হিমাংশু সিংহ: মহামান্য মোদিজি আপনি বিহারে যে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছেন তার জন্য হার্দিক অভিনন্দন। তা বলে জঙ্গলরাজ বলে বাংলাকে ও বাঙালি অস্মিতাকে অপমান করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? একাহারী হয়েও ৭৫ বছর পেরিয়ে আপনার সাম্রাজ্য বিস্তারের খিদে দেখে বিস্মিত হই! সব দখল করতে হবে যে কোনও উপায়ে! এই ঝোঁকটা ভালো, কিন্তু বেশি ‘খেয়ে’ ফেললে হজম হবে তো! আপনার বিহারে সাফল্য পাওয়ার কৌশল তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেখানো পথে। আপনি বললেন লালুজির মুসলিম যাদব (এম ওয়াই) ফর্মুলাকে ঢেকে দিয়েছে ‘মহিলা ও যুব’ শক্তির কোলাজ। কিন্তু মহিলাদের মন জয়ে যা করলেন তা তো মমতার শেখানোই শুধু নয়, হুবহু খাতা দেখে টোকা। ভোটের আগের রাতেও মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা ঢুকেছে। এসআইআরের জুজু দেখিয়ে মেরুকরণ করেছেন। নির্বাচন কমিশন সজাগ, বশংবদ না অন্ধ, আপনিই ভালো জানেন! যতই নেত্রীর সমালোচনা করুন তাঁর দেখানো ফর্মুলাই আপনি দিল্লি, মহারাষ্ট্র, বিহার সর্বত্র ব্যবহার করছেন অবলীলায়! আর মা গঙ্গা বিহার হয়ে বাংলায় প্রবাহিত তো আজ নতুন নয়, যুগ যুগ ধরে। আপনার জন্মেরও শত শত বছর আগে থেকে। একুশে অমিত শাহ যখন দু’শো আসনের খোয়াব দেখিয়েছিলেন, তখনও গঙ্গা পাটনা হয়ে কলকাতার দিকে প্রবাহিত হয়েছে, চব্বিশেও তাই। কিন্তু নিট ফল শূন্য। লোকসভায় রাজ্য থেকে আপনাদের আসন ১৮ থেকে কমে ১২ হয়েছে! আর ছাব্বিশে দল ভাঙিয়ে না এনে আরএসএসের ছাপ মারা আগমার্কা ২০০ জন প্রার্থী হাজির করতে পারবেন তো? তারপর তো বাংলা দখলের প্রশ্ন! এসআইআর কিন্তু ইতিমধ্যেই ব্যুমেরাং হতে শুরু করেছে জেলায় জেলায়। আর আপনার দল চিহ্নিত হয়েছে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী হিসেবে।
তাহলে আপনাদের অবদান? ভোটের হাওয়া তো দূর অস্ত, ‘স্বর্গরাজ্য’ যোগীর খাসতালুক থেকে পাটলিপুত্র হয়ে কোভিডের সময়কার পচাগলা হাফ ডজন মৃতদেহ ছাড়া আর কিছুই ভেসে আসেনি হিন্দি বলয় থেকে! আসন্ন ছাব্বিশের যুদ্ধ কেন, উনত্রিশেও এর খুব একটা ইতরবিশেষ হবে বলে মনে হয় না। এই জন্যই অতীতে আপনাদের সমীকরণ মেলেনি, মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়নি। আগামীতেও বাংলা থুড়ি ‘জঙ্গলরাজ’ দখল দুঃস্বপ্নই থেকে যাবে। একুশে তৃণমূল ভেঙে দেদার টাকা ছড়িয়ে বিজেপি দু’শো দূর অস্ত, তার অর্ধেক আসনও পায়নি। তখন আপনার স্লোগান ছিল ‘সোনার বাংলা গড়ব’। আর এবার একরাশ ঘৃণা ছড়িয়ে বলছেন ‘জঙ্গলরাজ’! এই পরিবর্তন স্রেফ হতাশা থেকেই। আপনি বুঝে গিয়েছেন এবারও বাংলা দখল হবে না, হাত ফসকে যাবে।
এর কারণ বিহারে গেরুয়া দলের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার জন্য পরোক্ষে নীতীশ আছেন। মহারাষ্ট্রে পাশে আছে শিবসেনা ও এনসিপি’র বিদ্রোহী অংশ, যা আপনি ভাঙাতে পেরেছেন নানা কৃৎ কৌশলে। আর এ রাজ্যে এক ডজন দলবদলু নিয়ে বিজেপি একেবারে একা। একুশের চেয়েও ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গ! রাজ্য সভাপতি আপাদমস্তক নিরালা প্রিয় একজন কবি। তাঁকে বড়ো একটা কেউ মানেও না, ঘাঁটায়ও না। ফলে পাঁচ বছর আগে সাংগঠনিক অবস্থা যা ছিল, এই মুহূর্তে তার শোচনীয় হাল। জেলায় জেলায় বিচিত্র ধান্দায় উড়ে আসা নতুনদের সঙ্গে পুরোনোদের লড়াই চলছে। একটা রাজ্য কমিটি খাড়া করতেই হিমশিম অবস্থা! মোদিজি, আপনি দামি হাওয়াই জাহাজের ধুলো উড়িয়ে জমিদারের মতো যেদিন আসেন, সেদিন যাঁরা মঞ্চের সামনে সেজেগুজে বসেন তাঁদের অনেকেরই মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ। বাইরে থেকে চাপানো অবাঙালিদের মানতে আবার একটা অংশ নারাজ। সব মিলিয়ে বঙ্গ শাখাটা আপাদমস্তক ঘেঁটে আছে।
বিহার জয়ের দিনে আপনি বাংলায় জঙ্গলরাজের কথা বলেছেন। খুব ভালো করেছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী মুখে একটি অঙ্গরাজ্যে ‘জঙ্গলরাজ’ চলছে বললে থুতুটা পালটা যে আপনার গায়ে গিয়েই পড়ে, ক্ষমতা দখলের নেশায় সেটাও বেমালুম ভুলে গিয়েছেন জেনে ভালো লাগল। এই আপনার ফেডারেল স্ট্রাকচার, বাংলার প্রতি কোনও দায় নেই! আপনার শাসনে মণিপুরে বসন্ত, যোগীরাজ্যে সুইজারল্যান্ডের ইতিউতি রোমান্টিক হাওয়া, হরিয়ানায় অনাবিল শান্তি বিরাজ করছে দেখে আশ্বস্ত হলাম! আচ্ছা আপনার ডাবল ইঞ্জিন শাসনে হরিয়ানার আল ফালাহ মেডিকেল কলেজের অভ্যন্তরে কী চলছে, বললেন না তো! পরপর শুধু বিস্ফোরক আর অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে ডাক্তারদের কাছ থেকে, আর আপনি হিমশীতল নীরব! ওটা তো একদিনের কাজ নয়, আপনার রাজ্য সরকার, আপনার গোয়েন্দারা কী করছিল? কাশ্মীরে থানার মধ্যে উদ্ধার হওয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট থেকে বিস্ফোরণে ৯ জনের মৃত্যু! এটা কার গাফিলতি? উত্তরপ্রদেশে গত পাঁচ বছরে ক’টা ধর্ষণ, রাহাজানি ও খুনের ঘটনা ঘটেছে সব বোধ হয় মনে নেই আপনার। মনে থাকলে এবং একচোখা না হলে যোগী শাসনকেও ‘জঙ্গলরাজ’ বলেই অভিহিত করতেন নির্ঘাৎ। কলিঙ্গ জয়ের পর শুধু পুরী আর ভুবনেশ্বরে গত ৬ মাসে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা দেখেও ‘জঙ্গলরাজ’ আখ্যা দিতে নাড্ডাজিরা আশ্চর্যরকম অলস, ঠোঁট কিছুতেই নড়ে না, কারণ সেখানে এই মুহূর্তে ক্ষমতায় গেরুয়া দল। হাতরাস, উন্নাও, রহস্যজনকভাবে ছাড়া পাওয়া গুজরাত দাঙ্গায় ধর্ষিতা বিলকিসের অত্যাচারীদের নিয়ে গেরুয়া উল্লাস নীরবে সয়ে যান সাম্প্রদায়িক বিচক্ষণতায়। এনিয়ে একটি বাক্যও খরচ করেননি আজ পর্যন্ত। এটাই বুঝি ‘স্বর্গরাজ্যের’ আসল সংজ্ঞা! সবিনয়ে প্রশ্ন করি, ‘জঙ্গলরাজই’ যদি বাংলার শেষ পরিণতি, তাহলে তা দখলে আপনারই বা এত তাড়া কীসের? বাংলাকে আপনি ঘৃণা করেন, টাকা আটকে রাখেন, তা ওই জঙ্গল নিয়ে কী করবেন? বলি, আপনার সরকারের দেওয়া ক্রাইম রিপোর্ট কি তৃণমূল তৈরি করে? নাহলে কেন্দ্রের সরকারের দেওয়া এনসিআরবি’র রিপোর্টে বাংলায় জঙ্গলরাজ চলছে বলে উল্লেখ নেই কেন? ওই রিপোর্টটা অসত্য না মহামান্য নেতার ভাষণ?
আসলে কারণ একটাই, সব জিতেও আপনার রথ বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে এই বাংলার সীমানায়। আপনি শোচনীয়ভাবে হেরেছেন এক পোড়খাওয়া জননেত্রীর কাছে! কত ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন, ভোটের আগে নাগাড়ে ৪০-৫০টা সভা করতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে শুনেছেন? অলিগলিতে ঘুরেছেন। আবার প্রস্তুত হচ্ছেন নতুন বছর পড়লেই দিনেরাতে জঙ্গল ভ্রমণের জন্য। আপনি দৃশ্যতই হতাশ, কারণ বিলক্ষণ জানেন, তেজস্বীর মতো বাবাকে ভাঙিয়ে উঠে আসা কেউ নন, বাংলায় আপনার উলটো দিকে প্রতিদ্বন্দ্বী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের পয়লা নম্বর স্ট্রিট ফাইটার। বিগত চার দশকেরও বেশি সময়ের হার না মানা লড়াকু নেত্রী। এসআইআর দিয়ে লালু-পুত্রকে ঘায়েল করেছেন, কিন্তু বাংলাকে রোহিঙ্গামুক্ত করার ডাক দিয়ে হিন্দু উদ্বাস্তুদেরই আরও দূরে ঠেলে দিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে মতুয়া ও রাজবংশীরাও আপনাকে যোগ্য জবাব দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে আগামী ভোটে। গত তিন বছর ধরে আড়াই লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছেন তার ক্ষতও সহজে ভোলার নয়। তাই এত করেও বিহার জয়ের রাতে আপনার বুকে দগদগে বাংলায় ব্যর্থতার কাঁটা! নেহরুর উত্তরাধিকার অযোগ্য রাহুলের হাতে পড়ে ধ্বংস। কিন্তু যতক্ষণ প্রাণ আছে আপনার পথের কাঁটা বাংলার অগ্নিকন্যা। স্ট্রিট ফাইটারদের কখনও সহজে নিরস্ত্র করা যায় না।
আপনার ফোলানো ফাঁপানো সাফল্যের পিছনেও বিস্তর অন্ধকার! ৬ বছর আগের ‘অপারেশন কাশ্মীরে’র পর চলতি বছরের অপারেশন সিন্দুর। কী পেয়েছে দেশ? বাহাওয়ালপুর থেকে মুরিদকে, শিয়ালকোট থেকে মুজফ্ফরাবাদ, পাকিস্তানের ১০০ কিলোমিটার ভিতরে ঢুকে অধিকাংশ জঙ্গি শিবির ধ্বংস মাত্র ২২ মিনিটে। বীরত্ব তো বটেই, তবে সেটা সেনাবাহিনীর! নোট বাতিলের পর যেমন কালো টাকার দৌরাত্ম্য কমেনি, তেমনি লালকেল্লার অদূরে পড়াশোনা জানা কাশ্মীরি ডাক্তারদের গাড়ি বিস্ফোরণ এবং টেরর মডিউল প্রমাণ করছে যুদ্ধটা আর সীমান্তের ওপারে নয়, একদম দেশের ভিতরে, রাজধানীর বুকে! ডাবল ইঞ্জিন রাজ্য হরিয়ানায়। ৭০ একর বিস্তৃত আল ফালাহ মেডিকেল কলেজটির যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে মোদিজির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বছরেই। তাহলে সেখানে জঙ্গল রাজের কারিগর কে? ভোটে কিংবা যুদ্ধে যেই জিতুক জয় পরাজয়ের সীমানা পেরিয়ে আবার দেশের মূল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে জঙ্গি দৌরাত্ম্য। জঙ্গিদের কংগ্রেস-বিজেপি-তৃণমূল হয় না। চিকিৎসকদের ভাড়াবাড়ি থেকে কোন জাদুতে হাজার হাজার কেজির ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক মজুত হল তার জবাব নেই গোয়েন্দাদের হাতে। দিল্লির ঘটনাটা যে জঙ্গি কার্যকলাপ তা বলতেই সরকারের ৭২ ঘণ্টা কেটে গেল! কারণ, আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়টা পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত নয়। বাংলায় হলে আধঘণ্টাও লাগত না গর্জন করতে। গত মে মাসে সরকার দাবি করেছিল জঙ্গিদের আর উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হবে না। আজ কী বলবেন? এইসব উজ্জ্বল মেধাবী ডাক্তারদের বিপথে নিয়ে গেল কারা? ৮০০ কিলোমিটার দূরত্বে বসে দুই মৌলবি, একজন শোপিয়ানের আহমেদ দার এবং অপরজন আল ফালাহ মেডিকেল কলেজের ভিতরে অবস্থিত মসজিদের ইমাম মহম্মদ ইশকিয়া কীভাবে মগজধোলাই করলেন আপনারই ডাবল ইঞ্জিন স্বর্গরাজ্যে বসে? ওসব তো বাংলায় হওয়াই দস্তুর। কারণ রোহিঙ্গারা এই বঙ্গে থাকে। আপনার চোখের উপর রাজধানী থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে এমন হল কীভাবে?
বারবার অসত্য বলে তাকেই সত্যি প্রমাণ করা .যেমন গোয়েবলসের পুরোনো কৌশল, তেমনি কুঁজোরও তো চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে! কিন্তু যে রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে বাংলার আত্মার যোগ নেই, যাঁদের হাতে গেলে বঙ্গ সংস্কৃতির পঞ্চত্বপ্রাপ্তি অনিবার্য, তাঁদের হাতে বাংলার মানুষ ছাব্বিশে নিজেকে সমর্পণ করবে না। আপনি প্রতিদিন আসুন, বাংলাকে যথেচ্ছ আক্রমণ করুন, মানুষও কিন্তু তৈরি।