Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হেরে হেরে বেশ সড়গড় বঙ্গ বিজেপি

২০২৬ এগিয়ে আসছে যেন তাড়াতাড়ি! মা-মাটি-মানুষের চতুর্থ সরকার গড়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের মনে অবশ্য কোনও সংশয় নেই।

হেরে হেরে বেশ সড়গড় বঙ্গ বিজেপি
  • ২৬ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: ২০২৬ এগিয়ে আসছে যেন তাড়াতাড়ি! মা-মাটি-মানুষের চতুর্থ সরকার গড়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের মনে অবশ্য কোনও সংশয় নেই। ঘাসফুল প্রেমীদের সহজ হিসেব, পেতে হবে মানুষের ভোট। ভোট পাওয়ার জন্য দরকার সব মানুষের মন জয় করা। সেটা অবশ্য একদিনের কাজ নয়, সারা বছরের, ৩৬৫ দিনের ব্রত। নির্বাচনী জয়ে দুটি হাতিয়ারই যথেষ্ট—‘উন্নয়ন’ আর ‘সব সময় সব মানুষের পাশে থাকা’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার তার উন্নয়ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে যথানিয়মে। ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কোনও ফাঁকফোকর থাকছে কি না, তার উপর নজর রয়েছে তৃণমূল কর্মীদের। তেমন কোনও ত্রুটি থাকলে দলীয় কর্মীরাই তা প্রশাসনের নজরে আনছেন। ‘দুয়ারে সরকার’-সহ একগুচ্ছ কর্মসূচি রূপয়াণের মাধ্যমে চলছে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিগুলো শুধরে চটজলদি সুরাহা প্রদান। স্বভাবতই আত্মবিশ্বাসী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ২১৫ আসন জয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই কর্মীদের মনে গেঁথে গিয়েছে এই মন্ত্র। অতএব মানুষের মন জয়ে তাঁদের মধ্যে আরও বেশি তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। 

Advertisement

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি অবশ্য বলছে, এবার হবে নাকি সম্মুখসমর! আর সেটা বোঝাতেই বিরোধী দলনেতা ১৮০-র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ২০ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুর থেকে তিনি আরও দাবি করেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রাক্তন করব। ভবানীপুরেই হারাব তাঁকে!’ কিন্তু কোন জাদুতে? এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাময়। প্রথমেই এটাকে অক্ষমের আস্ফালন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ। কেননা তাঁরা ভুলে যাননি, বাংলা দখলের জন্য ২০২১-এ বিজেপি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপি সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা, রামরাজ্যের কাণ্ডারী যোগী আদিত্যনাথ প্রমুখ দিল্লি-কলকাতা ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ করেছিলেন। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ১৪৮ জোগাড় হলেই সরকার গঠনের হক জন্মায়। তবু বাংলায় দুই তৃতীয়াংশ (১৯৬) আসন জয়ের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন অমিত শাহ। তিনি তার সঙ্গে আরও ন্যূনতম ৪ ‘বোনাস’ জুড়ে ‘২০০ পার’ হুংকার দিয়েছিলেন। 
বিজেপিকে এটা করতেই হয়েছে, এবং লম্ফঝম্প জারি আছে আজও। কারণ বাংলার ক্ষমতা অধরা—এটা গেরুয়া শিবিরেরর বড় খেদের জায়গা। তার কারণ দুটি—এক, দলের প্রতিষ্ঠাতা-পুরুষ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হলেন বঙ্গসন্তান। দুই, অন্তত একবার বাংলার ক্ষমতা না-পেলে কোনও দল জাতীয় রাজনীতিতে ‘কুলীন’ বলে গণ্য হয় না। বাজপেয়ি এবং মোদি মিলিয়ে মোট‍ চারবার কেন্দ্রের ক্ষমতায় বিজেপি। তারা দেশের সব প্রান্তেই রাজ্য সরকার গড়েছে, খোদ দিল্লি নিয়েও ব্যাকফুটে ছিল দীর্ঘদিন। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ক্ষমতাচ্যুতি সেই ক্ষতেও প্রলেপ দিয়েছে। কিন্তু আজও বড্ড দূরে রয়ে গিয়েছে বাংলা, কলকাতা, রাইটার্স, নবান্ন! এই যন্ত্রণা বিজেপি নেতৃত্বকে কুরে কুরেই খাচ্ছে। তাই দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনেও মরণপণ করেই ঝাঁপিয়েছিল গেরুয়া শিবির। চব্বিশে টার্গেট ছিল ৩৫/৪২! কিন্তু একুশ এবং বিয়াল্লিশে তাদের ঝুলিতে এসেছিল যথাক্রমে—৭৭/২৯৪ এবং ১২/৪২। একটি বালকও জানে—শতাংশের হিসেবে এ কোনও পাশ মার্কও নয়। 
গেরুয়া বাহিনী তারপরও বিজেপি কর্মীদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে এবং বাংলার মানুষকে বিভ্রান্ত করার খেলায় নেমেছে। সঙ্ঘ-অনুগামীরা ভুলে যাচ্ছেন, বাঙালির চেয়ে রাজনীতি সচেতন জাতি এ দেশে বিরল। বাঙালির আগুনে দগ্ধ হয়েই ভারতছাড়া হয়েছিল ইংরেজ। স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গ শাসনের দায়িত্ব মানুষ কংগ্রেসকে দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার মোহে কংগ্রেস নেতৃত্ব ভুলে গিয়েছিলেন বাংলার মানুষের ভালোমন্দের দিকগুলি। শতবর্ষ প্রাচীন দলটিকে সবার আগে সাইনবোর্ডসর্বস্ব করে দিয়েছে বাংলার জনতা। তারপর সিপিএমের নেতৃত্বে বামেরা দীর্ঘকাল বাংলা দখল করে রেখে ‘উপহার’ দিয়েছিল হার্মাদি শাসন। সহনশীল বাঙালি সময় বুঝেই বাংলার মাটি থেকে বামেদের উপড়ে ফেলেছে মূলসমেত। এখন যা অবস্থা, সিপিএম-কংগ্রেসের গলা জড়াজড়ি করে কান্না ছাড়া আর কোনও পথ পশ্চিমবঙ্গবাসী খোলা রাখেনি। 
এমন টাটকা ইতিহাসের পাতা খোলা চোখের সামনে! তবু চৈতন্য চেতনা গেরুয়া নেতাদের হয়নি যে, তা পরিষ্কার। তাঁরা ঘোলা জলে মাছ ধরার খোয়াব দেখছেন এখন থেকেই। বাংলার মানুষের সমর্থন পাওয়ার জন্য দরকার ছিল তাঁদের পাশে থাকার, এবং বাংলাজুড়ে উন্নয়ন করার। টানা তিনটি টার্ম কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় তাঁরা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই কাজটা অনায়াসেই করা যেত। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রকে কাজটি করতে হয়, রাজ্যগুলির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। কিন্তু মোদিবাবুরা ক্ষমতায় এসে ‘ডাবল’ এবং ‘সিঙ্গল’ ইঞ্জিন তত্ত্ব আমদানি করে এই সাংবিধানিক ব্যবস্থাটাকেই নস্যাৎ করে দিয়েছেন। বিরোধী দল, বিশেষ করে সবচেয়ে প্রতিবাদী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জব্দ করার জন্য হাজারো যন্ত্রণা দেওয়া হচ্ছে বাংলার মানুষকে। যেমন—গ্রাম বাংলার কোটি কোটি গরিব মানুষের রুটিরুজির বড় হাতিয়ার যে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প (মনরেগা) তাতে টাকা দেওয়া হয় না তিন বছর যাবৎ। আবাস যোজনা মারফত গরিবের বিনামূল্যে পাকাবাড়ি পাওয়ার কথা। বাংলা বঞ্চিত তাতেও। কেন্দ্রীয় বঞ্চনা এবং প্রতারণাই যখন দস্তুর, তখন বাংলার উন্নয়নের স্বার্থে ঋণ করতেই হবে রাজ্যকে। কিন্তু ঋণ, বিশেষত বৈদেশিক ঋণের জন্য জরুরি কেন্দ্রের ছাড়পত্র। কিন্তু সেখানেও বাংলাকে টাইট দেওয়ার নীতি জারি রেখেছে দিল্লি। মোদি সরকারের অনাবশ্যক আপত্তিতে দিনকয়েক আগে আটকে গিয়েছে গ্রাম বাংলার উন্নয়নের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলার (৩,৪৩৮ কোটি টাকা) ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ। আইএসজিপি-৩ প্রকল্পে বাংলার ধারাবাহিক সাফল্যে সন্তোষপ্রকাশসহ বিশ্ব ব্যাঙ্ক ওই ঋণ দিতে চেয়েছে। 
শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিনিমিনি খেলছে মোদি সরকার। সমগ্র শিক্ষা মিশনে বাংলার প্রাপ্য অর্থও দিচ্ছে না তারা। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই কর্মসূচিতে বাংলার বাজেট বরাদ্দ ছিল ২,৬২৯ কোটি টাকা। তার মধ্যে ১,৭৪৬ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল কেন্দ্রের। কিন্তু তারা বাস্তবে দিয়েছে মাত্র ৩১১ কোটি! আর এবছর? এই লেখা পর্যন্ত, জাস্ট কলা দেখিয়েছি! ক্ষমতার কারবার বাংলাকে বারবার যূপকাষ্ঠে চড়িয়েছে। বাংলার মানচিত্রকে যতবার খণ্ডিত বিখণ্ডিত হতে হয়েছে, ইতিহাসে তার তুলনা মেলে না। তাই কোনও সচেতন বঙ্গসন্তান পশ্চিমবঙ্গের আর বিভাজন চান না। বাংলার অখণ্ডতাই আজের বাঙালির শ্রেষ্ঠ আবেগ। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বের তাতে কিস্যু যায় আসে না। ‘বঙ্গভঙ্গের’ বিবিধ প্রস্তাব পকেটে নিয়েই তাঁরা রাজনীতির ময়দানে চক্কর কাটেন। এই পংক্তিভুক্ত বঙ্গ বিজেপির কাণ্ডারী সুকান্ত মজুমদার স্বয়ং! 
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুগত সৈনিকরা যখন বাংলার উন্নয়নের জন্য প্রাণপাত করে চলেছেন, তখন বিজেপির কোনও কোনও নেতা মোদি সরকারের কাছে দরবার করে চলেছেন, ভুলেও যেন বাংলার প্রাপ্য টাকাকড়ি দেওয়া না-হয়। টাকার অভাবে বাংলার কিছু কাজ আটকে গেলেই না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সরকার ও পার্টির উপর রাজ্যবাসী খেপবে। মানুষ খেপানো ছাড়া মোদির বাংলার সৈনিকদের হাতে কীই-বা আছে? টার্গেট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত কুৎসা করা হচ্ছে, দেশে-বিদেশেও! মানুষে-মানুষে লড়িয়ে দেওয়ার কৌশলটা ধরা পড়ে গিয়েছে। আর জি কর কাণ্ডে কোনও ডিভিডেন্ড মেলেনি। অতঃপর বিভ্রান্তি ছড়াতে দেউচা পাচামি প্রকল্পকে আঁকড়ে ধরা হল। লাগিয়ে দেয়া হয়েছে ওবিসি মামলা। দুর্গা পুজো, সরস্বতী পুজো, রামনবমীকে সামনে রেখেও নষ্টামি অব্যাহত। সিএএ’র কথা আর শুনছি না। জনগণনা, লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস, এনআরসি, ইউসিসি, ‘হিন্দু-হিন্দু ভাই ভাই’ প্রভৃতি নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে কী খেলা হবে তা নিয়েও চিন্তিত গৃহদাহের পুরনো সাক্ষীগণ। 
এই যাদের উজ্জ্বল মুখের নমুনা, তাদের কোন আনন্দে ভোট দেবেন বাংলার মানুষ? ‘শ্যামাপ্রসাদের পশ্চিমবঙ্গ’ হলেও তার দখল কিন্তু মুফতে হবে না। আপনজন চিনে নিতে বাঙালি ভুল করে না মোটেই। মূল্যবান ভোটটি দেওয়ার আগে দেনা-পাওনার খাতায় তারা চোখ রাখবেই। কী দেখতে পাবে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনবার বাংলা-শাসনের বেনজির দৃষ্টান্ত। তাঁর আমলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত গরিব, দুর্বল এবং নারী। এই তিন শ্রেণির সার্বিক ক্ষমতাবৃদ্ধির স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে অর্থনীতি এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার উপর। বেড়েছে কৃষক, শ্রমিক, মহিলাসহ বাংলার সব শ্রেণির মানুষের আয় এবং জিএসডিপি। বাংলায় শিল্প-ব্যবসা স্থাপনের জন্য শিল্প-বণিক মহলের ভরসাও ক্রমবর্ধমান। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের রিপোর্টই বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বরে ২৯টি সংস্থার হাত ধরে বাংলায় বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ এসেছে ৩৯ হাজার কোটিরও বেশি টাকার। 
অন্যদিকে, মোদির ভারতের ছবিটা কীরকম? মণিপুর তো সারা দেশের মাথা হেঁট করে দিয়েছে, আর নিচু হওয়ার জায়গা নেই। আয়পত্তর এতটাই বেহাল যে প্রিমিয়াম বাবদ মাসে ৪২ টাকা গুনতেও অপারগ, অটল পেনশন যোজনা ছেড়েছেন ১.১২ কোটি গ্রাহক! মোদির ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এখন প্রশ্নের মুখে, শুরু হয়েছে গ্রাহকের আর্থিক সামর্থ্য যাচাই। মমতার ‘কন্যাশ্রী’ যখন সারা দুনিয়ার সামনে মডেল, তখন ৪৫৫ কোটির এক কেলঙ্কারির জালে মোদির ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ কর্মসূচি। মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার টুকে চালু করা মহারাষ্ট্রে ‘লড়কি বহিন’ ইতিমধ্যেই ‘নির্বাচনী জুমলা’ শিরোপা লাভ করেছে। বামেরা যখন তত্ত্বের কচকচানি নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াইতে ব্যস্ত, তখন বিজেপি মশগুল মুফতে বাংলা দখলের খোয়াবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা মগ্ন বাংলার মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার রকমারি ভাবনা নিয়ে। মানুষের জন্য আবহমান রাজনীতিকে কি ভূতুড়ে ভোট আর ভেদ ভাবনা দিয়ে পরাস্ত করতে পারবেন মোদির সৈনিকরা? মনে হয় না। অবশ্য বারবার ফেল করায় তাঁরা ইতিমধ্যেই বেশ সড়গড় হয়ে উঠেছেন। এবারের ব্যাপারটা সামলে নিতে তাঁদের কষ্ট হবে না বলেই মনে হয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ