Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চতুর্দিকে নৈরাজ্য বনাম তিন বাঙালির ভারত নির্মাণ

তাহলে এখন বোঝা যাচ্ছে তো ভারতের গণতন্ত্র, সংসদীয় ব্যবস্থা, সংবিধান এবং উন্নয়নের কাঠামো ঠিক কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল? কতটা শক্তিশালী একটি নতুন ভারতের ভিত্তি গড়েছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ভীমরাও আম্বেদকররা? সেটা বারংবার চোখের সামনে প্রমাণ হচ্ছে তো?

চতুর্দিকে নৈরাজ্য বনাম তিন বাঙালির ভারত নির্মাণ
  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: তাহলে এখন বোঝা যাচ্ছে তো ভারতের গণতন্ত্র, সংসদীয় ব্যবস্থা, সংবিধান এবং উন্নয়নের কাঠামো ঠিক কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল? কতটা শক্তিশালী একটি নতুন ভারতের ভিত্তি গড়েছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ভীমরাও আম্বেদকররা? সেটা বারংবার চোখের সামনে প্রমাণ হচ্ছে তো? নেপাল ছাড়া কমবেশি প্রতিবেশী দেশগুলির সকলেই তো একইসঙ্গে স্বাধীনতা পেয়েছিল। কিন্তু ভারতের চারপাশে চলছে লাগাতার নৈরাজ্য। ডেমোক্রেসি নয়। মবোক্রেসির রাজত্ব চলছে। উন্মত্ত জনতা অর্থাৎ মব স্থির করছে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। গণতন্ত্র, সংবিধান, সংসদ, বিচারবিভাগের যেন অস্তিত্বই নেই এইসব দেশে। অথচ তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারত স্থির হয়ে থাকতে পারছে। একটি সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ, যার সাক্ষরতা হার নগণ্য, যার নিজস্ব শিল্প কাঠামো ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে ঔপনিবেশিক শাসকরা, উদ্বাস্তুর স্রোত আর লাগাতার হিন্দু বনাম মুসলমান দাঙ্গার রক্তের মধ্যেও দাঁতে দাঁত চেপে তাঁরা কিন্তু দেশকে প্রকৃত আধুনিক ও স্বাবলম্বী করে তুলতে হলে ঠিক যা যা করতে হয়, সেগুলি ঠিক করে চলেছিলেন। আজ স্বাধীনতার ৭৯ তম বছরে এসে কী দেখা যাচ্ছে? এই ৭৯ বছরে একবারও তো এমন কোনও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী আন্দোলন হল না, যা নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দিতে পেরেছে? একটিও সেনা অভ্যুত্থান হয়নি। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে সামরিক শাসন হয়নি। চীনের চেয়ারম্যানকে নিজেদের চেয়ারম্যান ঘোষণা করে নিম্নমধ্যবিত্ত  ট্রাফিক পুলিশ আর গরিব জমি মালিকদের হত্যা করে, গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরব স্লোগান দিয়ে, জঙ্গল আর পাহাড়ের পথে বেজিং পৌঁছে কমরেড মাওয়ের সঙ্গে দেখা করে যাঁরা ভেবেছিলেন বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ নিয়ে বিপ্লব জাগ্রত দ্বারে, তাঁরাও তো সফল হলেন না। সেই তো সংসদীয় গণতন্ত্রই জিতছে। বিস্ফোরণ, গণহত্যা আর ভীতির রাজত্ব কায়েম করে যারা পাঞ্জাবকে খালিস্তান করে দেবে ভেবেছিল, তারা কোথায় আজ? এত সন্ত্রাস করেও কাশ্মীরকে আজও তো কেউ আজাদ করার সাহস দেখাতে পারল না! পারবেও না। 

Advertisement

১৯৫২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নিয়ম করে নির্বাচন হচ্ছে। কোনও অরাজক পরিস্থিতিতে দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা মুখ্যমন্ত্রীদের হেলিকপ্টার করে দেশছাড়া হয়ে পালাতে হচ্ছে, এরকম দৃশ্য ৭৯ বছরে দেখা যায়নি। এখানে যারা ভোটে জেতে, তারা সরকার গড়ে। যারা ভোটে পরাজিত হয়, তারা বিরোধী দলের আসনে বসে। আবার ৫ বছর পর ভোট হয়। 
দুর্নীতি নেই? বেকারত্ব নেই? শোষণ নেই? বঞ্চনা নেই? বৈষম্য নেই? সব আছে। কিন্তু সেগুলিকে হাতিয়ার করে কেউ কোনওদিন সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পরাজিত করতে পারেনি এই দেশে। জিতে গিয়েছে ভোট নামক একটি ব্যবস্থা। জিতে 
গিয়েছে গণতন্ত্র। জিতে গিয়েছে শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো। জিতে গিয়েছে সংবিধান। একনায়কতন্ত্র চালু করার ইচ্ছা এবং মনোভাব যাঁরাই দেখাতে গিয়েছেন, উচিত শিক্ষা পেয়েছেন সেই ভোটেই। অন্য উপায়ে নয় কিন্তু। 
অথচ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, সীমান্ত পেরলেই, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা সর্বত্র বছরের পর বছর ধরে দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। যখন তখন নানারকম আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য। কোনও নৈরাজ্যের নাম বৈষম্য বিরোধী। কোনও অরাজকতার নাম জেন জি বিপ্লব। কেউ নাম দিয়েছিল আরাগালয়। কিন্তু প্যাটার্ন সব এক। আন্দোলন আর বিদ্রোহের নামে অরাজকতা তৈরি করা। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস। চরম এক আইনশাসনহীন যথেচ্ছাচার ছড়িয়ে দেওয়া। শাসক গোষ্ঠীকে হত্যা করা, কারাগারে নিক্ষেপ করা কিংবা দেশছাড়া করা। ২০২১ সালে মায়ানমার, আফগানিস্তান, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ, ২০২৫ সালে নেপাল।  
কেন ভারতের গণতন্ত্রের শিকড় এত শক্তিশালী? কারা এই ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলেন? শুধুই জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল, বি আর আম্বেদকররা? তাঁদের ব্যক্তিগত কৃতিত্বের পাশাপাশি আরও বড় সাফল্য হল, তাঁরা যাঁদের হাতে এই নতুন ভারত নির্মাণের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। 
আর সেই অসংখ্য সিভিল সার্ভেন্ট প্রশাসনিক অফিসারদের মধ্যে সবথেকে উজ্জ্বল নাম তিনজন বাঙালির। সংবিধানের মূল খসড়া নির্মাণ করেছিলেন যিনি তিনি ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ মুখার্জি। সাংবিধানিক উপদেষ্টা বি এন রাও সবথেকে বেশি যাঁর উপর ভরসা করেছিলেন তিনিই হলেন এই এস এন মুখার্জি। কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সুরেন্দ্রনাথ মুখার্জির ভূমিকা? 
১৯৪৯ সালের ২৫ নভেম্বর যখন সংবিধানকে অবশেষে গ্রহণ করা হল এবং সংবিধান সভায় অনুমোদন দেওয়া হল, সেদিন শেষ বক্তৃতায় বি আর আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘ অনেক বড় কৃতিত্ব অবশ্যই যাবে মিস্টার এস এন মুখার্জির কাছে। যিনি সংবিধানের প্রধান খসড়া রচয়িতা। সবথেকে জটিল প্রস্তাবগুলিকে অত্যন্ত সরলভাবে উপস্থাপনে তাঁর যোগ্যতা এবং স্বচ্ছ আইনি‌ই঩ ব্যাখ্যায় তাঁর মতো পারঙ্গম কাউকে পাওয়া দুষ্কর। একই সঙ্গে তাঁর পরিশ্রম করার ক্ষমতাও বিরল। তাঁকে ছাড়া এই সভায় সংবিধান রচনা করতে আরও বহু বছর সময় লেগে যেত। মিস্টার মুখার্জি ও তাঁর দপ্তরের কর্মীরা অসামান্য কাজ করেছেন সংবিধান নির্মাণে’। কে বলছেন? খোদ সংবিধান রচনা কমিটির চেয়ারম্যান ভীমরাও আম্বেদকর। আজ কতজন মনে রেখেছেন এই মানুষটির কৃতিত্বের কথা? ভারতের প্রধান শক্তি তার সংবিধান। আর সেই সংবিধান রচনার সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ কাজটি করেছিলেন এই বাঙালি অফিসার। 
গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি হল সংসদীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া। জওহরলাল নেহরু যাঁর উপর ভারতের প্রথম নির্বাচন সংঘটিত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন আইসিএস সুকুমার সেন। ১৯৪৭ সাল থেকে সুকুমার সেন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিব।  তার আগে ১৯ বছর ধরে ছিলেন জেলা বিচারপতি। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যের মুখ্যসচিব হওয়ার তুলনায় চ্যালেঞ্জিং কাজ আর কিছু হতে পারে না। সুতরাং নেহরু তাঁকেই নিয়ে এসেছিলেন দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। ২০ কোটি ভোটার, যাদেরকে দলের প্রতীকে কীভাবে ভোট দিতে হয় সেটা বোঝানো, প্রত্যেক দলকে প্রতীক বণ্টন করা, বুথ তৈরি করতে হয় কীভাবে, ভোটগণনার নিয়ম কী, ঘোষণা হবে কখন, রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয় হবে কীভাবে, ইত্যাদি আশ্চর্য সব বিস্ময়কর বিষয়কে নতুন ভারতে প্রথমবারের জন্য চালু করলেন সুকুমার সেন। 
সেই যে ভারতে এক নির্বাচন প্রক্রিয়ার শিকড় গণতন্ত্রের গভীরে প্রোথিত করে দিয়ে গেলেন সুকুমার সেন, আজও ভারত সংসদীয় গণতন্ত্রের সেই প্রথায় অটুট রইল। কতটা সফল হয়েছিলেন সুকুমার সেন? তাঁকে আফ্রিকার সুদানে ঠিক এভাবেই একটি প্রথম নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। ৯ মাস ধরে তিনি ছিলেন সুদানে। ১৯৫৩ সালে সুদানের নির্বাচন পরিচালনা করেন তিনি। এবং সফল নির্বাচন করে ফিরে আসেন। 
একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু করার আগে দরকার সেই দেশের বিভিন্ন পরিসংখ্যান জানা। প্রতিটি সেক্টরের আর্থ সামাজিক পরিসংখ্যান। ১৯৫০ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের প্রথম ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে হল।  কার নেতৃত্বে? প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ। ৫ লক্ষ ৬০ হাজার গ্রামের মধ্যে থেকে ১৮৩৩ গ্রামকে বেছে নিয়ে। এই স্যাম্পল সার্ভে পরবর্তীকালে কী কাজে লাগল? প্ল্যানিং কমিশনের একটি বিশেষ চিহ্ন নির্ধারণ করতে। দারিদ্র্য রেখা। ভারতে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ারও তিন বছর পর আমেরিকায় হয়েছিল দারিদ্র্য রেখা নির্ধারণ। প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ এবং কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক রূপরেখা নির্ধারণে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতার পর ভারত নির্মাণের সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ছিল দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬১। আধুনিক ভারতের যাত্রাশুরু এই পরিকল্পনার হাত ধরে। এই পরিকল্পনাটির রূপকার প্রফেসর মহলানবিশ এবং আইএসআই। তিনি ভারত সরকারকে বুঝিয়েছিলেন কোন বস্তুটি দেশনির্মাণের প্রধান কারিগর। সেটি হল ডেটা, পরিসংখ্যান। 
সুতরাং সংবিধান রচনা, সংসদীয় নির্বাচন চালু করা এবং দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী একটি পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নীতি নির্ধারণ। আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান তিনটি স্তম্ভ ভারতকে উপহার দিয়েছিলেন এই তিন বাঙালি! আর তাই সেই সুফল আজও  আরও উন্নত ও আধুনিক ভারত পেয়েই চলেছে। যে বাড়ির ভিত শক্ত, তাকে টলাবে এরকম ঝড় জল ভূমিকম্প কমই আছে। সুতরাং আশপাশের তাবৎ প্রতিবেশী দেশ একের পর এক ঝড়ে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে বারংবার। ভারত কিন্তু ১৯৫০ সাল থেকেই শুধুই সংবিধানের পূজারি। চতুর্দিকের এই নৈরাজ্য আর অরাজকতার ঠিক মাঝখানে এক নিষ্কম্প বাতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গণতান্ত্রিক ভারত! 
সুতরাং হে মাননীয় শাসককুল, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের মতো এই গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবেন না। অবশ্য চেষ্টা করলেও পারবেন না! আর হ্যাঁ, এই বাঙালি নামগুলি একটু মনে রাখবেন! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ