Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালি ইস্যু বঙ্গবিজেপির সর্বনাশের কারণ

যখন আর জি করের মর্মান্তিক ও পৈশাচিক এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন মনে করা হচ্ছিল, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রধান ইস্যু সম্ভবত ওটাই হতে চলেছে।

বাঙালি ইস্যু বঙ্গবিজেপির সর্বনাশের কারণ
  • ১ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: যখন আর জি করের মর্মান্তিক ও পৈশাচিক এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, তখন মনে করা হচ্ছিল, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রধান ইস্যু সম্ভবত ওটাই হতে চলেছে। আরবান মিডল ক্লাস পথে নেমে এসেছিল। এমনকী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির নেতানেত্রীরা চারদিনের মধ্যেই ‘দফা এক দাবি এক’ মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। নগরকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্ব ও সমাজের মধ্যে প্রবল এক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল যে, এবার বুঝি বঙ্গীয় সরকারের শেষের শুরু। 

Advertisement

যখন এক ধাক্কায় ২৬ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে যায়, তৎক্ষণাৎ ধারণা পোষণ করা হয় যে, এবার আর বঙ্গীয় সরকারের নিস্তার নেই। গোটা রাজ্যের ছাত্র ও কর্মপ্রার্থীদের মধ্যে সম্ভবত প্রবল এক বীতরাগ তৈরি হয়েছে। সুতরাং তার প্রভাব পড়তে চলেছে পরবর্তী নির্বাচনে। কিন্তু তারপরও একের পর এক নির্বাচন হয়ে চলেছে, যেগুলিতে কোনওপ্রকার প্রভাবই পড়তে দেখা যায়নি। 
আজ ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গীয় জনসমাজের প্রাত্যহিক ভাবনা বিশ্লেষণ করা হলে, অনুধাবন করা যায় যে, সেইসব ইস্যুর তীব্রতা আর অবশিষ্ট নেই। রাগও যেন স্তিমিত হয়ে এসেছে। 
তবু রাজনৈতিক দলগুলির কাজ হল, তারা সর্বদাই প্রতিপক্ষকে টার্গেট করবে, আক্রমণ করবে, কোণঠাসা করবে এবং নিজের যে লক্ষ্য, সেই জয়কে হাসিল করার জন্য সর্বপ্রকারভাবে চেষ্টা করবে। বঙ্গবিজেপি সীমিত ক্ষমতায় সেটাই করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সমস্যা হল, বঙ্গবিজেপির এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিপক্ষ নরেন্দ্র মোদি। দিল্লির বিজেপি কর্তারা যেন পণ করেছেন যে, কিছুতেই বঙ্গবিজেপিকে সফল হতে দেওয়া যাবে না। সফল হওয়ার মতো ক্ষমতা অথবা যোগ্যতাও এখনও বঙ্গবিজেপি অর্জন করে উঠতে পারেনি, সেটাও সত্য। কিন্তু তাদের সমস্যা হল, দিল্লি তাদের মহাবিপদে ফেলছে বারংবার। 
বঙ্গবিজেপির কাছে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য, রাজ্যের দুর্নীতির অভিযোগ, আর জি কর কাণ্ড, নারীদের নিরাপত্তা, শিক্ষকদের চাকরি বাতিল এবং সর্বোপরি হিন্দু মুসলমান তো ছিলই। এসব নিয়ে বঙ্গবিজেপি নিজেদের মতো করেই আগুপিছু করছিল। একটু নবান্ন অভিযান। একদিন আইন অমান্য। কোনওদিন রামনবমী। এরকমভাবেই চলছে। সেইসব অভিযানে ঘুরেফিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুই স্লোগানে আসছে, কোনও নেতা একটু বেশি ধর্মকে প্রচারের সামনের সারিতে জায়গা করে দিচ্ছেন। কোনও নেতা আবার ছদ্মনিরপেক্ষতার একটি আড়াল রেখে বাঙালি অস্মিতার কথা বলছেন। 
 বঙ্গবিজেপির সঙ্গে হুবহু সাদৃশ্য হল অতীতের বাম আমলের প্রদেশ কংগ্রেসের। সেই কংগ্রেসের নেতাদের মধ্যে ছিল নানাবিধ গোষ্ঠী। সোমেন মিত্র, আবু বরকত গনি খান চৌধুরী, প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সুব্রত মুখোপাধ্যায়দের ছিল নিজেদের মতো করে একটি করে অনুগামী গোষ্ঠী। তাঁদের প্রাত্যহিক দরবারও ছিল আলাদা আলাদা। আজকের বিজেপির মধ্যেও তাই। একাধিক গোষ্ঠী। একাধিক নেতা। বিজেপির মধ্যে আবার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের নতুন সংযোজন আদি ও নব্য বিজেপি। তৃণমূল থেকে আগত বিজেপি নাকি অতীতের দুর্বল সময় থেকেই দলের সঙ্গে থাকা আদি বিজেপি? কারা দলের বর্তমান চালিকাশক্তি? এই হল নয়া সঙ্কট। 
কিন্তু অতীতের প্রদেশ কংগ্রেস এবং আজকের বিজেপির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল, একটি চরিত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রদেশ কংগ্রেসের বহু গোষ্ঠীর প্রথম সারির নেতাদের মধ্যেও একক একটি অস্তিত্ব ক্রমেই স্থান করে নিয়ে কার্যত বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ ও সেনাপতি হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বর্তমান বিজেপির মূল সমস্যা হল, দলে নেতানেত্রী বহু থাকলেও একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেই। আর তাই বিজেপি জয়ী হলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, এই স্পষ্ট ধারণাও নেই তাদের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে। অথচ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করতে হলে সমমানের না হোক, একজন এমন চ্যালেঞ্জারের প্রয়োজন যাঁকে দেখে অন্তত সাধারণ মানুষ ভাবতে পারে যে, হ্যাঁ, ইনি পারলেও পারতে পারেন। অথবা একবার এঁকে সুযোগ দেওয়া যাক। সেরকম কোনও চরিত্র বঙ্গীয় রাজনীতিতে নেই।
এতদসত্ত্বেও একটি অন্য যুক্তি রয়েছে। সেটি হল, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ যে রাজনীতির আগমন ঘটিয়েছেন, সেখানে রাজ্যে রাজ্যে তাঁরা কোনও সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রীর মুখ প্রমোট করছেন না। প্রতিটি রাজ্যেই  দল এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখিয়ে ভোট হচ্ছে। তারপর জয়ী হলে সঙ্ঘের অনুমতিক্রমে একজন তরুণ মুখ বেছে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা একের পর এক রাজ্যে দৃশ্যমান। অতএব বাংলাতেও বিজেপি বলতে পারে, সেরকমই স্ট্র্যাটেজি। সুবিধাও আছে। বাংলায় বিজেপির নেতানেত্রী না থাকলেও ভোটার আছে। কিন্তু সমস্যা হল, বঙ্গবিজেপিকে পথ দেখাবে কে? দিশানির্দেশ করবে কে? তাদের সবথেকে বড় প্রতিবন্ধকতাই হল দিল্লির বিজেপি। মোদি অ্যান্ড কোম্পানি সম্পূর্ণ নিশ্চিত করে দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালে কারা জয়ী হবে পুনরায়। সেটা না হলে এরকম ভোটের আগের বছরে এভাবে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযানে কেউ নামে? এভাবে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন নামক ভোটার তাড়াও অভিযানে কেউ সায় দায়? কেন্দ্রীয় সরকারের সায় না থাকলে কখনও নির্বাচন কমিশন এই কর্মসূচি নিতে পারে? দিল্লির বিজেপি কর্তাদের অনুমোদন ছাড়া বিজেপি শাসিত রাজ্যে রাজ্যে এভাবে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালিদের চিহ্নিত করে পুলিসি অভিযান কখনও চলতে পারে? 
বিহারের পর বাংলায় নির্বাচনের প্রাক্কালে হবে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন। এই রিভিশনের উদ্দেশ্য হল অবৈধ ভোটারকে চিহ্নিত করা। শর্ত কী? ১৯৮৭ সালের পর এবং ২০০৪ সালের পর যারা ভোটার হয়েছে, তাদের ওই সময়কাল ও পূর্ববর্তী বিস্তারিত নথিপত্র দেখানো।
 ঘটনাচক্রে বিজেপি সমর্থকদের একাংশের একটি ধারণা হয়েছে, এই রিভিশন করে যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়বে, তারা হল বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। অতএব মুসলিম। আদতে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। ১৯৮৭ সালের পর থেকে ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যত মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে এসেছে, তাদের মধ্যে প্রচুর মুসলিম তো আছেই, একইভাবে বিপুল পরিমাণে রয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু। সুতরাং আগত মুসলিমদের কাছে যে উপায়ে প্রাপ্ত আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড ইত্যা঩দি আছে, এই ৪০ বছর ধরে আগত হিন্দুদের কাছেও ঠিক সেইসবই ওইসব উপায়েই রয়েছে। অতএব ১৯৮৭ সালের আগে তাদের পিতামাতার নাম, ঠিকানা এবং ২০০৪ সালের আগের পিতামাতার নাম ঠিকানার নথি দেখাতে হবে। 
তাহলে বাংলায় কার ক্ষতি বেশি হবে? তৃণমূলের ভোটারদের পাশাপাশি এই বাংলাদেশ থেকে আগত বিগত ৩০/৪০ বছরে হিন্দুদের মধ্যে বিপুল অংশ বিজেপিরও সমর্থক ও ভোটার। সুতরাং ভয় যে কেবলমাত্র মুসলিমদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে, একথা ভাবা অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতা হবে। আর তারই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বিহারে। সেখানে ভোটার তালিকা রিভিশনে যাদের নাম বাদ চলে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে, সেখানে সিংহভাগই হিন্দু। এই একই চিত্র আগামী দিনে বাংলাতেও হবে।  
এই সম্ভাবনাকেই আরও জোরদার করতে যেন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি খেদাও অভিযান করা হচ্ছে। মূলত দরিদ্র, প্রান্তিক ও দিনমজুরি করতে ভিনরাজ্যে যাওয়া বাঙালিকে টার্গেট করা হচ্ছে। এই যে যারা ধরা পড়ছে পুলিসের হাতে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম নেই? অবশ্যই আছে। আবার পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দা মুসলিম এবং অসংখ্য হিন্দু বাঙালিও আছে। 
কে কাকে তাড়াচ্ছে সেটার থেকেও যে বৃহৎ অপমান ও অসম্মানের আবহ তৈরি হচ্ছে, সেটি হল, ভাষা। বাংলা ভাষায় কথা বললে প্রথম সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলায় যে কথা বলছে, প্রথম সন্দেহ করা হচ্ছে যে, সে নিশ্চয়ই বাংলাদেশি। বস্তিতে থাকে? বাংলা বলে? তাহলে বাংলাদেশি। এটাই বাঙালির অপমান। 
আর এই দুই ইস্যু নিয়ে এখনও পর্যন্ত দিল্লির বিজেপি কর্তারা কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। কেন? মমতা ব঩ন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন ৪১ বছর ধরে ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ঠিক কেন্দ্রস্থলে বাস করা নেত্রী এভাবেই ঠিক এই ইস্যুতে যে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রবল প্রচার শুরু করে দিয়েছেন রাজ্যজুড়ে। এটা দেখেও বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুঝতে পারছেন না যে, এই ইস্যুতে বিপদ হতে পারে তাদের দলের। এই ইস্যু তাঁদের প্রত্যক্ষ মদতেই তৈরি হয়েছে। তাঁরা একবারও থামাচ্ছেন না নিজেদের রাজ্যগুলিকে। বাংলায় এসে প্রধানমন্ত্রী একটিও আশ্বাসবাক্য বলে গেলেন না। তাঁরা ইস্যুটিকে খাটো চোখে দেখছেন। এটাই রাজনৈতিক অপরিণতমনস্কতা। 
হঠাৎ করে ভোটের প্রাক্কালে একমাত্র ইস্যু পরিণত হচ্ছে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও সম্মান রক্ষা। লক্ষ করা যাচ্ছে, বাংলা পক্ষ নামক সংগঠন, সিপিএম, তৃণমূল, কংগ্রেস, সকলেই এই ইস্যুতে বাংলা থেকে দিল্লি পর্যন্ত সরব। একমাত্র নীরব বিজেপি। তাদের বিরুদ্ধে তকমা দেওয়া চলছে বাঙালি বিরোধী। এজন্য দায়ী কে? বঙ্গবিজেপির দিল্লির কর্তারা! ভোটের আগে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ