Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ব্যাঙ্কের জনমুখী সিদ্ধান্ত

দেশবাসীর ব্যাঙ্কিং অভ্যাস থেকেই স্পষ্ট হয় একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সময়োপযোগী। ব্যাঙ্কিং অভ্যাসের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। কিন্তু পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যর্থতার কারণে বেশিরভাগ প্রান্তিক অঞ্চলে ব্যাঙ্কের শাখা পৌঁছয়নি।

ব্যাঙ্কের জনমুখী সিদ্ধান্ত
  • ১ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশবাসীর ব্যাঙ্কিং অভ্যাস থেকেই স্পষ্ট হয় একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সময়োপযোগী। ব্যাঙ্কিং অভ্যাসের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। কিন্তু পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যর্থতার কারণে বেশিরভাগ প্রান্তিক অঞ্চলে ব্যাঙ্কের শাখা পৌঁছয়নি। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ নগদ লেনদেনে অভ্যস্ত ছিল। কী সঞ্চয়, কী ঋণগ্রহণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার বাইরে তাদের বিচরণই দস্তুর হয়ে উঠেছিল। ঋণগ্রহণের জন্য একদিকে মহাজনের খপ্পরে পড়ত এবং অন্যদিকে রকমারি চিটফান্ডে সঞ্চয় করে সর্বস্বান্ত হতো তারা। এই সমান্তরাল অর্থনীতির সঙ্গে সরকারি রাজস্বব্যবস্থার সম্পর্ক প্রায় ছিল না। ফলে রাজকোষও নানাভাবে ফাঁকিতে পড়ত। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্য সমস্যাটি বারবার অর্থমন্ত্রকের গোচরে এনে সমগ্র দেশকে ব্যাঙ্কিংব্যবস্থার আওতায় আনার দাবি তুলেছিল। কিন্তু সব গ্রামে এবং দেশের সর্বত্র বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কস্থাপন লাভজনক নয়, এই অজুহাতে ‘অলাভজনক’ পরিসরে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার বিস্তার ঘটানো হয়নি। ভারতের মতো সুবৃহৎ দেশ তার বিস্তর কুফল ভোগ করত। গরিব মানুষ শুধু সঞ্চয় এবং ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো না, ছোটখাটো ব্যবসায়িক লেনদেন এবং মজুরিগ্রহণেও নানাভাবে প্রতারিত হতো। এই ধরনের লেনদেন মূলত নগদ অর্থে সীমিত ছিল বলে ব্যাপক দুর্নীতিরও শিকার হতো তারা।

Advertisement

ঠিক এমনই এক মুহূর্তে, ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা (পিএমজেডিওয়াই) ঘোষণা করেন নরেন্দ্র মোদি। দেশজুড়ে প্রকল্পটির দ্রুত রূপায়ণ শুরু হয়। উদ্বোধনের দিনই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয় দেড় কোটি! দাবি করা হয় যে, আর্থিক ক্ষেত্রে নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির এটাই বিশ্বের বৃহত্তম উদ্যোগ! পরবর্তী একদশকে ৫৫ কোটির অধিক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলে। সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে এই তথ্য অভূতপূর্ব এবং এই ছবি আমাদের গর্বিত করে। কেননা, এই সাফল্য বাস্তব হলে এবং এর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হলে ভারতের অর্থনীতির হাল ফিরে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তব তার সঙ্গে সংগত করেনি। দেশের যেসব মানুষকে লক্ষ্য করে জিরো ব্যালান্সের জনধন অ্যাকাউন্ট খোলার বন্দোবস্ত হয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের বেশিরভাগেরই আয়পত্তর তেমন বাড়েনি। ফলে বহু লোকই লেনদন চালিয়ে যেতে পারেনি। সরকারি তথ্য বলছে, এমন প্রায় দেড় কোটি অ্যাকাউন্ট একপ্রকার নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে। 
দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় এরই পাশে রয়েছে অন্য চিত্র। একটু সচ্ছল গ্রাহকরা জনধনের আগে থেকেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেনে অভ্যস্ত। কিন্তু বহু গ্রাহকের এমন আহামরি অবস্থা নয় যে সেভিংস অ্যাকাউন্টে সবসময় মোটা টাকা ফেলে রাখবেন। তাঁদের দৈনন্দিন অনেক খরচখরচা থাকে। তারপর যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে তা দিয়ে অল্প অল্প করে রেকারিং কিংবা ফিক্সড ডিপোজিট করে থাকেন তাঁরা। কারণটা খুবই সোজা। সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমা টাকার উপর সুদ মেলে যৎকিঞ্চিৎ। সেই তুলনায় আরডি/এফডি থেকে একটু আয় বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে। আর এই সুযোগ নিতে গিয়েই সেভিংস অ্যাকাউন্টে ‘মিনিমাম ব্যালান্স মেনটেন’ নামক ফরমান মানতে হিমশিম অবস্থা হয় গ্রাহকের। ‘খেলাপি’ গ্রাহককে মোটা অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হয়। বস্তুত আটহাত কাপড়ে গৃহিণীর ঘোমটা সামলানোর মতোই কঠিন পরীক্ষায় পড়ে যায় নিম্নবিত্ত ভারতবাসী। তাই গ্রাহকদের বরাবরের দাবি ছিল, অ্যাকাউন্ট চালু রাখতে ন্যূনতম ব্যালান্সের নিয়ম যেন তুলে নেওয়া হয়। কিন্তু গ্রাহকদের যন্ত্রণা এবং দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি ব্যাঙ্কগুলি এতদিন কর্ণপাত করেনি। বরং ‘খেলাপি’ গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পেনাল্টি আদায় করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রকের তথ্য বলছে, গত পাঁচবছরে এই বাবদ প্রায় ৯ কোটি টাকা ‘উপার্জন’ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি। তবে এই তালিকায় এসবিআই নেই। সব মিলিয়ে, যাকে বলে গ্রাহকদের দুয়ে নিচ্ছিল ব্যাঙ্কগুলি। সর্বশেষ সুখবর হল, এই ‘অন্যায্য’ ব্যবস্থায় এবার দাঁড়ি পড়তে চলেছে। বেশিরভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এই জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। এই তালিকায় থাকছে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক, পিএনবি, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক, ব্যাঙ্ক অব বরোদা, কানাড়া ব্যাঙ্ক, সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক এবং ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া। বাদবাকি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিও তাড়াতাড়ি এই পথই অনুসরণ করবে বলেই অনুমান করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত জনমুখী, অতএব প্রশংসনীয়। এতে শুধু গ্রাহকরাই লাভবান হবেন না, ব্যাঙ্কের সঞ্চয় ও ব্যবসা বৃদ্ধিরও সহায়ক হবে এই সিদ্ধান্ত। একযাত্রায় পৃথক ফল আর কেন, বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিরও উচিত জনস্বার্থে আন্তরিকভাবে সাড়া দেওয়া। তবেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতির উপর।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ