Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আগস্ট মাসই ঠিক করবে রাজনীতির ভবিষ্যৎ

সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস। নরেন্দ্র মোদির ভোট-স্লোগান। প্রতিবার নির্বাচনের আগে ‘সবকা’র পর কিছু একটা যোগ হয়। কিন্তু আম জনতার বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ কতটা?

আগস্ট মাসই ঠিক করবে রাজনীতির ভবিষ্যৎ
  • ২৯ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস। নরেন্দ্র মোদির ভোট-স্লোগান। প্রতিবার নির্বাচনের আগে ‘সবকা’র পর কিছু একটা যোগ হয়। কিন্তু আম জনতার বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ কতটা? সংশয় আছে দু’দশক আগে বাংলা থেকে কাজের খোঁজে গুরুগ্রামে যাওয়া ওই পরিবারের। আঠারোর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তাদের মেয়ের। সংশয়... কারণ তারা এত বছরের সংসার গুটিয়ে বাংলায় ফিরে যেতে এখন বাধ্য। হরিয়ানা পুলিস বুঝিয়ে দিয়েছে, এখানে থাকলে ‘ঝামেলা’ আছে। মাঝে মাঝে তুলে নিয়ে যাবে উর্দিধারীরা। সারাদিন আটকে রাখবে। কাগজ দেখার নামে হেনস্তা চলবে। কেউ কেউ টাকাও চাইবে। কত টাকা? ১০ হাজার! বিশ হাজার! কোথায় পাবে তারা? তাই ফিরে যেতে হবে বাংলায়। সার্টিফিকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছে কিশোরী। প্রশ্ন করছে, ‘আমার কেরিয়ারের কী হবে? ভেবেছিলাম, ডাক্তারি পড়ব। নিটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। জানেন... আমার বাবা-মা কেউ স্কুল যায়নি। কিন্তু চেয়েছে, আমি পড়াশোনা করি। আমাকে পড়াবে বলে দিনরাত পরিশ্রম করেছে। আস্তাকুঁড় ছিল এই গুরুগ্রাম। আমার বাবা-মায়ের মতো হাজার হাজার লোক এটাকে শহর বানিয়েছে। এই তার ফল? কে দায় নেবে আমাদের এই অবস্থার?’ মালপত্র বাঁধা হয়ে গিয়েছে। রওনা দেবে তারা। ওই ঝুপড়িগুলোতে যারা থাকে, তারা সবাই। আতঙ্কে। কারণ পুলিস তো কাগজই দেখছে না! আগে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আটকে রেখে দিচ্ছে। নগ্ন করে। দু’মুঠো খাবার পর্যন্ত জুটছে না। কিন্তু অমানুষিক নির্যাতনে ঘাটতি নেই। মাটিতে ফেলে ফাইবারের ডান্ডা দিয়ে পেটানো হচ্ছে। কারণ? তারা বাংলায় কথা বলে। ‘সবকা বিশ্বাস’ স্লোগান? এই কিশোরীর জন্য নয়। এই পরিবারগুলোর জন্য নয়। একে বাঙালি, তায় আবার হিন্দুত্ব এজেন্ডার সঙ্গে এরা খাপ খায় না। তাও নরেন্দ্র মোদি বলছেন। বলবেন। ১৫ আগস্ট আসছে। লালকেল্লার মহামঞ্চ থেকে শোনা যাবে তাঁর কণ্ঠস্বর, ‘মেরে দেশবাসীও...।’ 

Advertisement

বিকাশ তাঁর এজেন্ডায়, স্লোগানে, প্রতিশ্রুতিতে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচে তৈরি এক্সপ্রেসওয়ে দুটো বৃষ্টিতেই খাটালে বদলে গেলে? ওতে অস্বাভাবিক কী আছে! অ্যাক্ট অব গড। বিকাশ তো হয়েছিল। দেখা না গেলে দায় তাঁর সরকারের নয়। তাতে প্রতিশ্রুতির উড়ানে ঘাটতি থাকবে না। পরিষেবা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব... প্রতিদিন এক একটা আমেদাবাদ বিপর্যয় ঘটছে আম জনতার জীবনে। ভেঙে পড়ছে প্রতিশ্রুতির উড়ান। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের স্ক্রিপ্ট তৈরি হচ্ছে। লালকেল্লায় আরও একবার উড়ানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ‘বিকাশ’। অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী... শোনা যাবে আবার তাঁর কণ্ঠে, ‘মিত্রোঁ...।’
প্রস্তুত হচ্ছে নির্বাচনী ক্ষেত্র। প্রথমে বিহার। তারপর বাংলা। এইসব তারই গৌরচন্দ্রিকা। নেমে পড়েছে শাসক। নেমে পড়েছে বিরোধী। নেমে পড়েছে নির্বাচন কমিশনও। রবিবার তারা জানিয়েছে, বিহারে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম প্রাথমিক তালিকা থেকে বাদ যাবে। এঁদের মধ্যে ২২ লক্ষ মারা গিয়েছেন। ৩৬ লক্ষ স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। ইন্টেনসিভ রিভিশনে এই তথ্য জানতে পেরেছে তারা। প্রশ্ন হল, আগের বছরই তো এই ভোটার তালিকায় নির্বাচন হয়েছিল বিহারে। তার মাঝে ২২ লক্ষ মারা গেলেন! আর ৩৬ লক্ষ অন্যত্র চলেও গেলেন! তা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। তাহলে কি মৃতরা অনেকেই তখন ভোট দেওয়ার জন্য বেঁচে উঠেছিলেন? রহস্যের ব্যাপার বটে। নাকি তখন তাঁরা শাসকের ব্র্যাকেটে থেকে ভোট দিয়েছিলেন। এখন সেই ব্র্যাকেট ভেঙেছে! নিশ্চয়তা নেই, এই ভোটব্যাঙ্ক শাসকের আস্তিনে গিয়ে লুকোবে কি না। তাই কি মৃত এবং স্থানান্তরিত? ছেড়ে দিন, জটিল প্রশ্ন। আর একটু সহজ প্রশ্ন করা যাক—এই এক বছরের মধ্যে ৩৬ লক্ষ মানুষ ঠিক কীভাবে বিহার ছেড়ে ভিন রাজ্যে চলে গেলেন? তাও পাকাপাকি বাসা বদল! তাহলে কি বিজেপি-জেডিইউয়ের আঁতাতে বিহারের মানুষ বিরক্ত? তাই কি তাঁরা দলে দলে এবং লাখে লাখে বিহার ছাড়ছেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর বোধহয় কমিশনেরই দেওয়া উচিত। কিংবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। কারণ, তিনিই তো প্রত্যেক ভারতবাসীর সঙ্গে থাকার, পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছিলেন। ‘সবকা সাথ’ স্লোগানটা বোধহয় সেই জন্যই ছিল। বিহারে ভোটের আগে সেটা কেমন জানি ফ্লপ ঠেকছে। নাকি বিহারের এইসব মানুষের ‘সাথ’ তাঁর প্রয়োজন নেই? বলার জন্য বলা। আবার বলবেন তিনি। লালকেল্লার ভাষণে। 
একটা বিষয় স্পষ্ট, আসন্ন আগস্ট মাসটা বেশ ‘হ্যাপেনিং’ হতে চলেছে জাতীয় রাজনীতির জন্য। দিক্‌নির্দেশকও বটে। এই মাসটাই দেখিয়ে দেবে, আগামী দিনে দেশের রাজনীতি কোন পথে যাবে। খুব বেশি কিছু নয়, দুটো তারিখই যথেষ্ট। প্রথমেই ১ আগস্ট। এইদিন প্রকাশ হবে বিহারের খসড়া ভোটার তালিকা। ইন্টেনসিভ রিভিশনের পর। তারপর শুরু হবে বুথভিত্তিক বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক দলগুলি (পড়ুন বিরোধীরা) দেখবে, কোন কোন বুথে কত ভোটারের ঘাটতি হল। সেই বুথগুলি কোন কোন কেন্দ্রের অধীনে আসছে। এবং সেই কেন্দ্রগুলিতে কোন কোন দল শক্তিশালী। অর্থাৎ, কাদের ভোটব্যাঙ্ক বেশি মজবুত। ইতিমধ্যেই অভিযোগ রয়েছে যে, বেছে বেছে বিরোধীদের মজবুত ভিতের উপরই হাতুড়ির ঘা পড়েছে। মানে, আরজেডি, কংগ্রেস যে সব কেন্দ্রে শক্তিশালী, সেখানেই অনিয়ম হয়েছে ইন্টেনসিভ রিভিশনের ফর্ম নিয়ে। তথ্য জমা পড়েনি। দুটো করে ফর্ম নিয়ে আসার কথা বিএলওদের। কিন্তু সেই দ্বিতীয় ফর্ম অধিকাংশ লোকই দেখেনি। ফলে রিসিভিং কপিও মেলেনি। বুথ লেভেল অফিসার নিজের ইচ্ছে মতো যাকে খুশি বাদ দিয়েছেন। তাই হয়তো সংখ্যাটা ৫৪ লক্ষ। এর থেকে খুব বেশি হলে ২-৪ লাখ কমতে পারে। কিন্তু ৫৪ লক্ষটা কখনওই ১০ লক্ষে নেমে যাবে না। আশঙ্কায় তাই কাঁপন ধরেছে বিরোধীদের মধ্যে। কেন্দ্র বেছে বেছে যদি সত্যি আঘাত এসে থাকে, জেতা আসনও সামান্য মার্জিনে হাতের বাইরে বেরিয়ে যাবে তাদের। ধরে নেওয়া যাক খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর বিরোধীরা দেখল, তেমনটাই হয়েছে। মানে, বিরোধীদের ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পথ প্রশস্ত। তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। অর্থাৎ, সংশোধন। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন তিনি বিহারেরই নাগরিক এবং ভোটার, তাহলে তাঁর নাম ফের জায়গা পাবে তালিকায়। এখানেও একটা মোক্ষম প্রশ্ন রয়েছে—খসড়া তালিকায় যাঁরা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে প্রমাণ করতে পারেননি, বা যাঁদের অস্তিত্বই মেলেনি, তাঁরা এই এক মাসে কীভাবে ভারতীয় হয়ে উঠবেন? কোথা থেকেই বা হঠাৎ তাঁদের উদয় হবে? এই প্রশ্ন থাকছেই। কারণ সংখ্যাটা কম নয়—কমিশনেরই হিসেবে ৫৮ লক্ষ। অর্থাৎ, দিনের শেষে হা-পিত্যেশ করা ছাড়া বিরোধীদের হাতে আর কিছু থাকবে না। একটা ট্রেন্ডও সেট হয়ে যাবে—শাসক চাইলে গণতন্ত্রের মধ্যে থেকেও বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে পারে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, 
৫০ লক্ষাধিক নাম বাদ পড়ার পর বিহারে আরজেডি-কংগ্রেস মহাগঠবন্ধনের ক্ষমতা দখলের আশা 
ক্ষীণ। যদি পুরোপুরি ভোট স্যুইং হয়, অর্থাৎ এনডিএ’র কোর ভোটব্যাঙ্কে ধস নামে, তাহলেই উল্টো ফল হতে পারে। নতুবা নয়। নরেন্দ্র মোদিও সেটা জানেন। ৭৫ বছর বয়স হতে চলল তাঁর। হাফপ্যান্ট পরা বয়স থেকে রাজনীতি করছেন। সঙ্ঘের সাধারণ কর্মী-প্রচারক থেকে মুখ্যমন্ত্রী। তারপর ইন্দিরা গান্ধীর রেকর্ড 
ভাঙা প্রধানমন্ত্রী। ভোট সমীকরণের জ্ঞান তাঁর আছে। ৭৫ বছর পূর্তিতে ‘নিয়মমাফিক’ যদি তাঁকে গদি ছেড়ে যেতেই হয়, বিজেপি যতদিন থাকবে, তাঁরই গুণগান করবে। সঙ্গে তাঁর তৈরি করে যাওয়া ট্রেন্ডেরও... এভাবেও শাসক পারে তার নড়বড়ে কাঠামো মজবুত করতে। এটাই চান নরেন্দ্র মোদি। লাইমলাইট 
কীভাবে কেড়ে নিতে হয়, তাঁর মতো খুব কম লোক সেটা বোঝে। শূন্য থেকেও প্রচারের চোখ ধাঁধানো আলোয় আসতে জানেন তিনি। তার জন্য যে মঞ্চই সামনে আসে, সেটাই ব্যবহার করেন। নিপুণভাবে। তা সে মন কী বাত হোক, অপারেশন সিন্দুর বা নোট বাতিল। ইস্যুর পাশে ঠেলাঠেলি করে জায়গা করে নেন মোদিজি। একইরকম গুরুত্বে চর্চায় থাকেন। ফ্যাকাশে হয়ে যায় দল-বেদলের অন্য নেতানেত্রী। এই মুহূর্তে ৭৫’এর চাপ যে প্রবলভাবে তাঁর উপর চেপে 
বসেছে, সে নিয়ে সন্দেহ নেই। একদিকে সঙ্ঘ আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে চলেছে যে, সময় ঘনিয়ে এল। অন্যদিকে দলের মধ্যেও মোদিপন্থীদের প্রচার চলছে জোরকদমে—প্রধানমন্ত্রী তিনি ২০২৯ সালেও। সত্যিই কি তাই? নজর করার মতো বিষয় হল, গত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠকে তাঁকে দেখা যায়নি। সংসদের অধিবেশন শুরু হতেই বিদেশ সফরে চলে গিয়েছেন। এই সবই কি কাকতালীয়? আগস্ট মাসের আর একটা তারিখ হয়তো উত্তর দেবে। ১৫ আগস্ট। ৭৫ বছরে অবসর যদি তাঁকে সত্যিই নিতে হয়, তাহলে নিঃশব্দ প্রস্থান নরেন্দ্র মোদির হবে না। মঞ্চ প্রস্তুত আছে। ভারতের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। লালকেল্লা। সেদিনই কি প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা যাবে কোনও মহা-ঘোষণা? জল্পনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কারণ, মোদিজি যা করেন... ধামাকা একটা থাকেই। সেই ধামাকা ১৫ আগস্ট নয় তো?
প্রস্থান নয়। মহাপ্রস্থান। মোদিসুলভ সেটাই।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ