নরেন্দ্র মোদির ক’টা ভোট? নিশ্চয়ই একটা। কিন্তু বেঙ্গালুরুর মহাদেবপুরার গুরকিরত সিং ড্যাং-এর নাকি চারটে ভোট! একই লোক, একই ঠিকানা, কিন্তু চারটে বুথের ভোটার! আর আদিত্য শ্রীবাস্তব বেঙ্গালুরুর পাশাপাশি নাকি মহারাষ্ট্র ও উত্তরপ্রদেশেরও ভোটার! খবরে প্রকাশ, শুধু মহাদেবপুরার বিধানসভা কেন্দ্রেই এমন একাধিক জায়গায় নাম থাকা ১১ হাজার ৯৬৫ জন ভোটারের পরিচয় ফাঁস করে আক্ষরিক অর্থেই ‘বোমা’ ফাটিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বেশ কিছুদিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের ‘যোগসাজশে’ বিজেপি ভোটার তালিকায় কারচুপি করে ‘ভোট চুরি’ করছে বলে অভিযোগ তুলছিলেন রাহুল। ‘চুরি’ ধরতে তাঁর তৈরি একটি টিম গত ছ’মাস ধরে মহাদেবপুরায় সমীক্ষা চালায়। সেই সমীক্ষা রিপোর্টই প্রকাশ্যে এনে কংগ্রেস নেতার দাবি, গত লোকসভা ভোটে বেঙ্গালুরু সেন্ট্রালের ৬টি বিধানসভা এলাকায় পিছিয়ে ছিল বিজেপি। কিন্তু একমাত্র মহাদেবপুরায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার ভোটে এগিয়ে থেকে সেন্ট্রাল লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী হয় মাত্র প্রায় ৩৩ হাজার ভোটে। এরপরই নির্বাচন কমিশনের তৈরি ভোটার তালিকা ধরে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, মহাদেবপুরা বিধানসভার মোট সাড়ে ছয় লক্ষ ভোটারের মধ্যে ১ লক্ষ ২৫০ ‘ভোট চুরি’ হয়েছে। রাহুলের আরও দাবি, ৩৩ হাজারের কম ভোটে জেতা লোকসভার এমন ২৫টি আসনে ‘কারচুপি’ করে জিতে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। রাহুলের এই বিস্ফোরক তথ্যকে ভুল বা মিথ্যা বলতে দেখা যায়নি কমিশনকে। তবে কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্রের নির্বাচনী আধিকারিকরা কংগ্রেস নেতাকে চিঠি পাঠিয়ে হলফনামা আকারে যাবতীয় তথ্য জমা দিতে বলেছেন।
রাহুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ‘ভোট চুরি’র আবার রকমফের আছে। যেমন দেখা গিয়েছে, এক কক্ষ বিশিষ্ট বাড়িতে ভোটার সংখ্যা ৮০ জন! গিয়ে নাকি দেখা গিয়েছে, সেখানে কেউ থাকেন না। কোনও বাড়ির ভোটার সংখ্যা ৪৩ হলেও বাস্তবে কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অভিযোগ, ভোটার তালিকায় এমন ভুয়ো ও অস্তিত্বহীন ভোটারের সংখ্যা ৪০ হাজার। একই ঠিকানায় অধিক ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে দশ হাজার। আবার চার হাজারের বেশি ভোটার কার্ডে এমন ছবি লাগানো রয়েছে, যা দেখে ভোটারদের চেনা যাবে না। বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়। ভারতে নতুন ভোটারের বা প্রথম ভোটার হওয়ার বয়স ১৮ বছর। এ জন্য ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করতে হয়। মহাদেবপুরায় প্রায় ৩৪ হাজার ভোটারের নাম পাওয়া গিয়েছে, যাদের বয়স ৭০ থেকে ৯৮-এর মধ্যে। এ পর্যন্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, এরা প্রথম বা নতুন ভোটার! রাহুলের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে, মহারাষ্ট্রে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের পরে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বিধানসভা ভোটের আগে এক কোটি নতুন ভোটারের জন্ম হয়েছে! অভিযোগ, এই ‘কারচুপি’র ভোটে ভর করেই কুর্সি দখল করেছে বিজেপি। নিঃসন্দেহে অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর। ভোটে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে তাই রাহুলের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রকৃত সত্য সামনে আনা দরকার।
তবে ‘জল’ মিশিয়ে ভোটে জেতার নানা রণকৌশল প্রকাশ্যে আসতেই গত লোকসভা ভোটের পর তোলপাড় শুরু হয়। সেই কারণেই এখন ইন্টেনসিভ ভোটার তালিকা সংশোধনের কৌশল বাজারে এনেছে নির্বাচন কমিশন—এ অভিযোগ বিরোধীদের। নতুন ফর্মুলায় বিহারে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই সংশোধনের কাজ শুরুর পথে। ভুয়ো ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ভোটার তালিকার যে সংশোধন জরুরি, তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ভোটারের পরিচয়পত্র হিসেবে এমন কিছু প্রমাণপত্র চাওয়া হচ্ছে, যা দেশের বহু মানুষের কাছে থাকা সম্ভব নয় বা নেই। উপরন্তু সরকারেরই দেওয়া আধার কার্ড, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভোটার আইডি কার্ড কেন প্রমাণপত্র হিসেবে গ্রাহ্য হবে না, সেই জরুরি প্রশ্নও উঠেছে। এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে বিরোধীরা। ঘটনা হল, বিহারে বাদ পড়া ৬৫ লক্ষ ভোটারের বেশিটাই দেখা যাচ্ছে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, জনজাতি ও পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের। সাদা চোখে যারা বিজেপির ভোটার নয় বলে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে, বহু ক্ষেত্রে নাকি ভোটারের কাছে না গিয়েই নিজেদের মতো ফর্ম পূরণ করে আসল ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন সব গুরুতর অভিযোগ নিয়ে সংসদে আলোচনা করতেও রাজি নয় মোদি সরকার। আসলে এসব পদক্ষেপ এনআরসির প্রথম ধাপ কি না— সেই প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে ভোটার ও নাগরিকত্ব প্রমাণের এক নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে দেশের আম জনতাকে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আধিপত্যবাদ ও হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান গঠনের যে লক্ষ্যে এগচ্ছে আরএসএস, বিজেপি— তার বলি হতে হচ্ছে ভারতবাসীকে। কিন্তু কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা কোনও রাজনৈতিক দল যাতে তুলতে না পারে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কমিশনের। মানুষের বিশ্বাস, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীনভাবেই এই স্বাধীন সংস্থাটি সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। তাদের কাজ গণতন্ত্রকে রক্ষা করা।