Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হিম্মত থাকলে গ্রেপ্তার করুন!

অনেকদিন ধরে আস্ফালন শুনছি। বিজেপির ছোটোবাবু, মেজোবাবু, বড়োবাবু, দলবদলুবাবুদের মুখে। বৃহস্পতিবার আইপ্যাকের অফিসে একটা ভাত টিপতে গিয়েই আক্কেল গুড়ুম হয়ে গিয়েছে অমিত শাহ অ্যান্ড কোংয়ের। সেইসব বীরপুঙ্গবকে বলছি, হিম্মত থাকলে মমতাকে গ্রেপ্তার করুন, বাংলায় ৩৫৬ জারি করুন।

হিম্মত থাকলে গ্রেপ্তার করুন!
  • ১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: অনেকদিন ধরে আস্ফালন শুনছি। বিজেপির ছোটোবাবু, মেজোবাবু, বড়োবাবু, দলবদলুবাবুদের মুখে। বৃহস্পতিবার আইপ্যাকের অফিসে একটা ভাত টিপতে গিয়েই আক্কেল গুড়ুম হয়ে গিয়েছে অমিত শাহ অ্যান্ড কোংয়ের। সেইসব বীরপুঙ্গবকে বলছি, হিম্মত থাকলে মমতাকে গ্রেপ্তার করুন, বাংলায় ৩৫৬ জারি করুন। তারপর থাকতে পারবেন তো! নির্বাচন দূর অস্ত! বাংলার মানুষের সম্মিলিত জনরোষে অমিত শাহের ঘটি নির্বাচনের আগেই ডুবে যাবে! ভোটের পর বাংলায় গেরুয়া পতাকা বইবার লোক পাওয়া যাবে না? রাইটার্স থেকে চ্যাংদোলা করে বের করে দিয়েছিল জ্যোতিবাবুর পুলিশ, ফল সিপিএমের সাধের বাগান ছত্রখান। ইডি লেলিয়ে বঙ্গ বিজেপিও সেই একই পথের পথিক।

Advertisement

অমিত শাহরা ভেবেছিলেন, আইপ্যাকের কয়েকটা ফাইল তুলে নিয়ে গিয়ে নেত্রীকে ঘায়েল করবেন। মূর্খের দল। জানে না মমতা চিরদিনই অন্য ধাতুতে গড়া। আঘাত করলেই তিনি ভয়ংকর। এখনও দেশের সেরা স্ট্রিট ফাইটার। বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন প্রায় তিন দশক পরতে পরতে তার প্রমাণ পেয়েছে সিপিএম। ষোলোআনা ভিনদেশি অবাঙালিদের দল বিজেপি তো কোন ছাড়! আবারও প্রমাণ হল, মুহূর্তে হাওয়া ঘুরিয়ে দিতে পারেন তিনি। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিহিংসার রাজনীতিকে যেমন তিনি সমঝে দিলেন, তেমনি রাজপথে মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম নোটিসে বাংলার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে (পড়ুন গুজরাতিদের রোড শো নয়) কেন্দ্রীয় সরকার ও ইডির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন নিজস্ব স্টাইলে। এই কারণেই সাড়ে চারদশক পেরিয়েও বাংলার রাজনীতিতে তিনি অপ্রতিরোধ্য। কী বিরোধী নেত্রী, কী সরকারের শীর্ষ মহল, ক্ষমতার অলিন্দ থেকে রাজপথে মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া, তাঁর ম্যাজিক ইউএসপির ধারেকাছে নেই কেউ। ভূ-ভারতে ওই ঈর্ষণীয় গ্রহণযোগ্যতা আর কার আছে? সেই রসায়নেই দেড় দশকের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তাঁর ভাবমূর্তিকে পেড়ে ফেলতে পারে না এতটুকু। বরং চ্যালেঞ্জ, লড়াই, প্রতিকূলতা সেই সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের সময়কার আগুনে মেজাজটাকেই মুহূর্তে বের করে নিয়ে আসে। আরও শানিত হয় তাঁর ‘যুদ্ধ’। তিনি পথে থাকলে দলও বাড়তি সংঘবদ্ধ। নেতা-উপনেতার দ্বন্দ্ব মুছে লক্ষ্যে অবিচল কর্মীরাও। কে না জানে, সোনা আরও খাঁটি সোনা হয়, পুড়ে গেলে আগুনে!
যেমনটা হল গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অপরাহ্নে। বিজেপির নির্দেশে ইডির আঘাত এবং সঙ্গে সঙ্গে মমতার প্রত্যাঘাত শাসকদলকে ভোট লড়াইয়ের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনটাই দিয়ে গেল যেন। কয়লা চুরি, বালি চুরির বাহানা দেখেছি। তদন্তের নামে হেনস্তা হয়েছে অনেক। গত পাঁচ বছর ধরেও ‘মানি ট্রেল’ প্রমাণ করা গেল না। একের পর এক মামলায় দশক পেরিয়েও বিচার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। অথচ ভোট আসতেই আইপ্যাকের অফিসে সাড়ে ৪ বছরের পুরানো কয়লা কেলেঙ্কারির মামলায় তল্লাশির আড়ালে তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজি চুরি করতে কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে পাঠিয়ে দিল বিজেপি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কেষ্টবিষ্টুরা। আচ্ছা ভোট এলেই বিরোধী শাসিত রাজ্যে কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই দাপাদাপি শুরু হয় কেন? দেশের এক নম্বর আইনজীবী কপিল সিবাল বলেছেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের অবিলম্বে স্পষ্ট গাইডলাইন জরুরি। না হলে সবাইকে খাওয়ার নেশায় একটাও বিরোধী রাজ্য অবশিষ্ট রাখবে না গেরুয়া দল। মৃত্যু হবে গণতন্ত্রের, সংবিধানের। 
জননেত্রীর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আঘাত বড়ো কম আসেনি। প্রতিটি আঘাতকে তিনি এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তিভূমিতে বদলে দিয়েছেন প্রত্যাঘাতের শপথে। পিছন পিছন গোটা দল, লক্ষ লক্ষ সমর্থক, অনুগামী নেমেছে রাস্তায়। সিপিএমকে উড়িয়ে রূপ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম বাঙালি রাজনৈতিক দল। তাঁর রথ ছুটেছে দ্বিগুণ গতিতে। ৬ বছর আগে ভোটের আগে লাউডন স্ট্রিটেই রাজীব কুমারের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর খবরেও তিনি এমনিভাবেই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আবার সেই লাউডন স্ট্রিট, সেদিনের পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার আজ ডিজি। ইডি-সিবিআই তাঁর সেদিনও কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি, আজও না। শুধু রাজীব কুমার নয়, ইডির হানাদারি বদলে গিয়েছে ভোটকুশলী প্রতীক জৈনের ঘর, অফিসে। ভেবে দেখলাম, ব্যাপারটা ভালোই হল। যে কোনও দলের ক্ষমতায় থাকতে থাকতে একটা ‘ইনারশিয়া’ তৈরি হয়। ইডির আঘাতে নেত্রীর জ্বলে ওঠা গোটা দলটাকে আন্দোলনের সামনে নিয়ে এল। তিনি শুধু আইপ্যাক অফিসে যাননি, একটা বিরাট নাড়া দিয়েছেন তাঁর সংগঠনকে। জেলা জেলায়, ব্লকে, শহরে, গ্রামে সর্বত্র। দলের এই যে ঐক্যবদ্ধ ‘লড়কে লেঙ্গে’ চেহারাটা দেখতে পাওয়া গেল, তা আরও পাঁচ বছরের জন্য নেত্রীর নবান্নে প্রবেশের ছাড়পত্র নিশ্চিত করল। হতাশা বাড়িয়ে দিল অমিত শাহ অ্যান্ড কোংয়ের।
বিজেপি কি সাধুপুরুষ? এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে ধনী দল কোনটি? উত্তর বিজেপি। রকেট গতিতে নগদ, সম্পত্তি বাড়ছে কোন দলের? উত্তর বিজেপি। ২০০৪-০৫ সাল থেকে একদশকে দলের রোজগার বেড়েছে ৬২৯ শতাংশ। এই মুহূর্তে বিজেপির স্থাবর কয়েক হাজার কোটির সম্পত্তি ছাড়াও শুধু ক্যাশ ব্যালেন্স আছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে নগদ ও সম্পত্তি, তাতে এখন তা দশ হাজার কোটি টাকা হলেও আশ্চর্যের কিছুই থাকবে না। বিগত লোকসভা নির্বাচনে গেরুয়া দল দেখিয়ে খরচ করেছে ২ হাজার কোটির সামান্য কম। আর না দেখিয়ে? ইডি দেখুক না ক্ষমতা থাকলে। কোনওদিন শুনেছেন উত্তরপ্রদেশে যোগীজির খাসতালুকে ইডি হিসাব চাইতে ঢুকেছে। চাকরি চলে যাবে ইডি কর্তার, তখন আর পিএমএলএ কোনও কাজে আসবে না।
কিন্তু বাংলায় বিজেপির এই হতাশা কেন? বিজেপি বুঝতে পারছে এসআইআর তৃণমূলকে জব্দ করতে তো পারেইনি, উলটে শাপে বর হয়েছে। কোটি কোটি রোহিঙ্গা নাকি মমতাকে প্রত্যেক নির্বাচনে জিতিয়ে দেয়, এই মিথ্যা ন্যারেটিভ লুটোপুটি খাচ্ছে রাস্তায়। একজনও রোহিঙ্গা মেলেনি। এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে কী জবাব দেবে গেরুয়া পতাকাবাহীরা? মাননীয় এলওপি সাহেব? কী জবাব দেবে যদি তারই পিঠোপিঠি তৃণমূলের ভোট কৌশল চুরির অভিযোগে সর্বস্তরের জোড়াফুল কর্মী উজ্জীবিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন? যতই গোবর জল দিয়ে ঠাকুরবাড়ি শুদ্ধ করুন, মতুয়ারা প্রচণ্ড বিরক্ত। রাজবংশীরা ক্ষুব্ধ। কলকাতা থেকে জেলায় ভোট ঘোষণার আগে তৃণমূলের এই ঐক্যবদ্ধ চেহারাটাই চাইছিলেন নেত্রী। এখনও সাংগঠনিক শক্তিতে শাসক দলের থেকে কয়েকহাজার মাইল দূরে বিরোধীরা। তার উপর মমতা ও তাঁর দল আক্রান্ত, এই একটা বাক্যবন্ধই নাড়িয়ে দিয়েছে বাংলার মানুষকে। এসআইআর হলেই গোটা তৃণমূল দলটা বাজার থেকে হাওয়া হয়ে যাবে, এই ছিল অমিত শাহদের হিসাব। কার্যক্ষেত্রে ফল হয়েছে উলটো। ক্ষীণবল সংগঠন নিয়ে গ্রাম বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দাঁত ফোটাতে পারেনি শাহের অনুগামীরা। 
চার বছর আগের মামলা। ঝাড়পোঁছ করে বের করেছে। পোশাকি নাম কয়লা কেলেঙ্কারি। প্রধান অভিযুক্ত অনুপ মাঝি ওরফে লালা। সুস্পষ্ট যদি প্রমাণ থাকত। আর্থিক লেনদেনের অকাট্য ‘ট্রেল’ মিলত, তাহলে অনেক আগেই সন্দেহজনক যে কোনও সংস্থা কিংবা ব্যক্তির অফিসে হানা দিতেই পারত ইডি। প্রশ্নটা সেটা নয়। প্রশ্নটা হচ্ছে বেছে বেছে ঠিক ভোটের আগে বারবার অভিযান কেন? কয়লা দুর্নীতি এতদিন শাক দিয়ে ঢেকে রাখার পর এখন ওই বোয়াল মাছ দেখা যাচ্ছে মার্কা সস্তা গল্প কেন? তৃণমূলের প্রচারকে ব্যাহত করা, কয়েকজনকে জেলে পোরা, কিছুই তো বাকি রাখেননি। লাভটা কী হয়েছে? পাঁচ বছর আগে একুশের নির্বাচনে একই খেলা খেলেছিল বিজেপি। বারবার সেই একই ক্লান্তিকর নাটক! কেন সুস্পষ্ট ‘মানি ট্রেল’ না দেখেই ওই টাকার ভাগ নাকি আইপ্যাকের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে বলে দাবি করা?
তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ আগামী মাসেই। স্বভাবতই দায়িত্বপ্রাপ্ত ভোটকুশলী সংস্থার হাতে প্রচারের ব্লুপ্রিন্ট, তালিকার খসড়া, আর কী কী প্রকল্প ঘোষণা হতে চলেছে তার একটা বিস্তারিত রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত। শেষ মুহূর্তে ঝাড়াই বাছাই করছেন সুপ্রিমো। দেখবেন বোফর্স থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দুর্নীতির মামলায় বছরের পর বছর ধরে তদন্তই শেষ হয় না। ভোট এলে গতি বাড়ে, ভোট গেলেই আবার নট নড়ন চড়ন। পরের নির্বাচনের অপেক্ষা। অমিত শাহদের এই নাটক কতদিন চলবে? কয়লা ও বালি পাচার মামলায় ইডি প্রভাবশালীদের নাম সামনে আনার চেষ্টা করে অনেক আগেই ব্যর্থ। রেশন দুর্নীতি মামলায় মন্ত্রী গ্রেপ্তার হয়ে আবার ছাড়া পেয়ে গেলেন, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা গেল না। এটা কেন্দ্রীয় এজেন্সির প্রহসন ছাড়া আর কি? কনভিকশন রেট আধ শতাংশ, তার জোরেই গেরুয়া দলের ক্যারা নড়ে। মহারাষ্ট্রে, বিহারে, হরিয়ানায় ভোট চুরির শত শত অভিযোগ, কই কেন্দ্রীয় এজেন্সি তো তা তদন্ত করার সময় পায় না! যত হামলা নেমে আসে বাংলায়। সময় যত এগবে, অমিত শাহের হাতের তাস যত ফুরিয়ে আসবে, ততই তৃণমূল ও তাঁর সুপ্রিমোর উপর এমন আক্রমণ চলবে। একুশ সালের কথা মনে নেই। নেতাদের ভয় দেখাও। হানাদারি চালাও। দল ভাঙো। আর এবার এসআইআর করে ভোটার কমিয়ে দাও। এতেও পর্বত নড়বে না। অর্থাৎ পদার্থবিদ্যার ভাষায় কাজটা কিন্তু শূন্যই রয়ে গেল। আবার বলছি, মহাশূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার পথে বামেরা, এবার আসন কমলে সেই একই পথের পথিক হবে বিজেপিও।
আর এবার এক ভয়ংকর খেলা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার তার একটা ট্রেলার দেখেছে বাংলার মানুষ। পিকচার আভি বাকি হ্যায়। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পুরোটা দেখবে দেশ। অবাঙালিদের হটিয়ে বিশুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতির জয়গান করুন প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ