচে থাকবে সর্বজনীন উৎসবে। অশুভকে হারিয়ে সবাইকে মেলানোর ভাবনায়।
রক্তবীজবধে দেবী চণ্ডমুণ্ড বিনাশিনী! রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ