Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অকারণ বাংলার ক্ষতি করা হচ্ছে

মুর্শিদাবাদে সংঘটিত বেনজির অশান্তি কাকতালীয় কিছু নয়, রীতিমতো চক্রান্ত করেই ঘটানো। শেখ হাসিনা উৎখাত পর্বে ঢাকাসহ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে জেল পালানো জঙ্গিদের একটা বড় অংশই মুর্শিদাবাদে হাঙ্গামার নেপথ্যে।

অকারণ বাংলার ক্ষতি করা হচ্ছে
  • ১৮ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মুর্শিদাবাদে সংঘটিত বেনজির অশান্তি কাকতালীয় কিছু নয়, রীতিমতো চক্রান্ত করেই ঘটানো। শেখ হাসিনা উৎখাত পর্বে ঢাকাসহ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে জেল পালানো জঙ্গিদের একটা বড় অংশই মুর্শিদাবাদে হাঙ্গামার নেপথ্যে। এমনই সুনির্দিষ্ট তথ্য এসেছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে। কমপক্ষে ২০ জঙ্গির ওই দল তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে সামশেরগঞ্জ, সুতি ও ধুলিয়ানে হাঙ্গামার পুরোভাগে ছিল। সুতি সীমান্ত দিয়ে এপারে ঢুকেছিল বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিমের (এবিটি) ক্যাডাররা। বোরখা পরে সীমান্ত পেরয় তারা। এই দলে রিপন, জুয়েল, এক্রামুল, মিজান প্রভৃতির মতো পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিরা ছিল। মহম্মদ ইউনুস ক্ষমতায় আসার পরেই ওপার বাংলা মৌলবাদী ও জঙ্গিদের কী ভয়াবহ লীলাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে তা সারা দুনিয়া জানে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ লাগোয়া রাজশাহি ও চাঁপাই নবাবগঞ্জে জঙ্গিরাজ কায়েম হয়েছে। মুর্শিদাবাদে হাঙ্গামার নির্দেশাবলি এসেছে সীমান্তের ওপার থেকে। হাঙ্গামার ধরন আমাদের মুম্বই হামলার কৌশল মনে পড়ায়। 

Advertisement

ষড়যন্ত্রের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল গত জানুয়ারিতে। ৪ জানুয়ারি ধুলিয়ানের একাংশে দাপিয়ে বেড়িয়েছিল ‘বহিরাগত’ যুবদের বাইক বাহিনী। বাছাই করা কিছু বাড়িতে তারা ইট-পাটকেলও ছুড়েছিল। গোয়েন্দাদের কাছে পরিষ্কার, জঙ্গিরা রেকি করতেই ওই অশান্তি ঘটিয়েছিল সেইসময়। তখন স্থানীয় কতিপয় যুবককে ‘মগজ ধোলাই’ করে জঙ্গিদের টিমে জুড়ে নেওয়া হয়। উল্লেখ করা দরকার যে, গত জানুয়ারিতে রেকি করা এলাকাতেই এবার ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে। নয়া ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদের নামে রঘুনাথগঞ্জ ও ধুলিয়ানের কয়েকটি জায়গায় সভা করে প্রয়োজনে ‘বাংলাদেশ লাইন’ প্রয়োগ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে যে হাঙ্গামাকারীরা এসেছিল, তাদের উপর নির্দেশ ছিল—রেল স্টেশন, বিডিও অফিস, থানা, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের মতো সরকারি সম্পত্তি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও আক্রমণ চালাতে হবে। সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগও করা চাই। প্রয়োজনে খুন করতে হবে কর্তব্যরত পুলিসকে। সেইমতো নষ্টামি করার চেষ্টাও দুষ্কৃতীরা করেছিল। 
উপযুক্ত তথ্য থাকা সত্ত্বেও আগাম সতর্ক হতে না-পারাটা নিশ্চয় বড় ব্যর্থতা। রাজনৈতিক দলগুলির স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও থাকছে বিরূপ প্রশ্ন। তাঁরা সক্রিয় এবং তাঁদের পর্যাপ্ত জনসংযোগ থাকলে এত বড় কাণ্ডের আগাম আঁচ পাওয়াই যেত। দুর্ভাগ্য যে, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সূত্র দুটিই একযোগে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, গোটা ঘটনার পিছনে ছিল রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির চক্রান্ত। কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে এই ছক কষেছিল তারা। সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে যে বিএসএফ, সেটি নিয়ন্ত্রণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। স্বভাবতই ক্ষমার অযোগ্য এই ব্যর্থতার মূল দায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের উপরেই বর্তায়। সংগতভাবেই মুখ্যমন্ত্রী এজন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে আক্রমণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও জবাব দাবি করেছেন তিনি। মোদি সরকারের নয়া ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদকে সামনে রেখেই মুর্শিদাবাদে হাঙ্গামা পাকানো হয়েছে। প্রতিবাদ শুধু মুর্শিদাবাদে নয়, চলছে কলকাতাসহ সারা বাংলাতেই। প্রথমত, এই বিতর্কিত আইন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তৈরি করেনি। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং তৃণমূল সুপ্রিমো তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই আইনকে কোনোভাবেই সমর্থন করেন না। তাঁর সাংসদরা পার্লামেন্টেও এই আইনের বিরোধিতা করেছেন সর্বতোভাবে। সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্বসহকারে ঘোষণা করে দিয়েছেন, নয়া ওয়াকফ আইন বাংলায় কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। আর তাঁরা আগামী দিনে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হয়ে এই কালা কানুন বাতিলও করবেন। অতএব, প্রতিবাদের নামে বাংলায় কোনোরকম বাড়াবাড়ি, বিশৃঙ্খলা বা অশান্তির সৃষ্টি বাঞ্ছনীয় নয়। প্রতিবাদীদের এটা সবার আগে বোঝা দরকার। কেননা, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিরূপ বার্তা রটে যেতে পারে। সেটা বাংলার জন্যই সামগ্রিকভাবে খারাপ খবর। রাজ্যজুড়ে সম্প্রীতির ঐতিহ্য বজায় রাখা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ