Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফের পথ দেখাচ্ছে বাংলা

কথা দিয়ে কথা রাখার সংস্কৃতি ভুলেছে ভারতের রাজনীতি। এই ব্যাপারে রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। চমক সৃষ্টিতে তাঁর তুলনা তিনিই।

ফের পথ দেখাচ্ছে বাংলা
  • ২৩ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কথা দিয়ে কথা রাখার সংস্কৃতি ভুলেছে ভারতের রাজনীতি। এই ব্যাপারে রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। চমক সৃষ্টিতে তাঁর তুলনা তিনিই। এক দশকের অধিককালের প্রধানমন্ত্রিত্বে, চমকের পর চমক দিতে গিয়ে, মোদিবাবু কত যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা সম্ভবত তিনিও হলফ করে বলতে পারবেন না। কিন্তু আমরা জানি, বছরে ২ কোটি চাকরি, সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমাসহ বহু প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যেই ‘জুমলা খ্যাতি’ পেয়েছে। বছরে ২ কোটি চাকরি তো হাওয়ায় হতে পারে না। তার জন্য পর্যাপ্ত শিল্প-বাণিজ্য চাই। দেশে শ্রমনিবিড় শিল্প-বাণিজ্য প্রসারের কোনও খবর মোদিযুগে আমরা পাইনি। ভারতবাসী যা পেয়েছে তা হল—রাজ্যে রাজ্যে বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনের আগে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রতিশ্রুতিতে ভরা রঙিন একাধিক ‘সংকল্পপত্র’। কিন্তু নির্বাচনগুলি মেটার পরই বেশিরভাগ সংকল্পের গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়েছে, আমরা পরিতাপের সঙ্গেই লক্ষ করেছি। 

Advertisement

আর আলাদা করে পশ্চিমবঙ্গের কথা বলতে গেলে চলে আসে টানা সাড়ে তিন দশকের সিপিএম জমানার কথা। তিন দশক যাবৎ শিল্প-বাণিজ্যের শ্মশানযাত্রার সাধনা করেছিলেন বামেরা। স্বঘোষিত ‘উন্নততর’ সপ্তম বামফ্রন্ট মরণকালে হরিনামের মতো ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ বুলি আওড়ে গিয়েছিল। বাংলার মানুষ জানে, ততদিনে কৃষি নামক ভিত্তি চৌপাট হয়ে গিয়েছিল। অতএব তার উপর যেমন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না, তেমনই এক ধ্বংসস্তূপের উপর আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে কেটে পড়েছিল লাল জমানা। ২০১১ সালে রাইটার্স তথা বাংলায় ‘পরিবর্তন’ এনেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এক রুগ্ন রাজ্যের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তাঁর প্রথম কাজ হল ‘ধ্বংসস্তূপ’ সরানো। অর্থাৎ ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ফেরানো এবং বিপুল দেনার দায় থেকে বাংলার মানুষকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া। অতঃপর তাঁকে মনোনিবেশ করতে হয় ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ এবং জাতিগত বৈষম্য দূর করার উপর। বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় গরিব এবং মহিলাদের হাতে নগদের জোগান বৃদ্ধি। তার ফলে বাজার ধীরে ধীরে চাঙ্গা হতেই মুখ্যমন্ত্রী হাতে হাতে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেন। বাংলার নিজস্ব উৎসবগুলির বাণিজ্যকরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। জোর দেওয়া হয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে এবং মহল্লায় মহল্লায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিস্তারে। কৃষক এবং মহিলা শ্রমিকসহ নিম্নবর্গের আয় স্বস্তিদায়ক হতেই মুখ্যমন্ত্রী নানাবিধ শিল্পস্থাপনের মাধ্যমে বাংলার শিল্পায়নকে পাখির চোখ করেন। এই ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের (বিজিবিএস) একের পর এক আসর। 
এই যেমন অষ্টম বিজিবিএস-এ ঘোষণা মতোই শালবনিতে পূর্ব ভারতের প্রথম প্রকৃতিবান্ধব তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। সোমবার মুখ্যমন্ত্রীই ওই প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট গড়ে উঠবে এখানে। বিখ্যাত জিন্দাল গোষ্ঠীর ‘জেএসডব্লু এনার্জি’ ১৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। ওই প্রকল্প ঘিরে কর্মসংস্থান হবে ১৫ হাজার। শালবনিতেই দু’হাজার একরের উপর এক বিশাল শিল্পতালুক গড়ে তুলবেন জিন্দালরা। স্বভাবতই, সব মিলিয়ে বিপুল কর্মসংস্থানের এক বেনজির আয়োজন দেখতে চলেছে আগামী বাংলা। সোমবার ওই শিল্পতালুকেরও শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। সোজা কথায়, রাজ্যে শিল্পায়ন নিয়ে বিরোধীদের অপপ্রচারের মুখতোড় জবাবই দিয়েছেন বাংলার জননেত্রী। তিনি আরও আশার কথা শুনিয়েছেন যে, সবক’টি বাণিজ্য সম্মেলন মিলিয়ে রাজ্য ১৯ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছে। তার মধ্যে ১৩ লক্ষ কোটির বিনিয়োগ ইতিমধ্যে হয়েও গিয়েছে। বাকিগুলির বাস্তবায়ন যে কেবল সময়ে অপেক্ষা মাত্র, সেই বিশ্বাস বাংলার আপামর মানুষের রয়েছে। রাজ্যের শিল্পের অগ্রগতির খতিয়ান সংক্ষেপে এইরকম—মেদিনীপুরে ন’টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক রয়েছে। তৈরি হয়েছে ছ’টি ইকনমিক করিডর। রঘুনাথপুরে ৭২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। সেখানে আসছে পাঁচটি বড় সংস্থা। ২,৪৮৩ একর জমিতে জঙ্গলসুন্দরী কর্মনগরী তৈরি হয়েছে। অশোকনগরে কাজ করছে ওএনজিসি। বানতলায় লেদার হাব হয়েছে। নিউটাউনে গড়ে উঠছে ভারত বিখ্যাত সিলিকন ভ্যালি। তাজপুরেও শিল্প আসছে। দেউচা-পাচামির কয়লা শিল্পে হাজার হাজার বেকার যুবক-যুবতী চাকরি পাবেন আগামী দিনে। কয়েক দশক বাদে তৃণমূল জমানায় যে অভূতপূর্ব শিল্পপরিবেশ রচিত হয়েছে, তার সৌজন্যে বাংলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধিই আজকের নিয়ম। ফের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত বাংলা। ভারতকে ফের পথ দেখাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন পশ্চিমবঙ্গ। এই মাহেন্দ্রক্ষণে নিছক বিরোধিতার জন্য বিরোধী রাজনীতি যেন কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক না-হয়। তাতে বাংলা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় বর্তাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন বিরোধীদেরই উপর। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ