Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ: মোদি কি সময় কিনছেন?

জিন্না অ্যান্ড কোং-এর ‘পাকিস্তান’ দাবির বিরোধিতা করেছিল জামায়াত। তার জন্য জামায়াতের সমালোচকরা এই বলে কটাক্ষ করে যে ব্রিটিশ ভারতে তারা ছিল ইংরেজের পক্ষে।

বাংলাদেশ: মোদি কি সময় কিনছেন?
  • ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: জিন্না অ্যান্ড কোং-এর ‘পাকিস্তান’ দাবির বিরোধিতা করেছিল জামায়াত। তার জন্য জামায়াতের সমালোচকরা এই বলে কটাক্ষ করে যে ব্রিটিশ ভারতে তারা ছিল ইংরেজের পক্ষে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি যখন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ গড়ার দাবিতে সোচ্চার, জামায়াত তখন নিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষ। সেই শক্তিই পাঁচ দশক বাদে স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানের তল্পিবাহক সরকার গড়তে মরিয়া। বাংলাদেশে ‘বৈষম্যহীন’ সমাজ প্রতিষ্ঠার খোয়াব দেখিয়ে চোরাপথে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন মহম্মদ ইউনুস। তাঁর আর কোনও রাখ ঢাক গুড় গুড় নেই। তিনি এখন সরাসরি পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছেন। 

Advertisement

কুখ্যাত পাক সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দেশটি। পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের মাটিতে এখন জোর চলছে জঙ্গিবাদের চর্চা। এই কুকর্মটাই এতদিন পাকিস্তানের ‘উর্বর’ মাটিতে চলেছে লাগাতারভাবে। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই জঙ্গি সৃষ্টি এবং রপ্তানিতে বিশ্ব রেকর্ড করেছে। এই ‘উন্নয়নের ধারা’ সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের অধিকার পুনরায় কায়েম করা জরুরি ছিল। কারণ পাকিস্তানের এক এবং একমাত্র লক্ষ্য, ভারতের‌ সর্বনাশ করা। যদিও গত আট দশকে ওই মরীচিকার পিছনে ছুটতে গিয়ে পাকিস্তানের তৃষ্ণাই বেড়েছে শুধু, পানের‌ যোগ্য জলের নাগাল পায়নি। মাঝখান থেকে একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান নামক সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভূভাগ জিন্নার সাধের রাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ৯৩ হাজার পরাজিত সেনাসহ ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানের ইস্টার্ন ফ্রন্টের কমান্ডার নিয়াজি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, কোনও রাষ্ট্রের তরফে এটাই ছিল সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণের নজির। বস্তুত হিন্দুস্থানের লৌহমানবী ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নাকে খত দেওয়ার পর ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছুই করার ছিল না পাককর্তাদের। 
***
তাদের রাষ্ট্রনায়ক জুলফিকার আলি ভুট্টো ভারতের সঙ্গে ‘হাজার বছর যুদ্ধের’ হুংকার ছেড়ে রেখেছিলেন। অবশ্য ভারতের সঙ্গে সম্মুখসমরে এঁটে ওঠা‌ পাকিস্তানের পক্ষে কখনওই সম্ভব নয়, ইসলামাবাদ জানে। তাই তারা তস্করের মতোই ‘ছায়াযুদ্ধে’ মনোনিবেশ করেছে। তাতে ভারতের ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই হয়েছে, বারবার অশান্ত হয়েছে ভারতের অভ্যন্তর। পাকিস্তানের উঞ্ছবৃত্তি ভারত অবশ্যই সামলে নেবে। কিন্তু পরিণামে জাহান্নামের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছে পাকিস্তান নিজেই। তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে পাকিস্তানের অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামো। খণ্ডিত মানচিত্রখানাও‌ পাকিস্তান আর বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারবে বলে ভরসা করে না অনেক পাকিও। পাকিস্তানের দিকে দিকে চলছে ‘বিচ্ছিন্নতার উৎসব’! এই দগদগে ক্ষত ঢেকে রাখতেই পাকিস্তানের বর্তমান শাসকরা ভারত-বিরোধিতার অস্ত্রে আরও বেশি করে শান দেওয়ার মতলব এঁটেছে।‌ অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশে আজকে যাবতীয় অশান্তির মূলে রয়েছে শাহবাজ শরিফ এবং আসিম মুনিরের প্ররোচনা। পাকিস্তানের ভাবখানা এই, আমরা একা ডুবে মরব কেন ‘সতীর্থ’ করে নেব ‘বেরাদার’ বাংলাদেশটাকেও। বলা বাহুল্য, গালভরা ডাকে ‘উজিরে আজম’ হলেও শাহবাজ শরিফের স্টেটাস বাস্তবে আসিম মুনিদের গৃহভৃত্যের ঊর্ধ্বে নয়।
অপারেশন সিন্দুরে‌ ভারতের সেনাবাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হওয়ার পরেও মুনির ‘ফিল্ড মার্শাল’ (যদিও পাকিস্তানের নিরপেক্ষ লোকজন তাঁকে ‘ফেইল্ড মার্শাল’ বলেই মশকরা করে) তকমা বাগিয়ে নিয়েছেন। শাহবাজও বাধ্য হয়েছেন মনিবের হুকুম মেনে নিতে।‌ শুধু তাই নয়, মুনির পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বাধিক ক্ষমতাধর সামরিক কর্মকর্তা, যিনি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীরও সর্বেসর্বা! এমনকি একটি সংবিধান সংশোধনী এনে এবং পার্লামেন্টের ভোটের মাধ্যমে তাঁকে আজীবনের জন্য যেকোনও ফৌজদারি মামলার ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। মুনির তিন বাহিনীর সর্বময় কর্তা থাকবেন ২০৩০ সাল পর্যন্ত। পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই বেনজির ‘সংস্কার’ কোনও সৌখিন ব্যাপার নয়। এর পিছনে রয়েছে ভারত-বিরোধী চক্রান্তকে সুস্থায়ী রূপদানের একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা। 
ইউনুসের বাংলাদেশ অভ্রান্তভাবে এই পরিকল্পনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স‌ ছিনিয়ে নেওয়া এবং বঙ্গোপসাগরের মাতব্বর হওয়ার বাসনা প্রকাশ ইউনুসের ‘স্লিপ অফ টাং’ ভাবার কোনও কারণ নেই। ইউনুসের কণ্ঠে এই প্রসঙ্গে যা শোনা গিয়েছে তা ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রাপ্ত মন্ত্রের নরম উচ্চারণ মাত্র। অতঃপর বাংলাদেশ জুড়ে একদল উগ্র মুসলিম মৌলবাদী লোক গগনভেদি হুক্কাহুয়া করে চলেছে। কেউ কেউ বলছে, সেভেন সিস্টার্স শুধু ভারতের মানচিত্র থেকে কেটে নিয়েই তারা ক্ষান্ত হবে না, বাংলাদেশের সঙ্গে জুড়বে অথবা সাতটি পৃথক স্বাধীন দেশ গড়ে দেবে। এমনও হুংকার তারা ছাড়ছে যে চার ঘণ্টায় কলকাতা দখল করবে এবং তারপর তারা পৌঁছে যাবে দিল্লিরও দখল নিতে। এই শক্তি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, তারা চেঙ্গিস খান, তৈমুর লং, নাদির শাহ প্রভৃতি লুটেরাদের যোগ্য উত্তরসূরি। অতএব তাদের অজেয় কিছু নেই।  
***
‘পাশে আছি’—আশ্বাসবাণী শুনিয়েছেন মহম্মদ ইউনুস। বাংলাদেশের অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষকর্তা। তাঁর এই আশ্বাস ‘ডেইলি স্টার’ এবং ‘প্রথম আলো’ নামে বাংলাদেশের দুটি শীর্ষ সংবাদপত্রকে। হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার জন্য বাংলাদেশে পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছে ‘মবতন্ত্র’। পত্রিকা অফিস দুটি তাদের হাতে ধ্বংস হওয়ার পরই ডঃ ইউনুস সাক্ষাৎ মসিহার ভূমিকায়। নিন্দুকেরা অবশ্য এর মধ্যে খুঁজছে জনপ্রিয় বাংলা প্রবাদ ‘সাপ হয়ে কাটে আর ওঝা হয়ে ঝাড়ে’-এর অদ্ভুত সাদৃশ্য। ‌পরিষ্কার করে দেওয়া হল, অন্যান্য মিডিয়াও ‘বেচাল’ হলে এমনই চরম মূল্য চোকাতে হবে তাদের। ইউনুস প্রশাসনের বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই রয়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ। এমন অভিযোগ এই ‘আন্তর্জাতিক ধান্দাবাজ’ বারবার খারিজ করেছেন এবং উলটে দুষেছেন ‘হিন্দু’ ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ‘অপপ্রচারকে’। নির্যাতন কিন্তু থেমে নেই, বরং বর্ধমান। সর্বশেষ দৃষ্টান্ত ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপুচন্দ্র দাসের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। ‘ইসলাম অবমাননা’র গুজব ছড়িয়ে একজন গরিব শ্রমিককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে ধর্মোন্মাদরা। যে মানুষটি প্রাণ বাঁচাবার জন্য পুলিশের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন, অর্থাৎ ছিলেন পুলিশ হেপাজতে, তাঁকেই জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিয়োও করা হয়েছে দীর্ঘক্ষণ ধরে এবং পাইকারি হারে। পুলিশ এবং সরকারের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া এই নারকীয় দুর্বৃত্তরাজ  চলতে পারে বলে বিশ্বাস করা কঠিন। 
বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের নামে ওপার বাংলায় যে মবতন্ত্র চাগাড় দিয়ে উঠেছে, তা থেকে রেহাই পায়নি জাতীয় সংসদ ভবন, বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, রবীন্দ্রনাথ, লালন সাঁই, একাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠন (ছায়ানট ও উদীচী ) এবং ভারতীয় দূতাবাস ও উপদূতাবাস। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তাই পৌঁছে গিয়েছে যে ইউনুসের বাংলাদেশ পুরোপুরি জঙ্গিদের দখলে। ‘ইউনুসের সরকার রাজাকারের পাহারাদার’ স্লোগান কি খুব অন্যায্য? পড়শি রাষ্ট্রের যুগপৎ এই নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পতনের কম্পন, নিঃসন্দেহে, সবচেয়ে বেশি পৌঁছেছে ভারতে। 
***
স্বভাবতই মোদি সরকারের আশ্চর্য নীরবতা আমাদের কাছে রহস্যময়ই ঠেকছে। ইউনুস প্রশাসনের গ্যারান্টি অবশ্যই সে-দেশের সেনাবাহিনী। সঙ্গে রয়েছে ধান্দাবাজ সুশীল সমাজ, সুবিধাভোগী শ্রেণি (একদল প্রাক্তন সেনা ও পুলিশ কর্তা, আমলা এবং মিডিয়া পার্সন)। গতবছর তথাকথিত গণঅভ্যুত্থান অর্গানাইজ করার জন্য যে বিদেশি প্রোপাগান্ডা জোট বা দালাল চক্র মদত জুগিয়েছিল তারা আরও সক্রিয়। জোরালো অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যাপারে পাকিস্তানের সহযোগী আজারবাইজান। প্রশ্ন উঠেছে, নিকটতম পরাশক্তি ভারত সময়োচিত পদক্ষেপ করলে ইউনুসের এই দক্ষ খেলা কত মিনিট স্থায়ী হতে পারত? নরেন্দ্র মোদি কি সময় কিনছেন? আরএসএস কি কোনও বিশেষ অঙ্ক কষছে এবং সেজন্যই কি দ্বিধায় ৫৬ ইঞ্চি ছাতির নরেন্দ্র মোদি? তিনি কি অপেক্ষা করছেন বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের জন্য? মোক্ষম সময়েই কি তিনি বড় কোনও অ্যাকশন নিতে চান, যাতে মেরুকরণের রাজনৈতিক ফায়দাটা ভোটযন্ত্রে জমা হয় ত্রুটিহীনভাবে? প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক এবং ‘বর্তমান’ কাগজের প্রাণপুরুষ বরুণ সেনগুপ্ত একটা কথা বলতেন, ‘বাঙালির ছেলে কলকাতায় কলকে না পেলে কুলীন হয় না।’ ওইসঙ্গেই আসে ভারতের রাজনীতির কথা। কোনও দল বাংলার রাজ্যক্ষমতা দখল করতে না-পারা পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতিতে কুলীন গণ্য হয় না। বিজেপি একাধিকবার কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং অনেকগুলি রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। কিন্তু গেরুয়া বাহিনী বাংলা দখলের ধারেকাছেও পৌঁছোতে পারেনি আজ পর্যন্ত। এই অর্থে ‘ব্যর্থ’ নেতার তালিকায় নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। এই যন্ত্রণা তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। দলের প্রাণপুরুষ কৃতী বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। অথচ তাঁরই ‘সৃষ্টি করা’ রাজ্য বিজেপির কাছে অধরা মাধুরী! বাংলা দখলের জন্য নরেন্দ্র মোদির পক্ষে এটাই হয়তো লাস্ট চান্স। তাই কি তিনি ভীষণ মেপে পা ফেলছেন, যেমনটা আমরা দেখেছি সেঞ্চুরি স্পর্শ করার আগে সুনীল গাভাসকার থেকে শচীন তেন্ডুলকর পর্যন্ত কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের অতিসতর্কতা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ